ঢাকা চেম্বার-সমকাল-চ্যানেল ২৪ প্রাক-বাজেট আলোচনা

করহার ও আদায় ব্যবস্থা হতে হবে ব্যবসাবান্ধব

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২১ । ০৩:১১ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

আগামী অর্থবছরের বাজেটে করের হার ও আদায় ব্যবস্থা ব্যবসাবান্ধব করার প্রস্তাব করেছেন বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে ব্যবসা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় করহার বাড়ানোর পরিবর্তে রাজস্ব আহরণ ঠিক রাখতে এর আওতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অগ্রিম কর কমিয়ে বা প্রত্যাহার করে আদায় ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও কর্মসংস্থান ঠিক রাখতে সিএমএসএমই খাতে বিশেষ নজর দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তারা।

শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত 'প্রাক-বাজেট আলোচনা :অর্থবছর ২০২১-২২' শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান এবং ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আর্থিক খাত, কর ও ভ্যাট, শিল্প-বাণিজ্য এবং অবকাঠামো- এই চার পর্বে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের সদস্যরা অংশ নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব শোনেন ও মতামত রাখেন।

ড. মসিউর রহমান বলেন, অর্থনীতির অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধির জন্য সরকারের রাজস্ব দরকার। রাজস্ব না বাড়লে সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যথাযথ করতে পারবে না। অর্থনীতি সম্প্রসারিত ও দক্ষ না হলে রাজস্ব আদায়ও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ে না। তিনি বলেন, এসব আলোচনা বাজেটের আগে হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সারা বছর আলোচনা হওয়া দরকার। যারা কর সুবিধা চান তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত না করে কী হারে রাজস্ব বাড়া উচিত তার একটা ধারণা সরকারকে দিতে পারেন।

এনবিআরের সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, করের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। আয়কর বা মূসক যা-ই হোক তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। সাম্প্রতিক আলোচনায় দুটো বিষয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। শুল্ক্ক, কর ইত্যাদি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ব্যাহত হবে। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণ এবং তার ব্যয়ের মান ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় হচ্ছে কিনা তাও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, যারা কর দেবেন এবং যারা কর আদায় করবেন তাদের মধ্যে একটা সমঝোতা থাকতে হবে, কোনটা কী কারণে হচ্ছে। তিনি বলেন, আগাম কেটে নেওয়া কর চূড়ান্ত করের সঙ্গে সমন্বয় হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে তা হয় না। ফলে মোট কর বেড়ে যায়।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার কারণে বর্তমানে একটা বিশেষ মুহূর্ত যাচ্ছে। এর ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রভাব আছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা পুনরুদ্ধারে গেলেও, তারা আবার খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছে। এজন্য আগামী বাজেটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় উদ্যোগ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অতিক্ষুদ্র, কুটির ও এসএমই খাতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা সঠিকভাবে বিতরণ হয়নি। এক্ষেত্রে ব্যাংক যেমন আগ্রহী নয়, তেমনি গ্রাহকরাও যথেষ্ট দক্ষ নয়। এই খাতের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে পারে। সিএসএমইর জন্য বাজেটে বিস্তারিত পরিকল্পনা দরকার। তিনি শহরের দরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তায় অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং শহরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান। তিনি বলেন, করোনার মধ্যেও দেশের অর্থনীতি এগিয়েছে। এ অগ্রগতি ধরে রাখতে ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা দরকার। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার মাথায় রেখে বাজেট সাজাতে হবে। আয়কর ও ভ্যাট হতে হবে ব্যবসাবান্ধব।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, সমকাল চায় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠুক। সমাজ এগিয়ে যাক। রাজস্ব আহরণ অবশ্যই বাড়াতে হবে। লক্ষ্য পূরণ করতে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, করোনাকালীন সময়ে সংবাদপত্র ব্যাপক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে সংবাদপত্রকে অনেক বেশি হারে কর দিতে হয়। এর মধ্যে কাগজ আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক্ক এবং ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ করপোরেট কর। তিনি কাগজের আমদানি শুল্ক্ক শূন্যে নামিয়ে আনা এবং করপোরেট কর কমিয়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণের প্রস্তাব করেন।

আর্থিক খাত :এ খাতের ওপর আলোচনায় আইপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, বন্ডের সুদের ওপর করহার কমানো হলে করপোরেট বন্ড মার্কেট দাঁড়াবে। এতে ব্যাংকের ওপর চাপ কমে আসবে। তিনি বলেন, সরকার খেলাপি ঋণ আদায়ে একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি করতে যাচ্ছে। এই কোম্পানি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে করা হোক।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয় বলেন, এসএমইএর জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো দরকার। বন্ডের সুদহার কমানো এবং ঋণের সুদে প্রণোদনা দেওয়া উচিত। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমকে প্রসারিত করে এসএমই খাতকে আরও সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। নগদের সিইও রাহেল আহমেদ বলেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে প্রণোদনা দিতে হবে। স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করহারের ব্যবধান বাড়াতে হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহার আরও কমানো যেতে পারে।

