কভিড-১৯

'ভ্যাকসিন পাসপোর্ট' নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক

২০ এপ্রিল ২০২১ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২১

জাকারিয়া স্বপন

সম্প্রতি ভ্যাকসিন পাসপোর্ট নিয়ে পুরো পৃথিবীতেই বেশ কথা শোনা যাচ্ছে। এবং অনেকের মনেই নানান ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তাদের নতুন করে পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে, যা তাদের বিদেশ গমনের সময় লাগবে। শব্দটি বিতর্ক তৈরি করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এটা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এবং অনেক রাষ্ট্রপ্রধান এটা নিয়ে কথা বলছেন। তবে এটাকে যেন 'পাসপোর্ট' বলা না হয়, সেই বিষয়টি পুরো বিশ্বেই বড় আকারে এসেছে। বাংলাদেশেও আমরা এটাকে পাসপোর্ট বলতে শুরু করেছি। কিন্তু পুরো বিষয়টি একটু বোঝার ব্যাপার রয়েছে।

২.

'ভ্যাকসিন পাসপোর্ট' কোনো কাগজের পাসপোর্ট নয়। আমরা প্রচলিতভাবে যে পাসপোর্ট দেখে অভ্যস্ত, এটা তা নয়। মূলত এটা কোনো ধরনের পাসপোর্টই নয়। শুধু 'পাসপোর্ট' শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, যেহেতু এটা অনেকটা প্রচলিত পাসপোর্টের মতোই কাজ করে। তবে আবারও বলছি, কেউ যেন এটাকে সবুজ পাতার বাংলাদেশের পাসপোর্টের মতো কিছু মনে না করেন। কারণ পাসপোর্ট শুধু ব্যবহার করা হয় কারও আইডেন্টিটি নিশ্চিত করার জন্য এবং বর্ডার পার হওয়ার জন্য।

টিকার ক্ষেত্রে যখন এই টার্মটি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি মূলত একটি ছাড়পত্র- যার মাধ্যমে প্রমাণ করা যাবে, আপনি টিকা নিয়েছেন। এটাকে এক ধরনের সার্টিফিকেট বলতে পারেন। তবে এটা ছাপানো কোনো সার্টিফিকেট নয়। আপনার টিকা দেওয়ার তথ্যটি ডিজিটাল করে সেটি আপনার স্মার্টফোন অ্যাপের ভেতর কিংবা কিউআর কোড দিয়ে দেওয়া হলো। যেখানে আপনার কভিড পরীক্ষার ফলাফলও থাকতে পারে। মূলত একটি ডিজিটাল সিগনেচার, যার মাধ্যমে অন্যপক্ষ বুঝতে পারবে আপনার টিকা দেওয়ার স্ট্যাটাসটা কী!

তবে এখানে বলে রাখা ভালো, পৃথিবীর অনেক দেশ ডিজিটাল পাসপোর্ট (যা সত্যিকারের পাসপোর্ট) চালু করেছে, যে পাসপোর্ট আপনি আপনার মোবাইল ফোনে নিয়ে নিতে পারেন এবং সেটি নিয়ে বর্ডার ক্রস করতে পারবেন, বিমানবন্দর দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারবেন। ওখানে ওই পাসপোর্টটি পড়ার মতো যন্ত্র বসানো আছে। এবং সেটি প্রকৃত অর্থেই পাসপোর্ট। আপনার যেমন সবুজ পাসপোর্ট রয়েছে। এটাকে এখনও ডিজিটাল করা হয়নি। তবে এক সময়ে বাংলাদেশের এই সবুজ পাসপোর্টও ডিজিটাল হয়ে যাবে।

কিন্তু এখন আমরা টিকার যে পাসপোর্টের কথা বলছি, সেটি ওই পাসপোর্টের সঙ্গে কোনো মিল নেই। এটা হলো কেবল আপনি টিকা নিয়েছেন কিনা, সেটি বোঝার জন্য একটি ডিজিটাল সার্টিফিকেট, যা আপনি কোথাও দেখালে তাদের কাছে যদি ওই যন্ত্র থাকে, তাহলে আপনার এই ডিজিটাল সার্টিফিকেটটি পড়ে বুঝতে পারবে, আপনি টিকা দিয়েছেন। নইলে আপনার টিকা দেওয়া কার্ডটি পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হতে পারে।

আপনার টিকা দেওয়ার তথ্য যেহেতু বাংলাদেশ সরকারের কাছে আছে, তাই তারাই আপনার টিকার তথ্যসহ একটি কিউআর কোড তৈরি করে আপনাকে দিতে পারবে, যা আপনি আপনার স্মার্টফোনের অ্যাপের ভেতর রেখে দেবেন। এবং এটা শুধু পড়তে পারবে আরেকটি অ্যাপ দিয়ে।

অনেকেই ভাবতে পারেন, আপনার এই টিকা দেওয়ার তথ্য বিদেশে গেলেও কেউ দেখতে পারবে কিনা? এখন পর্যন্ত এই ভ্যাকসিন পাসপোর্ট প্রতিটি দেশ তার নিজেদের জন্য করছে। গ্লোবাল তথ্য ভান্ডার হিসেবে এটা ব্যবহার হবে কিনা সেটা এখনও নিশ্চিত না। কারণ এখানে অনেক প্রাইভেসি সংক্রান্ত বিষয় জড়িত রয়েছে।

৩.

