শুচি হোক ধরা

হাজার বছরের উৎসব

নববর্ষ ১৪২৮

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাশেম খান

পহেলা বৈশাখ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যগত একটি উৎসব। পহেলা বৈশাখ তারিখটিকে এ জন্যই উৎসব বললাম যে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে যেখানেই থাকুক; বাঙালির জীবনে সেখানে এই দিনটি অপার, নির্মল আনন্দ বয়ে আনে। যে যেমন করে পারে দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে উদযাপন করে। বহু আগে থেকেই গ্রামে দিনটি উদযাপিত হতো মূলত মেলার মধ্য দিয়ে। এর সঙ্গে যাত্রাপালা, সার্কাসসহ বিভিন্ন রকম খেলাধুলার আয়োজন থাকত। এখন সে উৎসবকে আমরা শহরেও নিয়ে এসেছি।

শহুরে বলতে যা বোঝায়, আমরা বাঙালিরা সেটা যে এখনও হতে পারিনি, তা ঈদের ছুটি দেখলেই বেশ বোঝা যায়। ঈদের ছুটিতে ঢাকা শহর খালি হয়ে যায়। এর কারণ, আমাদের এখনও মূল রয়ে গেছে গাঁয়ে। তাই সুযোগ পেলেই আমরা ছুটে যাই। এই যে গ্রামের প্রতি, মাটির প্রতি, প্রকৃতির প্রতি টান; সেটারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে পহেলা বৈশাখে। পহেলা বৈশাখ নিজেদের সংস্কৃতিমুখী হতে প্রেরণা জুগিয়েছে। এটা যে খুব নিয়ম করে আমরা উদযাপন করি, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু করি। বৈশ্বিক কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত প্রভৃতিতে খ্রিষ্টীয় সন ব্যবহার করতে হয়। তারপরও আমরা কিন্তু পহেলা বৈশাখ বা বাংলা মাস, সন ভুলতে পারি না। এই ভুলতে না পারার কারণ আমরা ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা মাস বা ঋতুর ওপর নির্ভরশীল। এই ঋতুগুলো আমাদের এমনভাবে আবর্তিত করে বা আমরা আবর্তিত হই; চেতনে, অবচেতনে এর থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। স্বাধীনতার ৫০ বছরে শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতিতে আমরা অনেক এগিয়েছি। শিল্পের দিকে তাকাই- কৃষিনির্ভর শিল্পায়নই আমাদের দেশে সমৃদ্ধ হয়েছে। ধান, পাট, চা, চামড়া, খাদ্যদ্রব্য সবই কিন্তু কৃষিনির্ভর। আমাদের এই কৃষিনির্ভরতা বাংলা মাসকে নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। একজন কৃষক জানেন বৈশাখে তাকে কী করতে হবে, কী চাষ করতে হবে। বর্ষায় তার কী প্রস্তুতি নিতে হবে। এভাবে প্রতিটি ঋতুতে তার কী প্রস্তুতি দরকার তা তারা জানেন। শরতে ধান পুষ্ট হতে শুরু করে। হেমন্তে সে ধান কাটা হয়। তারপর আসে বসন্ত। এভাবে বছর ঘুরে আসে নতুন বছর। চৈত্রসংক্রান্তিতে আমাদের হিসাবের যে খাতাটা শেষ হয়; পহেলা বৈশাখে এসে আবার তার হালখাতা হয়। অর্থাৎ নতুন খাতা খোলা হয়। এ জন্যই পহেলা বৈশাখটা আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। ১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দিলেন, তখন আমি তরুণ শিল্পী। আমার ওপর দায়িত্ব এলো ৬ দফার মনোগ্রাম এবং সাজসজ্জার কাজের। লাহোরে ছয় দফা ঘোষণার পর এ বিষয়ে সবাইকে জানাতে ইডেন হোটেলের সামনে আওয়ামী লীগের একটা জনসভা হয়েছিল। সেখানে ৬ দফার লোগো, সভা-মঞ্চের সাজসজ্জা আমি নিজে করেছিলাম। কোনো মানুষ ছিল না; শুধু কিছু আকার-আকৃতি ও রং ছিল- বাংলাদেশের লোকশিল্পের নকশা, বাংলাদেশের ছয় ঋতুর ছয়টির রং। তৎকালীন যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন আমার বন্ধু। তিনিই বঙ্গবন্ধুর কাছে নকশার ব্যাখ্যা করেছিলেন। আমি তখন খুব ভয়ে ছিলাম- তিনি আমার এই অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজ পছন্দ করবেন কিনা ৬ দফার জন্য! জীবনযাপনের অর্থ, অর্থনৈতিক মুক্তির অর্থ কীভাবে নেবেন। কিন্তু তিনি সব গ্রহণ করলেন এবং তিনি এত খুশি হলেন যে, বহু বছর পর যখন সংবিধানের অলঙ্করণের জন্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন; তখন তিনি বললেন, 'তোমার এই শিল্পী তো আমার ৬ দফার অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছিল! বাংলাদেশের মানুষ ছয় ঋতু নিয়ে বাঁচে। আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য এই ছয় ঋতুর ওপর নির্ভর করে। আমার ৬ দফা এবং এই ছয় ঋতুর যে সমন্বয় সে করেছিল, আমি তা কোনোদিন ভুলতে পারি নাই।'