কর ও ভ্যাট :কেপিএমজির সিনিয়র পার্টনার আদিব হোসেন খান বলেন, অগ্রিম করের হার এত বেশি হয়ে গেছে যে, এটিই অনেকের ক্ষেত্রে হয়ে যাচ্ছে নূ্যনতম কর। এ বিষয় দ্রুত পর্যালোচনা করা দরকার। তিনি বলেন, আগের ভ্যাট আইনে মূল্য ঘোষণার বিষয় ছিল, যা তুলে দিয়ে নতুন আইনে উপকরণ-উৎপাদন সহগের শর্ত আনা হয়েছে। এই ব্যবস্থা আসলে আগের মতোই। তিনি বলেন, উপকরণ কর রিবেট সহজে অনুমোদন না করলে ভ্যাট ব্যবস্থা কাজ করবে না।

এনবিআরের সদস্য (শুল্ক্ক নীতি) সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া বলেন, মোট তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। এ বিষয়েও ব্যবসায়ীদের ভাবতে হবে। তিনি বলেন, এসএমই, কৃষি, প্রাণিসম্পদ সরকারের অগ্রাধিকার খাত। ফলে এসব খাতে আমদানি পর্যায়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট নীতি) মাসুদ সাদিক বলেন, মূল্য ঘোষণা না থাকলে কিছু প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিত। মূল্য ঘোষণা বাধ্যতামূলক নয়, অবহিত করতে হয়। কোন প্রতিষ্ঠান কতটা ইনপুট ব্যবহার করে কতটা আউটপুট হচ্ছে, তা দেখা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ভ্যাটের হার বাড়ানোর পরিবর্তে আওতা বাড়ানো এনবিআরের লক্ষ্য।

এনবিআরের সদস্য (কর নীতি) মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বর্তমান সংকটে সবচেয়ে জরুরি অর্থ জোগান দেওয়া। এ জন্য রাজস্ব দরকার। অন্যদিকে অর্থনীতি গতিশীল রাখাও জরুরি। তিনি বলেন, চলতি বাজেটে পুঁজিবাজারে নীতিসহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগামীতেও এ বিষয় বিবেচনায় আছে। বন্ড মার্কেট, স্পেশাল পারপাস ভেহিকেলও বিবেচনায় আছে। তিনি বলেন, অনেকে অভিযোগ করেন আয়কর ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ ০, ৫, ১০, ১৫, ২৫ শতাংশ হারেও আয়কর আছে।

বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বলেন, করপোরেট করহার কমপক্ষে ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমাতে হবে। পাশাপাশি কর প্রণোদনাও দিতে হবে। কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ধরে রাখতে প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।

উত্তরা গ্রুপের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, কর অবকাশ সুবিধা আছে- এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও বিনিয়োগ নীতিমালায় পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের হার কমিয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করা যেতে পারে এবং বিনিয়োগ কোথায় করবেন, তা নিজে ঠিক করার সুবিধা দিতে হবে।

শিল্প ও বাণিজ্য: সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী ইনাম আহমেদ বলেন, সুপারশপের কেনাকাটায় ৪ শতাংশ অতিরিক্ত ভ্যাট দিতে হয়। তিনি এই ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সঙ্গে সুপারশপে ব্যবহূত ফ্রিজ ক্যাপিটাল মেশিনারি হিসেবে ১ শতাংশ শুল্ক্কের সুযোগ চান।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, তৈরি পোশাক খাতে সবুজ কারখানায় বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় ইটিপি জরুরি। তিনি পোশাক কারখানার ইটিপির জন্য শুল্ক্কমুক্ত সুবিধায় ইটিপির মেশিনারিজ আমদানির সুবিধা চান।

বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিমউদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্র, কুটির ও এসএমই খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে। এ খাতের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কিন্তু ভ্যাট ট্যাক্স নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। মোট কর কম আদায় হলেও এ খাতে এনবিআরের লোকবল বেশি ব্যবহার হয়। এসব খাতে নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে কর প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তিনি ক্ষুদ্র ও তরুণ উদ্যোক্তাদের কমপক্ষে পাঁচ বছর কর অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেন। এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অর্থায়ন সমস্যা দূর করা না গেলে সিএমএসএমই খাতকে ধরে রাখা যাবে না।

অবকাঠামো (জ্বালানি, লজিস্টিকস ও স্বাস্থ্য) :ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাইজুর রহমান বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমানে ৯০ হাজার চিকিৎসক ও ৭০ হাজার নার্স রয়েছেন। সেরামের মতো ইনস্টিটিউট বাংলাদেশেও গড়তে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রাইভেট ইকোনমিক জোন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এএসএম মাইনুদ্দিন মোনেম বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ অন্যান্য লজিস্টিকস সেবা বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তামিম বলেন, জ্বালানির জন্য গ্যাস, তেল ও কয়লা আগামী ২০ বছর পর্যন্ত লাগবে। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি কেনা হচ্ছে। কিছু কেনা হচ্ছে স্পট মার্কেট থেকে। তিনি এলএনজি কেনার জন্য একটা সেল গঠনের প্রস্তাব করেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com