নববর্ষ ১৪২৮

শিল্পকলায় পুতুলনাট্য

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. রশীদ হারুন

পুতুল মানুষের চিরকালীন সঙ্গী। এমন জাতি-গোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণের মানুষ পাওয়া দুস্কর, যারা শিশুর হাতে পুতুল তুলে দেন না তাদের কান্না থামিয়ে মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। মানব সভ্যতার সমান বয়সী এই পুতুল হাত দ্বারা অথবা সুতা কিংবা কাঠির সাহায্যে নাড়াচাড়া করিয়ে বিনোদন ও লোকশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মানুষ ব্যবহার করে আসছে; তার ইতিহাস-ঐতিহ্যও হাজার বছরের অধিককাল। ইতিহাস ও প্রামাণ্য দ্বারা স্বীকৃত যে ভারতবর্ষ পুতুলনাট্যের আদিভূমি। বাংলাদেশেও পুতুলনাট্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের - এ কথা ইতোমধ্যে প্রমাণিত গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমে। অবশ্য নৃত্যভঙ্গিমায় সঞ্চলমান এই শিল্প আঙ্গিকটি এ অঞ্চলে পরিচিত 'পুতুলনাচ' পরিভাষায়; যদিও এটি নৃত্যের কোনো আঙ্গিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি কোনোকালে। আঙ্গিক শৈলী, পরিবেশনা, শিল্পকুশলতা ইত্যদি বিবেচনায় এটি পরিপূর্ণভাবে থিয়েটারের একটি সমৃদ্ধ শাখা বিধায় একে বর্তমানে অভিহিত করা হয় 'পুতুলনাট্য' হিসেবে।

বিশ্বসভ্যতার আদি শিল্পকলাগুলোর অন্যতম পুতুলনাট্য। বাংলা ভাষায় পুতুলনাট্যের পরিভাষা রূপে 'পুতুলনাচ', 'পুতুলবাজি' প্রভৃতি প্রচলিত। ইংরেজি Puppet, Puppetry, Puppet Show, Puppet Theatre, Marionette
প্রভৃতি রীতি ও আঙ্গিক বাংলা পুতুলনাট্যের সমার্থক।

প্রাচীনকাল থেকেই পুতুলনাট্য সর্বশ্রেণির দর্শকের আনন্দ বিনোদনের শিল্পসঙ্গী। কৃত্য এবং মানুষের শিল্পরস আস্বাদন ও আনন্দদানের শিল্পমাধ্যম রূপে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পুতুলনাট্যের প্রসার ঘটেছে। তবে আধুনিককালে শুধু বিনোদন নয়; শিক্ষা বিশেষ করে শিশু-শিক্ষা, তথ্য-প্রচার, গণসচেতনতা, বিজ্ঞাপন, পরিবেশ-উন্নয়ন, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক উন্নয়ন, মনোচিকিৎসা, প্রতিবন্ধী শিশুর বিকাশ, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন প্রভৃতিতে পরিবেশনার জন্য পুতুলনাট্য বা পাপেট্রি একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে নানা দেশে প্রচলিত। সাম্প্রতিক সময়ে ইলেকট্রনিক স্ট্ক্রিন মিডিয়ায় অ্যানিমেশনের মাধ্যমে

আনন্দ-বিনোদনের যে ধারা প্রসার লাভ করেছে; মনে করা যায়, এর অন্ত-প্রেরণাতেও ক্রিয়াশীল ছিল পুতুলনাট্য। আধুনিককালের গবেষক পুতুলনাট্যের সংজ্ঞায় বলেছেন- "মাটি, কাপড়, কাঠ, কাগজ, শোলা, খড়, ফোম প্রভৃতি সহযোগে নির্মিত নড়নক্ষম মানব, পশু, পাখি বা ব্যবহার্য সামগ্রীর প্রতিমূর্তিকে সুতা, তার, কাঠি বা দণ্ড, হাত-আঙুল প্রভৃতি দ্বারা এক বা একাধিক অভিনেতা কর্তৃক নেপথ্য বা সম্মুখ থেকে সঞ্চালন বা চালনাপূর্বক কথোপকথনের মাধ্যমে কোনো বিষয়বস্তু দর্শকের সম্মুখে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন বা অভিনয় প্রদর্শন করাকে বলা হয় 'পুতুলনাট্য' (Puppet Theatre)।"

