কালের আয়নায়

ইডিপাসের গল্প এবং বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

প্রাচীন গ্রিসের একটি রাজ্যে ইডিপাস খুবই মহানুভব রাজা ছিলেন। সব সময় তিনি প্রজাদের কল্যাণের কথা ভাবতেন এবং প্রজাদের কল্যাণের জন্য কাজ করতেন। তথাপি তার রাজ্যে দুর্ভিক্ষ, খরা, বন্যা লেগেই ছিল। সব দেখেশুনে রাজা ইডিপাস তার রাজ্যের সব পণ্ডিতকে ডাকলেন। বললেন, আমি সবসময় প্রজাদের কল্যাণের জন্য এত কাজ করি; তারপরও আমার রাজ্যে এত ঝড়-বন্যা-দুর্ভিক্ষ কেন? আমি তো কোনো পাপ করিনি। আপনারা পাঁজি-পুথি ঘেঁটে বলে দিন, আমি কী করেছি, যার জন্য এই শাস্তি।

পণ্ডিতেরা পাঁজি-পুথি নিয়ে বসে গেলেন, রাজা ইডিপাসের রাজ্যে এত অরাজক অবস্থা কেন তা জানার জন্য। সাত দিন সাত রাত পাঁজি-পুথি ঘেঁটে পণ্ডিতেরা ইডিপাসকে জানালেন, তার একটি ভয়ানক পাপের জন্য রাজ্যে বিধাতার এত অভিশাপ। রাজা বললেন, আমি জ্ঞানত কোনো পাপ করিনি। পণ্ডিতেরা বললেন, রাজা না জেনে এই পাপটি করেছেন। তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

এখন ফিরে আসি প্রাচীন গ্রিস থেকে বর্তমান বাংলাদেশে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শত্রু-মিত্র সকলেই স্বীকার করেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর যে ক'জন প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন, তাদের সকলের মধ্যে শেখ হাসিনা শ্রেষ্ঠ। তিনি স্বাধীনতার শত্রু ঘাতক শক্তিকে দমন করা ছাড়াও বাংলাদেশকে যে স্বনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নতির শীর্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অত্যাশ্চর্য উন্নতি ও সমৃদ্ধির ইতিহাস গড়েছেন শেখ হাসিনা। মিত্রদের চাইতে শত্রুরাই শেখ হাসিনার প্রশংসা করছেন বেশি। যে পাকিস্তান বাংলাদেশে একাত্তর সালে গণহত্যা চালিয়েছে, যে দেশটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার চির বৈরী, সে দেশটির সিভিল সোসাইটিও এখন বাংলাদেশের সমৃদ্ধি এবং শেখ হাসিনার প্রশংসায় মুখর।

পাকিস্তানের টেলিভিশনে আজকাল যে টকশো হয়, তাতে পাকিস্তানের তুলনায়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে কতটা এগিয়ে গেছে, তার বিবরণ দিয়ে বলা হয়, পাকিস্তানের জন্য এখন শেখ হাসিনার মতো একজন নেত্রীর দরকার। পাকিস্তানের করাচি থেকে প্রকাশিত 'সাউথ এশিয়া' ম্যাগাজিন গত মাসে (মার্চ) বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা বের করেছে। মূল প্রচ্ছদের ছবি শেখ হাসিনার। তার পেছনে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা এবং তারও পেছনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। প্রচ্ছদের শিরোনাম- 'বাংলাদেশের ৫০ বছর, উদীয়মান সূর্য'।

এ ছাড়া বিশ্বময় শেখ হাসিনার প্রশংসার শেষ নেই। আমেরিকার ব্ল্যাক হিলস স্টেট ইউনিভার্সিটির এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অর্থনীতির দুই অধ্যাপক বাংলাদেশের অর্থনীতির বিস্ময়কর অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেছেন। এছাড়া জাপান, ভারত, তুরস্কের কাগজেও হাসিনা-নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। বিশ্বময় যার এবং যার দেশের এত প্রশংসা, সেই দেশে সম্প্রতি এত বিপর্যয়ের ঢল কেন? একই সঙ্গে বাংলাদেশের বুকে নেমে এসেছে দুই বিপদ। হেফাজতি তাণ্ডব এবং কভিড-১৯-এর নতুন ভয়াবহ সংক্রমণ। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী এত সৎ ও দেশপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষের এত হিতৈষী, তার দেশে কার অপরাধে অথবা পাপে বছরের পর বছর ধরে এই ধ্বংসলীলা।

শেখ হাসিনা তিন টার্ম ক্ষমতায় আছেন বটে, কিন্তু সুখে রাজত্ব করতে পারেননি। তার রাজনৈতিক বিরোধীরা কখনও তাকে গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক পথে বিরোধিতা করেনি। সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র লেগেই ছিল। এই ষড়যন্ত্র শুধু তার শত্রুরা করেনি। মিত্ররাও করেছে। একে একে তার সহকর্মী কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অনেক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। তার নিজের জীবনের ওপর সবচেয়ে বড় হামলা হয়েছিল, গ্রেনেড হামলা। তিনি বিস্ময়করভাবে বেঁচে যান। তাকে বিএনপি ও জামায়াতের একটানা সন্ত্রাস সাড়ে তিন বছর মোকাবিলা করতে হয়েছে। শুধু বিডিআরের নয়, হেফাজতের ২০১৩ সালের অভ্যুত্থানের মোকাবিলা করতে হয়েছে। যে সময় তিনি যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের আয়োজনে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় তার দেশে কভিড-১৯-এর ভয়াবহ নতুন হামলা এবং হেফাজতিদের অভ্যুত্থান তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রথম দফা কভিড-১৯-এর হামলার সময় তিনি যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সেই হামলা প্রতিরোধ করেছেন। করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কা সামলাতে তিনি যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এবার যে কভিড-১৯ দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে বাংলাদেশে হামলা চালিয়েছে তার তিনি কি করবেন?

