সর্বজন শ্রদ্ধেয় 'তারাপদ স্যার'

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানিক চন্দ্র দে

শ্রী জগদীশ চন্দ্র ঘোষ (১৯২৯-২০২১)

তাকে ফরিদপুরের মানুষ চিনত একজন আলোকিত ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে। তিনি ছিলেন শুভ্রতার প্রতীক। শ্রী জগদীশ চন্দ্র ঘোষ। তারাপদ মাস্টার নামেই তিনি সমধিক পরিচিত।

তার প্রিয় ছাত্রদের কাছে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক, সাধারণ মানুষের কাছে পরম হিতৈষী একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি, সাংবাদিকদের কাছে ইংরেজি জানা একজন দক্ষ সাংবাদিক। তিনি দৈনিক অবজারভারের ফরিদপুর জেলার করেসপন্ডেন্টও ছিলেন। আর আত্মীয়স্বজনের কাছে ছিলেন একজন দেবতুল্য দায়িত্ববান পরিবারের প্রধান কর্তা।

১৯২৯ সালে বিক্রমপুরে তার জন্ম। পরবর্তীকালে বাবার সঙ্গে ফরিদপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি অঙ্ক ও ইংরেজিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালেই তিনি একই ক্লাসের ছাত্রকে পড়াতেন। ফরিদপুরের হিতৈষী স্কুলের তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং পরে ওই স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ছিলেন অকৃতদার। বাম ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে তিনি ফরিদপুরের ন্যাপের একজন নেতা ছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে তার গ্রামের বাড়িতে আক্রমণ করে ছোট ভাই গৌরগোপাল ঘোষসহ মোট ২৮ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর পরিবারটি একেবারে ভগ্নপ্রায় হয়ে যায়। তিনি দিনরাত টিউশনি ও মাস্টারি করে পরিবারটিকে আবার দাঁড় করান।

তিনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের অনুসারী একজন অসাম্প্রদায়িক ও সমাজসেবী মানুষ। তার ছাত্রদের পড়ানোর পাশাপাশি তিনি একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে উপদেশ দিতেন। অঙ্ক ও ইংরেজির শিক্ষক এবং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে তিনি ফরিদপুরে সবার কাছে সুপরিচিত ছিলেন। তার হাতে গড়া অনেক ছাত্র আজ প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার এবং শিল্পপতি। তিনি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠকও ছিলেন। ফরিদপুর প্রেস ক্লাব, ফরিদপুর টাউন থিয়েটার, ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতিসহ অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ার সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।

তিনি তার প্রিয় ছাত্র বা নাতি-নাতনিকে বলতেন একজন আদর্শ ও সৎ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। রাজনীতি নিজে না করলেও রাজনীতি-সচেতন হতে হবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হতে হবে, মানবিক হতে হবে। তিনি তার পরিবারকে বলতেন, তার মৃত্যুকালে যেন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আসে। ২০১৯ সালে প্রথম আলো পত্রিকা তাকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে।

বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। হঠাৎ করে আবার ঘাতক করোনায় আক্রান্ত হন। ২ এপ্রিল তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ ফরিদপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮.৪৫ মিনিটে সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে পরপারে চলে যান। তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।

তার মৃত্যুতে এই করোনাকালেও ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের মানুষ তার শবযাত্রায় অংশ নেন।

তার মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।

আমি এই মহাপ্রাণ বিদেহী আত্মার চির শান্তি কামনা করি।

অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com