বাংলাদেশে অর্থাৎ বাংলাভাষী অঞ্চলে কবে থেকে পুতুলনাট্যের যাত্রা শুরু হয়েছে, তার সঠিক তথ্য আজ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিভিন্ন গ্রন্থ, বর্ণনা কিংবা স্মৃতিচারণ থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের আলোকে এ দেশের পুতুলনাট্যের ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা যায় মাত্র। মধ্যযুগের প্রায় সব প্রধান কবির রচনায় 'পুতুল' কিংবা 'পুতুলবাজি' বা 'পুতুলনাচ'-এর উল্লেখ দৃষ্ট হয়। পণ্ডিতদের অভিমত, সমকালে পুতুল ও পুতুলনাট্যের ব্যাপক প্রচলন ছিল বিধায় তৎকালে রচিত বিবিধ রচনায় এসব প্রসঙ্গ বিদ্যমান।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুতা-পুতুলনাট্যের 'আদি উৎস' রাজস্থানি 'কাঠপুত্‌লী'- এ কথা মান্য করেন কোনো কোনো গবেষক। তাদের এ রকম মত পোষণ করার মূল (একমাত্র?) সূত্র হলো পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার হাঁসখালী থানার মুড়াগাছা কলোনিতে বসবাসরত প্রবীণ পুতুলনাট্য শিল্পীর অভিজ্ঞতা-প্রসূত স্মৃতিচারণা। ওই কলোনিতে পুনর্বাসিত প্রায় ১০০টি পুতুলনাট্য দলের প্রবীণ শিল্পী সবাই ১৯৪৭ সালের দেশ-বিভাজনের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বাকেরগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে অভিবাসী হয়েছেন। অভিবাসী পুতুলনাট্য শিল্পীদের স্মৃতিচারণাকে উদ্ৃব্দত করে বলা হয়েছে, তৎকালীন মহকুমা পিরোজপুরের খেজুরতলা গ্রামে মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্ম প্রচার ও কৃত্যের অংশ হিসেবে প্রচলিত 'রাধাপাগলের মেলা'য় এসেছিল রাজস্থান থেকে সুতাচালিত কাঠপুত্‌লীর দল। ওই দলের পুতুলনাচ দেখে কোনো কোনো তরুণ দর্শকের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় অনুরূপ পুতুলনাচ সৃজনের। খুলনা জেলার কালশিরা গ্রামের কালিপদ মালাকার নামক অভিজ্ঞ লোকশিল্পীর সহায়তায় কাঠের পরিবর্তে মাটি ও শোলা (উলুখাগড়া) সহযোগে পুতুল নির্মাণপূর্বক প্রস্তুতি নেওয়া হয় পুতুলনাচ তথা পুতুলনাট্য পরিবেশনার। প্রায় শতবর্ষী প্রবীণ শিল্পী জিতেন হালদারের বরাতে জানা যায়, তারা ১১ জন মিলে গঠন করেন এ অঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রথম পুতুলনাট্যের দল। ওই দলে ছিলেন অভিনেতা সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, কণ্ঠশিল্পী শশিভূষণ মণ্ডল, ঢোলবাদক যজ্ঞেশ্বর হালদার, নৃত্যশিল্পী অর্থাৎ পুতুলনাচিয়ে তারিণী হালদার, সহকারী পুতুলনাচিয়ে জিতেন হালদার। উল্লেখ্য, উপরোক্ত শিল্পীরা দেশ বিভক্তির পর পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে পূর্বোক্ত মুড়াগাছা কলোনিতে পুনর্বাসিত হয়ে জীবিকার নিমিত্তে নতুন করে গড়ে তোলেন 'ভারতমাতা পুতুলনাচ' শীর্ষক সংগঠন। বর্ণিত শিল্পীদের অভিপ্রায়ে রাজস্থানের প্রচলিত 'কাঠপুত্‌লী' গ্রামবাংলার লোক মৃৎশিল্পীর সৃজনি কুশলতায় 'সুতা পুতুলনাট্য রূপে আসরে নেমেছে' বাংলার জনমানুষের চিত্তরঞ্জনের নিমিত্তে। উপরোক্ত তথ্য-প্রামাণ্যের আলোকে মনে করা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান ধারার পুতুলনাট্য চর্চার ঐতিহ্য শতবর্ষের বেশি নয়; যা মেনে নেওয়া কষ্টকর। 'অবিভক্ত বাংলায় প্রথম পুতুলনাচের পত্তন হয় বগুড়া ও রাজশাহী জেলায়'- এরূপ অভিমত পোষণ করেন কেউ কেউ। এ ক্ষেত্রেও দাবি করা হয়, রাজস্থানের কোনো একটি 'কাঠপুত্‌লী' দল রাজশাহীতে অনুষ্ঠান করতে আসে। তার প্রভাবে প্রথমে রাজশাহী এবং ক্রমে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে গড়ে ওঠে পুতুলনাট্যের দল। এই মন্তব্যের সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ মেলেনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বলা হয় বাংলাদেশের পুতুলনাট্যের 'প্রাণকেন্দ্র'। জেলার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পালকে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম পুতুলনাচ প্রচলনকারী বলে অতিশয়োক্তি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো কোনো মহল। তবে নানা উৎসে জানা যায়, কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল, গিরীশ আচার্য, মো. তারু মিয়া প্রমুখের উদ্যোগে একাধিক দল গঠন ও দেশের নানা প্রান্তে ব্যাপক প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুতুলনাট্য। এ ছাড়া গুণী শিল্পী ধন মিয়ার আজীবন সাধনা ও চর্চার ভেতর দিয়ে জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুতুলনাট্য। বস্তুতপক্ষে বর্তমানে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্য বলতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুতুলনাট্যকেই বোঝেন দেশ-বিদেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত।