এজন্য হাসিনা সরকারকে দায়ী করা যায় না। বাংলাদেশের ক্রমস্ম্ফীত জনসংখ্যা কোনো নিয়মকানুনের ধার ধারে না। এই মহামারির সময়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি তারা সঠিকভাবে মেনেছেন, তার কোনো প্রমাণ নেই। দিনমজুরেরা লকডাউন মানতে চাননি, তার কারণ, তাহলে তাদের পরিবার না খেয়ে মরবে। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের (অধিকাংশই নারী) বক্তব্য একই। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষেরাও কি সরকারের বিধিবিধান মেনেছেন? কক্সবাজারের সমুদ্রতীরে এবং অন্যান্য হলিডে রিসোর্টে বিভিন্ন ছুটিছাটায় স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে মানুষের ভিড় দেখে কি মনে হয়েছে? অবশ্য কভিড-১৯ তার তৃতীয় দফা হামলায় শুধু বাংলাদেশকে নয়, ইউরোপের অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সকেও কাবু করে ফেলেছে। তবে বাংলাদেশে

কভিড-১৯ এর এবারের হামলা যত প্রচণ্ড হোক, শেখ হাসিনা ও তার সরকার সর্বশক্তি নিয়ে এই মহামারির বিরুদ্ধে লড়বেন সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত, দেশের মানুষও নিশ্চিত।

এখন গোড়ার কথায় যাই। রাজা ইডিপাস এত প্রজাবৎসল ও মহানুভব রাজা হওয়া সত্ত্বেও তার দেশে দুর্ভিক্ষ, খরা, বন্যা লেগেই ছিল। পণ্ডিতেরা পাঁজি-পুথি ঘেঁটে বের করেছিলেন, রাজা তার নিজের অজান্তে একটা বড় পাপ করেছিলেন। তিনি এই পাপ খণ্ডনের পর তার রাজ্যে ভালো অবস্থা ফিরে এসেছিল। এখন প্রশ্ন, বর্তমান বাংলাদেশে শেখ হাসিনা বা তার সরকারের কি কোনো পাপ বা অপরাধ আছে, যে জন্য দেশটিতে এত টানা দুর্বিপাক? পণ্ডিতেরা নয়, আমি নানা চিন্তাভাবনা করে শেখ হাসিনার একটা 'বড় অপরাধ' আবিস্কার করেছি। এই অপরাধ হলো দেশের মানুষকে অতিরিক্ত ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তার সবচাইতে বড় শক্তি কী, আবার সবচাইতে বড় দুর্বলতা কী? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, তার বড় শক্তি মানুষকে ভালোবাসা। আবার তার বড় দুর্বলতা মানুষকে ভালোবাসা। এই কথাটা তার কন্যা শেখ হাসিনার বেলায়ও সত্য। শেখ হাসিনার বড় শক্তি মানুষকে ভালোবাসা এবং বড় দুর্বলতাও মানুষকে ভালোবাসা।

প্রধানমন্ত্রীর এই শেষোক্ত দুর্বলতাটাই মাঝে মাঝে অপরাধ হয়ে দেখা দেয়। তিনি সাম্প্রদায়িক বা ধর্মান্ধ নন, কিন্তু ধর্মের প্রতি তার দুর্বলতা আছে। এজন্য হেফাজত যখন দেশে ধর্মের নামে তাণ্ডব চালায়, জাতির পিতার ভাস্কর্যেও আঘাত করে, তখনও তিনি শক্ত হতে পারেন না। ধর্মের প্রতি দুর্বলতা তাকে হেফাজতিদের প্রতিও দুর্বল করে ফেলে। তিনি হেফাজতিদের প্রতি দুর্বলতা না দেখালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে অজুহাত করে হেফাজতিরা যে দেশময় ভাঙচুর করেছে, তা করে পার পেত না।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটা গভীর ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। তার বিস্ময়কর উন্নয়নের ফসল লুট করে নিচ্ছে দুর্নীতিবাজরা। সমাজ পশ্চাৎমুখী। যুবসমাজ বিপথগামী। ধর্ম নিয়ে ধর্মান্ধরা চালাচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবসা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একটা বিরাট অংশ দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারে ব্যস্ত। সংখ্যালঘু হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর পৌনঃপুনিক হামলা চলছে। নারী ধর্ষণ একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমলা-নির্ভর প্রশাসনের অযোগ্যতা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।

এই দুঃসময়ে দেশের মানুষ শেখ হাসিনার মুখের দিকে চেয়ে আছে। তার নেতৃত্বের এখন কোনো বিকল্প নেই। তাকে অবশ্যই সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে সমাজশত্রু ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হতে হবে। এই মুহূর্তে দেশের মানুষের একটাই প্রার্থনা, তাদের কণ্ঠে একটাই আওয়াজ- শেখ হাসিনা কঠোর হও।

[লন্ডন, ১ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, ২০২১]

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com