বাংলাদেশে ততটা না হলেও পৃথিবীর অনেক দেশ প্রাইভেসির বিষয়ে খুবই সেনসেটিভ। তারা এখনই সরকারকে জিজ্ঞেস করছে, কীভাবে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ওই অ্যাপের ভেতর রাখা হচ্ছে এবং কীভাবে আরেকটি প্রতিষ্ঠান সেটি দেখতে পাচ্ছে- সেগুলো পরিস্কার করার জন্য। এবং এই একটি কারণেই অনেক দেশে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট নিয়ে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আবার এই পৃথিবীতে এমন মানুষও অনেক আছে, যারা সুযোগ পেয়েও টিকা নিচ্ছেন না। এটা বাংলাদেশে যেমন আছে, বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। এখন তারা বিষয়টি নিয়ে চিৎকার করছে এই বলে যে, তারা যেহেতু টিকা দেয়নি, তাই এই তথ্য সবার কাছে থাকলে তাদের কিছু কিছু স্থানে প্রবেশ করতে দেওয়া নাও হতে পারে। এই ভয়ে তারা এখন ভ্যাকসিন পাসপোর্টের বিষয়টিকে নিয়ে বিতর্ক শুরু করছে।

আমেরিকার কিছু কিছু রাজ্য ঘোষণা দিয়েছে- কোনো দোকানপাট তাদের ক্রেতাদের কাছে টিকার পাসপোর্ট দেখতে চাইতে পারবে না। টিকা সে দিক বা না দিক, তার কেনাকাটা করার অধিকার ঠিকই থাকবে। এই অধিকার থেকে তাকে কেউ আটকাতে পারবে না। তারা এটাও বলছে যে, যদি শপিংমলে, সিনেমায়, স্টেডিয়ামে এই পাসপোর্ট দেখতে চাওয়া হয়, তাহলে নতুন করে জটিলতা তৈরি করবে। দুটো ভিন্ন ক্লাস তৈরি হবে- একদিকে টিকা দেওয়া মানুষ, আরেকদিকে টিকা ছাড়া মানুষ। এই ক্লাস তৈরি করা ঠিক হবে না বলেই মনে করে অনেক রাজ্য। বিভিন্ন দেশের সরকার মনে করছে, এই ধরনের একটি টুলস দিয়ে মানুষের ভেতর ভেদাভেদ তৈরি করা ঠিক হবে না।

৪.

তবে কিছু সরকার এবং ব্যক্তি এর বিরোধিতা করলেও বিমানবন্দরে এর ভালো কিছু সুবিধা রয়েছে। যদি চট করেই জেনে ফেলা যায়, আপনি টিকা দিয়েছেন, তাহলে এয়ারলাইন্সের পক্ষে আপনাকে ভেরিফাই করার সময় কম লাগবে- নইলে এই কাগজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পেল্গনে তুলতে সময় লাগবে। আপনার তথ্যটি ডিজিটাল অবস্থায় থাকলে পুরো প্রক্রিয়া খুবই দক্ষতাসম্পন্ন হবে।

আমেরিকার নিউইয়র্ক শহর এই টিকা পাসপোর্ট ব্যবহার করা শুরু করেছে। লুফথানসা ইতোমধ্যেই তাদের পেল্গনে এটা পরীক্ষা করে। আমেরিকার জেটব্লু পরীক্ষামূলকভাবে স্থানীয়ভাবে শুরু করেছে।

পাশাপাশি অনেক দেশ বিমানবন্দরে আগত যাত্রীদের টিকা দেওয়ার স্ট্যাটাস জানতে চায় এবং ধীরে ধীরে এর প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। সেক্ষেত্রে তারা যদি আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ থেকে (কিংবা সেই দেশের ডাটাবেজকে বিশ্বাস করে) এই তথ্য পেয়ে যায়, তাহলে সেই দেশগুলোর জন্য ঝামেলা অনেক কমে গেল। যেমন আপনি যদি সিঙ্গাপুরে যান, তখন তারা আপনার চৌদ্দগোষ্ঠী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে। সেক্ষেত্রে এই টিকা পাসপোর্ট একটি ভালো সমাধান হতে পারে।

তবে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিকার প্রমাণ দিতে হচ্ছে। তা না হলে কাউকে ক্লাসে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এই টিকা পাসপোর্ট খুব ভালো কাজে লাগবে।

জীবন যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে, তাতে সবার স্মার্টফোনে এই পাসপোর্টটি থাকতে পারে, যা আপনি পাবলিক প্লেসে গেলে কাজে লাগাবেন। যেমন- খেলার মাঠ, সিনেমা দেখতে যাওয়া, শপিংমল কিংবা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে। এটা আপনার জীবনের অঙ্গ হয়ে যেতে পারে।

৫.

এই পাসপোর্ট বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা কাজে লাগবে সেটি অবশ্য নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না। কারণ এখানে এখনও অসংখ্য মানুষ টিকা নেয়নি এবং তারা টিকা নেবে কিনা সেটি নিয়েও সংশয় রয়েছে। পাশাপাশি এই বিশাল জনসংখ্যার দেশে কোথায় কাকে আটকাবেন?

এই দেশে মানুষ নিয়ম মানতে রাজি নয়; মানুষ সুশৃঙ্খল নয়, তারা সামাজিকভাবে এখনও উন্নত নয়। বর্তমান বিশ্ব যে পাল্টে গেছে এবং এর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে যে জ্ঞান এবং নিয়মকানুনগুলোর প্রয়োজন হয়, তা দেশের বেশিরভাগ মানুষই জানে না। তাদের এগুলো শেখাতে হবে। নইলে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হবে। সমাজের ভেতর থেকেও মানুষকে বুঝতে হবে, কোনটা করলে সামগ্রিকভাবে খারাপ হবে নাকি ভালো হবে। আমাদের সেই বোধটুকু কম। যেহেতু আমাদের মানুষের আধুনিক শিক্ষার হার কম, তাই এটাকে এখনই পাসপোর্ট না বলে সার্টিফিকেট বলা যেতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; কলাম লেখক
zs@priyo.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com