সমকালীন প্রসঙ্গ

পরিকল্পিত টিকা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলুন

প্রকাশ: ০৪ মে ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৪ মে ২১ । ০৪:০৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোস্তফা হোসেইন

দেশে গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে টিকা দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮১ লাখ মানুষকে। টিকার মজুদ ও অপেক্ষমাণ টিকাগ্রহণকারীর হিসাব অনুযায়ী ঘাটতি প্রায় ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০। সুতরাং গণটিকাদানের বিষয়টি এখন অনিশ্চিত হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, যারা প্রথম ডোজ দিয়েছেন তাদের দ্বিতীয় ডোজ অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। ৮ সপ্তাহ ব্যবধানে দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগের পরিকল্পনা এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হবে কিনা, সন্দেহ আছে। হাতে মজুদ না থাকার পরও কেন হিসাব ছাড়া প্রথম ডোজ এত সংখ্যক দেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যা চোখে পড়েনি।

ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারছে না, এটা অনেক আগেই বোঝা গেছে। রাশিয়ান টিকা স্পুটনিক-ভি জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়া গেছে ২৭ এপ্রিল। এখানে 'জরুরি' শব্দটা উল্লেখযোগ্য। স্পুটনিক-ভি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন লাভ করেনি। সেখানে বাংলাদেশে এই টিকা অনুমোদনের কারণ কী? বিষয়টির আইনগত দিক বিবেচনা করলে এক রকম আর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ভিন্নরকম। আবার পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনীতির দিকও আছে। বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাফল্যকে স্বীকৃতি দিতে ১০ বার ভাবে। এটা রাশিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্র বলয় থেকে রাশিয়ার আবিস্কারকে স্বীকার না করার প্রবণতা আছে। একইভাবে চীনের টিকা নিয়েও খোঁচাখুঁচি আছে। অথচ রাশিয়ার টিকা সে দেশের প্রেসিডেন্টের কন্যাসহ সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োগ করা হয়েছে। লাখ লাখ ডোজ টিকা তাদের জনগণের ওপর প্রয়োগও করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে তারা স্পুটনিক-ভি টিকাকে অনুমোদন করেছে। তার মানে এই টিকা গ্রহণে আইনগত বিপত্তি থাকছে না। আবার ঔষধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাহলে সাধারণ্যে যেভাবে টিকা দেওয়া হচ্ছিল, এই টিকা সেভাবে দেওয়া হবে না? প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে জরুরি বিষয়টি নির্ধারণ হবে কীভাবে?

স্পুটনিক-ভি সম্পর্কে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। বিভিন্ন নিবন্ধে এই বিতর্ককে রাজনৈতিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গবেষকরা। মানুষের জীবন নিয়ে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও বাস্তবতা হচ্ছে স্পুটনিক-ভি বিষয়ে তারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদেরও অনেকেই এ মত প্রকাশ করেছেন। রাশিয়ার ওষুধ বলেই কি তা পরিত্যাজ্য? এমন প্রশ্ন আসতেই পারে।

২৭ এপ্রিল বাংলাদেশসহ এশিয়ার ৬ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন। চীনের নেতৃত্বে গঠিত নতুন প্ল্যাটফর্ম 'ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি ফর কভিড ফর সাউথ এশিয়া'য় বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো থাকলেও নেই ভারত। সুতরাং এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার কারণে রাজনৈতিক কোনো প্রভাব পড়বে কিনা, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। যদিও বাংলাদেশের এই উদ্যোগ ন্যায়সংগত এবং প্রয়োজন মেটানোর জন্য জরুরি হিসেবেও গণ্য।

অন্যদিকে, ঔষধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পেয়েছেন, তারা দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাই পাবেন। কিন্তু প্রায় ১৪ লাখ টিকার ঘাটতি পূরণ হবে কীভাবে? প্রথমবার যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা গ্রহণ করেছেন, তাদের যদি একই টিকা দিতে হয়, তখন যে সেই মজুদ নিশ্চিত করতে হবে? সেটা কীভাবে হবে তা বোঝা যাচ্ছে না।

সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে- এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। কিন্তু মার্চ ও এপ্রিল মাসের টিকা দেওয়ার হিসাবটা যদি দেখি, তাহলে কিছুটা ভাবনার কারণ থেকেই যায়। আমরা দেখেছি এপ্রিল মাসের আগে প্রায় ৫৩ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এপ্রিল মাসে এসে তা ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়ে। তালিকাভুক্ত হওয়ার আবেদনগুলোর সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। এটা প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ হওয়ার বেশ আগে থেকেই দেখা গেছে। তাতে অনেকেই মনে করছিল চাহিদা অনুযায়ী মজুদ না থাকায় এই ধীরগতিতে যেতে হয়েছে। অন্য ভাবনা ছিল, ধীরগতিতে এগিয়ে গিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করবে সরকার। কিন্তু আমাদের দেখতে হলো এক সময় প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া বন্ধ করে দিতে হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন স্পুটনিক-ভি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এই সিদ্ধান্তটা কি এক মাস আগে নেওয়া যেত না? যদি নেওয়া হতো, তাহলে কি টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ করতে হতো? টিকা ব্যবস্থাপনায় আন্তরিকতা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হোক- এটা কাম্য নয়। কিন্তু সমন্বয়ের প্রশ্নটিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুনাম পৃথিবীব্যাপী। কিন্তু করোনার টিকার ক্ষেত্রে আমরা অতীতকে ধরে রাখতে পারিনি। একটা সাধারণ বিষয়ের অবতারণা করা যেতে পারে। আমাদের এখানে ভিটামিন ডি ডোজ দেওয়ার উদাহরণ দেওয়া যায়। এই টিকাগুলো দেওয়ার সময় আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রহীতার দুয়ারে গিয়েছেন। কোনো অনলাইন রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু করোনার টিকার ক্ষেত্রে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। প্রযুক্তি ব্যবহার যতটাই বাড়ুক না কেন, আমাদের দেশের মানুষ এখনও ওই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে, সবাই স্বেচ্ছায় রেজিস্ট্রেশন করে টিকা নেবেন।

বাচ্চাদের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক বছর আগের কথাও যদি ধরি, তখনও কিন্তু আমাদের ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড ছিল না। এখন ন্যাশনাল আইডি কার্ডে একজন নাগরিকের সব তথ্য আছে। শুধু এনআইডি প্রদর্শনের মাধ্যমে যদি টিকা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে বর্তমান রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতির চেয়ে ভালো ফল দেবে। করোনা প্রতিরোধে টিকার বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। তা না হলে করোনা টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানও ধরে রাখা যাবে না।

  সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com