বিবিধ তথ্য-উপাত্ত এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য পর্যালোচনায় দৃষ্ট হয়, পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির (১৯৪৭) আগে অভিন্ন বাংলায় ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্যের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট অধিকাংশই ছিলেন একেবারে প্রান্তিক শ্রেণির; নিম্নবর্ণের হিন্দু জাতি-গোষ্ঠীর। সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার কারণে ও দেশ বিভাগের পরবর্তী সময়ে তাদের প্রায় সবাই চলে যান সীমান্তের ওপারে- পশ্চিমবঙ্গে। ফলে সৃষ্টি হয় ব্যাপক শূন্যতা। এ সময় ধীরে ধীরে উদ্ভব ঘটে মুসলমান পুতুলনাট্য শিল্পীদের দ্বারা পরিচালিত পুতুলনাট্য। পূর্বোক্ত হিন্দু সমাজের ব্যক্তিবর্গ পরিচালিত দলে কিছু মুসলমান ব্যক্তিও কাজ করতেন (যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কালু মিয়া, তারা মিয়া, ধন মিয়া প্রমুখ)। হিন্দু শিল্পীরা চলে গেলে তাদের রেখে যাওয়া কিংবা তাদের কাছ থেকে খরিদ করা পুতুল ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে এবং পূর্বতন দলে কাজের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে মুসলমান শিল্পীদের পুতুলনাট্য সংগঠন। যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার 'রয়েলবীণা পুতুলনাচ', সাতক্ষীরার সোবাহান মিয়ার পুতুলনাট্যের দল প্রভৃতি। স্মর্তব্য, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কিংবা হুবহু অনুকরণে তৈরি পুতুল, নামে মাত্র সাজপোশাকের পরিবর্তন করে পূর্ব প্রচলিত পালা-গল্প-কাহিনি পরিবেশনা এ শিল্প বিকাশে নতুন কোনো মাত্রা যুক্ত করতে পারেনি। বরং অবিভক্ত বাংলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আদৃত ও জনপ্রিয় রামায়ণ, মহাভারত, রাধা-কৃষ্ণ, চৈতন্যলীলা প্রভৃতির আখ্যানভিত্তিক বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে হারাতে থাকে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা। দেশভাগের পর এ অঞ্চলের অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান নামক নব্য রাষ্ট্রের ধর্মীয় চেতনা ও জনরুচির পরিবর্তন ঘটতে থাকায় উল্লিখিত বিষয়বস্তু দর্শক-আগ্রহ হারাতে থাকে। অথচ এ শিল্পের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের দিয়ে সময়োপযোগী বিষয় ও ভাষা নির্মাণ করার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। তা ছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্রে আসীন তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীও এদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃত্যনির্ভর লোকশিল্পকলা বিকাশের ক্ষেত্রে বৈরী বা প্রতিবন্ধক ছিল। এমতাবস্থায় পুতুলনাট্যের লোকশিল্পীরা পরিবর্তিত অবস্থা, দর্শকচেতনা এবং নিজেদের টিকে থাকার লক্ষ্যে কিছু পরিবর্তন-সংযোজন-বর্জনপূর্বক পরিবেশিতব্য বিষয়বস্তুকে সময়োপযোগী করার নিমিত্তে প্রয়াস নেন। এ ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধন মিয়া অগ্রগণ্য। লক্ষ্য করা যায়, বিষয়বস্তুতে রাম-সীতার পরিবর্তে রূপবান-রহিম; রাধা-কৃষ্ণের স্থলে আলোমতি-প্রেমকুমার; বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের স্থৈে বেদে-বেদেনির গল্প প্রভৃতি প্রতিস্থাপিত হয়। এ ছাড়া কিছু খণ্ড-কাহিনিচিত্র, বিষয়ভিত্তিক ও চরিত্রনির্ভর মামুলি পরিবেশনার সংযুক্তি ঘটে। যেমন- মাছ শিকারি ও কুমির, কাঠুরিয়া ও বাঘ, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর ঝগড়া, কৃষাণ-কৃষাণী, ভানুমতির বিয়ে ইত্যাদি। নানা আঙ্গিকের জনপ্রিয় গান এবং সিনেমা-যাত্রার চটুল গানের সঙ্গে পুতুলের নৃত্য প্রদর্শনও বড় স্থান করে নেয় পুতুলনাট্যের পরিবেশনায়। তবে এসব পরিবর্তন বা সংশোধন কেবল সাময়িক আবেগ বা আবেদন তৈরি ছাড়া কোনো নান্দনিকবোধ সৃজনে সমর্থ হয়নি।