তিনি সব মনে রেখেছেন। তিনি বললেন, সংবিধানের জন্য আপনি ভালো শিল্পী নিয়ে এসেছেন। এটা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন। সংবিধানের অলঙ্করণে যে রংগুলো করেছি সেটিও ছয়টি ঋতুরই রং। প্রকৃতিকে আমরা শিল্পীরা সবচেয়ে বেশি ধরতে পারি; সাধারণ মানুষের তা সম্ভব হয় না। প্রত্যেকটি ঋতুতে মানুষের মনের একটা রং আছে, দৃষ্টিগতও একটা রং আছে। দৃষ্টির বাইরেও অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি করার একটি রং আছে। আমরা সেই রঙেরই প্রকাশ ঘটাতে চাই।

আজ যেভাবে পহেলা বৈশাখ আমরা পালন করি, এই যে ভালোবাসা-আনন্দ এবং পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক বিষয়ও চলে আসে; এটাও একটি আনন্দের বিষয়। এটা কিন্তু কেউ চাপিয়ে দেয় না। আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা- সর্বক্ষেত্রে একটি বিশাল অংশজুড়ে উদ্দীপনা-উত্তেজনা তৈরি করে বর্ষবরণ।

পহেলা বৈশাখকে সর্বজনীন সব মানুষের উৎসব বলা হয়। এটা একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব। হাজার বছরের ঐতিহ্য, যা আমরা কোনোদিন ভুলতে পারব না। একজন বাঙালিও যদি বেঁচে থাকে তবুও ভোলা যাবে না। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বিশ্বঐতিহ্যের অংশ। বিশ্বের সব মানুষের মঙ্গল কামনার এ যাত্রা। সব হারিয়েও বাঙালি কখনও হারবে না। অনেকেই আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে, তবুও পহেলা বৈশাখ পালন করব। করোনার এ সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবকিছু করার আহ্বান জানাচ্ছি। করোনা মোকাবিলায় আমাদের সরকার রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আমরা যেন সেই যুদ্ধে শামিল হই। আমরা যারা মাস্ক পরতে, নিয়মিত হাত ধুতে অবহেলা করছি; তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা এভাবে নিজেদের ক্ষতি করবেন না- এটাই হোক এবারের পহেলা বৈশাখে আমাদের প্রতিজ্ঞা। আমরা স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালন করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। হয়তো আমরা অনেককেই হারাব; ইতোমধ্যে অনেককে হারিয়েছি। তারপরও আমরা হারব না। আমাদের এগিয়ে যেতেই হবে। নিজেরা স্বাস্থ্যবিধি পালন করুন এবং যারা দিনমজুর, দিন আনে দিন খায়, অসহায় মানুষের প্রতি সদয় হোন। যে যতটুকু পারেন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসুন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা যে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলেছিলাম, তেমনি ঘরে ঘরে আপনারা দুর্গ গড়ে তুলুন করোনা প্রতিরোধে। করোনার কারণে হয়তো এবার পহেলা বৈশাখে আমরা সেভাবে মেলা করতে পারব না, শোভাযাত্রা করতে পারব না। কিন্তু আমাদের মনে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমরা ধারণ করব বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। বাংলায় হাসব, বাংলায় কাঁদব। বিশেষ করে শিক্ষিত মানুষ যারা কথা বলেন তারা যেন বাংলায় কথা বলেন। একাধিক ভাষা মিলিয়ে কথা বলবেন না। অহেতুক ইংরেজি শব্দগুলোকে বাংলায় মিলিয়ে ব্যবহার করবেন না। এটা অভ্যাসের বিষয়। ভালো সংস্কৃতির পরিচায়ক। আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি বিষয়ে সচেতন হতে হবে। পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি নেই; আমাদের মতো যারা শত্রুর সঙ্গে একসঙ্গে বাস করে। একাত্তরে যারা আমাদের শত্রু ছিল- আলবদর, রাজাকার তারা এখনও আমাদের দেশেই রাজনীতি করছে। আমাদের পাশাপাশি বাস করছে। এ জন্যই আমি বলি, পহেলা বৈশাখ পালন করাই আমাদের জন্য একটি যুদ্ধ। এই যুদ্ধ আমাদের চলবে। বাঙালি বেঁচে থাকবে। আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। সবাইকে নববর্ষের অভিনন্দন। সবাই ভালো থাকবেন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।



লেখক : চিত্রশিল্পী

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com