দেখা গেছে, এই ভূখণ্ডে একদা বিনোদন ছাড়াও ধর্মীয় ও লোকশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল পুতুলনাটক। নানা মুনির নানা রচনায় প্রচুর প্রাসঙ্গিক তথ্য মিলেছে পুতুলনাট্য অভিনয় এবং এর নানা কীর্তি সম্পর্কে। আমরা আরও জেনেছি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাভা দীপপুঞ্জ পরিভ্রমণকালে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে লেখা পত্রে সেখানে দেখা পুতুলনাটক সম্পর্কে বলেছেন, 'এ যেন মহাভারত শিক্ষার একটা ক্লাসে পাঠের সঙ্গে ছবির অভিনয়-যোগে বিষয়টা মনে মুদ্রিত করে দেওয়া। মনে করো, এমনি করে যদি স্কুলে ইতিহাস শেখানো যায়, মাস্টার মশায় গল্পটা বলে যান আর একজন পুতুল-খেলাওয়ালা প্রধান প্রধান ব্যাপারগুলো পুতুলের অভিনয় দিয়ে দেখিয়ে যেতে থাকে, আর সঙ্গে সঙ্গে ভাব-অনুসারে নানা সুরে তালে বাজনা বাজে, ইতিহাস শেখাবার এমন সুন্দর উপায় কী আর হতে পারে।' (১৭ সেপ্টেম্বর ১৯২৭, জাভা; যাত্রী, রবীন্দ্র রচনাবলি, সুলভ সংস্করণ, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা-৫৩৮)। এছাড়া শিশু-কিশোরদের শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা হলো, 'শিশু প্রকৃতির সৃজন। ... প্রত্যক্ষ জগৎ আমাদের কাছে যতটা সত্য, ছড়ার স্বপ্নজগৎ নিত্য স্বপ্নদর্শী বালকের নিকট তদাপেক্ষা অনেক অধিক সত্য। এইজন্য অনেক সময় সত্যকেও আমরা অসম্ভব বলিয়া ত্যাগ করি এবং তাহারা অসম্ভবকেও সত্য বলিয়া গ্রহণ করে।' আমরাও বিশ্বাস করি 'সকল অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার শিল্পমাধ্যম হলো পুতুলনাট্য'। শিশুর কল্পনার ভুবনের বিচিত্র নাগরিকেরা পুতুলের মাধ্যমে চরিত্র হয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। পুতুলের ছান্দিক চলন ও গীত-ভাষ্যে দৃশ্যমান হবে শিশুর স্বপ্নভরা 'অসম্ভবের সম্ভব জগৎ'।

বাংলাদেশে অনেক দিন ধরে পুতুলনাট্যের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে কালো অধ্যায়ের সূত্রপাত হয়েছিল তার শিকার অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্প আঙ্গিকের মতো পুতুলনাট্যও। তদুপরি প্রান্তিক পর্যায়ে অনুসন্ধানপূর্বক সন্ধান মিলেছে অন্তত পঞ্চাশটি পুতুলনাট্য সংগঠনের। তবে বাস্তবক্ষেত্রে সক্রিয় আছে মাত্র ১২-১৫টি। তারা প্রায় সকলেই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অতি পুরোনো জীর্ণ পুতুল দিয়ে কিছু খণ্ড কথাবার্তা, হাস্যকৌতুক-নকশা, সিনেমার গান ইত্যাদি পরিবেশন করে। এবং তাদের এসব পরিবেশনা অনিয়মিত, শুধু মেলাকেন্দ্রিক। একদা এই অঞ্চলে মেলা (বৈশাখী মেলা, রথের মেলা, ওড়াকান্দির মেলা, বাড়োয়ারি মেলা, সাধুর মেলা, বান্নি প্রভৃতি) মানেই ছিল পুতুলনাচ (পুতুলনাটক), সার্কাস, যাত্রা ইত্যাদি দেখা।

বিশ্বের নানা দেশে পুতুল তথা পাপেট দ্বারা স্কুলে শিশুশিক্ষা, চিকিৎসা, টেলিভিশন রিয়েলিটি শো ইত্যাদি চালু আছে। সিঙ্গাপুরে প্রতিবছর ২০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পুতুলনাট্য পরিবেশনা এবং শিশুদের সঙ্গে পাপেটের দিনভর সখ্য গড়ে তোলার জন্য একটি পুতুলনাট্য সংস্থাকে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অনেক রাজ্যে স্কুল পর্যায়ে পুতুলনাট্য শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তক অনুসরণে পুতুলনাটক নির্মাণ শেখানো হয়। বাংলাদেশে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার পরিচিতি ও খ্যাতি অর্জন করেছেন প্রধানত টেলিভিশনে পাপেট পরিবেশনা বা নির্মাতা হিসেবে। একথা অনস্বীকার্য যে শহুরে বা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের মাঝে পাপেটের যে পরিচিতি তা শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের মাধ্যমে। তবে তার পাপেট কারিগরি দিক থেকে জটিল, ব্যয়বহুল এবং সেগুলো নির্মিত হয় শুধু টেলিভিশনের জন্য।

ঐতিহ্যবাহী ধারার পুতুলনাট্যকে টিকিয়ে রাখা এবং একে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ করে এই শিল্প আঙ্গিকের অমিত শক্তি ও সম্ভাবনার দিকগুলোকে নানাবিধ কাজে ব্যবহার ও উজ্জীবিত করার লÿে্য পুতুলনাট্য গবেষণা ও উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে উদ্বুদ্ধ করার অভিপ্রায়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এরমধ্যে আছে ২০১৩ থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব পুতুলনাট্য দিবস উদযাপন এবং প্রতি বছর একজন শিল্পীকে সম্মাননা প্রদান, ঐতিহ্যবাহী দলগুলো নিয়ে প্রতি বছর পুতুলনাট্য উৎসবের আয়োজন, ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্য শিল্পী ও নবীন নাট্যকর্মীদের নিয়ে কর্মশালা, বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুতুলনাট্য উৎসবে বাংলাদেশ থেকে দল পাঠানো এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে 'পুতুলনাট্যশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০১৮' প্রণীত হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি পুতুলনাট্যের সংগঠন সৃজন ও কার্যক্রম শুরু করেছে; যারা ঐতিহ্যবাহী ধারার সঙ্গে গল্প বা বিষয়, পুতুল (পাপেট) নির্মাণ ও পরিবেশনায় সমকালীন বা আধুনিক চিন্তা মনন শিল্পকৌশল ইত্যাদি প্রয়োগ করে বলা যায় শুরু করেছে পুতুলনাটকের নবযাত্রা। মেলা, পার্বণ, সামাজিক উৎসবাদি আমাদের সংস্কৃতি থেকে প্রায় নির্বাসিত। ঐতিহ্যবাহী প্রায় সকল সাংস্কৃতিক শিল্পকলার চর্চা আমাদের যাপিত জীবনের তালিকা থেকে পড়েছে ঝরে- এমতাবস্থায় কেবল পুতুলনাট্য সমৃদ্ধ হবে বা বিকাশ লাভ করবে এমনটা নিশ্চয় আশা করতে পারি না আমরা। তবুও বিশ্ব পুতুলনাট্যের ভুবনে আমাদের পুতুলনাট্য যে কতটা সমৃদ্ধ এবং সম্ভাবনাময়, বিভিন্ন উৎসবে অংশগ্রহণ করে আমাদের সে প্রত্যয় দৃঢ় হয়েছে! আমাদের বিবেচনায় শিক্ষিত, মেধাবী সৃজনশীল, স্বপ্নচারী উদ্যমী, থিয়েটারপ্রেমী তরুণদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্ভব এ শিল্পের গূঢ় শক্তিকে আবিস্কার এবং সম্ভাবনার নানাক্ষেত্রে কাজে লাগানো।



লেখক : শিক্ষাবিদ প্রাবন্ধিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com