করোনা টিকার বাধ্যতামূলক লাইসেন্স ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০৬ মে ২১ । ১৫:৫০

 ড. মাহ্‌তাব শাওন

২০২০ সালের অক্টোবর মাসে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে
(ডব্লিউটিও) কভিড-১৯ সম্পর্কিত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সংশ্নিষ্ট প্রযুক্তিগুলোর
মেধাস্বত্ব অধিকারের ওপর অস্থায়ী একটি ছাড় আনার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি
শতাধিক দেশের এবং বিভিন্ন সংস্থা ও জোটের সমর্থন পেয়েছে। গত ১০ ও ১১ মার্চ
ডব্লিউটিওর সভায় এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং আলোচনা অব্যাহত থাকার
কথা।

যেহেতু শিল্পোন্নত দেশগুলো এ প্রস্তাবের পক্ষে নেই; শেষ পর্যন্ত
প্রস্তাবটি ডব্লিউটিও কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে এ
প্রস্তাব অনুমোদিত বা প্রত্যাখ্যাত যা-ই হোক, কভিড-১৯ বা করোনা মহামারি
মোকাবিলায় জাতিরাষ্ট্রগুলো অনায়াসে ভাবতে পারে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিংয়ের
কথা, যা দ্য এগ্রিমেন্ট অন্‌ ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেক্ট্‌স অব ইন্টেলেকচুয়াল
প্রোপার্টি রাইট্‌স (ট্রিপ্স এগ্রিমেন্ট) (১৯৯৪)-এর আওতায় ডব্লিউটিওর
সদস্য রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের চিকিৎসা সরঞ্জাম বা চিকিৎসা সংক্রান্ত
প্রযুক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করার নিমিত্তে প্রয়োগ করার অধিকার রাখে।
ইতোপূর্বে এইডস মহামারির সময় অ্যান্টিআর্ট্রোভাইরাল ড্রাগের সরবরাহ বাড়ানোর
জন্য কিছু দেশ বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিংয়ের ব্যবহারকে একটি সফল নীতি হিসেবে
ব্যবহার করেছিল।

ট্রিপ্স এগ্রিমেন্টের অধীনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলো
বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত কোনো নতুন পণ্য কিংবা প্রক্রিয়া
উদ্ভাবকের অনুকূলে পেটেন্ট নিশ্চিত করবে; এটাই নিয়ম। পেটেন্ট প্রাপ্তির
মাধ্যমে পেটেন্ট স্বত্বাধিকারী একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার উদ্ভাবিত
পণ্য কিংবা প্রক্রিয়া বাজারজাতকরণের একচ্ছত্র অধিকার লাভ করে। তবে সদস্য
রাষ্ট্রগুলো কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই সাধারণ নিয়ম থেকে সরে আসতে
পারবে। ট্রিপ্স এগ্রিমেন্টের ৩১ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক ডব্লিউটিওর সদস্য
দেশগুলো প্রকৃত পেটেন্ট অধিকারীর অনুমতি না নিয়ে স্থানীয় নির্মাতাদের কোনো
পেটেন্টকৃত পণ্য উৎপাদন করার জন্য আদেশ দেওয়ার অধিকার রাখে। এই অনুচ্ছেদই
'বাধ্যতামূলক লাইসেন্স'-এর প্রধান আইনি ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে ' ট্রিপ্স
এগ্রিমেন্ট এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক দোহা ঘোষণা'র ৫ নং দফায় (নভেম্বর ২০০১ এ
গ্রহীত) আবারও নিশ্চিত করা হয়- ডব্লিউটিওর প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের
বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদানের অধিকার রয়েছে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর
স্বাধীনতা রয়েছে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি নির্ধারণ করার।

কিন্তু ব্যবহারিক বিশ্বে করোনা মোকাবিলা কিংবা করোনা টিকার দ্রুত প্রাপ্তি
নিশ্চিত করতে তামাম বিশ্বের জাতিরাষ্ট্রগুলোকে হয়তো বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের
আশ্রয় নিতে হবে না। কারণ, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ কভিড-১৯ টিকাগুলোর
পেটেন্ট স্বত্বাধিকারীদের কেউ কেউ হয়তো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের পেটেন্ট
অধিকার প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অথবা পেটেন্ট স্বত্বাধিকারী
অনেকেই সাশ্রয়ী মূল্যে স্বেচ্ছায় লাইসেন্স দিতে রাজি হতে পারে। মডার্না
ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে- মহামারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি কভিড টিকার ওপর
কোনো পেটেন্ট অধিকার প্রয়োগ করবে না।

আসলে করোনা টিকা কিংবা করোনা চিকিৎসা সংক্রান্ত পণ্য বা প্রযুক্তিগুলোতে
পেটেন্ট অধিকারের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স দেওয়া বা অস্থায়ীভাবে পেটেন্ট
মওকুফের মতো আইনি বিষয়ের বাইরেও বেশ কিছু ব্যবহারিক সমস্যা রয়েছে এবং তাই
এই মুহূর্তে বিশ্বের জাতিরাষ্ট্রগুলোর বিশেষত স্বল্প কিংবা মধ্যম আয়ের
উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত হবে এই ব্যবহারিক সমস্যাগুলো সমাধানে মনোযোগ
দেওয়া। স্বল্প কিংবা মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ভাবতে হবে, করোনার
টিকা উৎপাদনে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ভিত্তি তাদের রয়েছে কিনা।
উদাহরণস্বরূপ, কভিড-১৯ মহামারির প্রাথমিক পর্বের সময় রেমডেসিভির ওষুধটি
বিশ্বব্যাপী ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছিল।

সে সময় বাংলাদেশ ওষুধটির প্রবর্তক
গিলিয়েড সায়েন্সের কোনো অনুমতি বা লাইসেন্স না নিয়েও সহজেই এ ওষুধ উৎপাদন
করতে পেরেছে। কেননা, এ ধরনের ওষুধ উৎপাদনের প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন
নয়। কিন্তু অপফোর্ড বা ফাইজার বা মডার্নার উদ্ভাবিত করোনা টিকা উৎপাদন করা
বাংলাদেশের পক্ষে সহজ কাজ নাও হতে পারে। এ বিষয়ে আরও মনে রাখা দরকার, টিকা
উদ্ভাবনকারী ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলো যদি তাদের টিকা তৈরির ফরমুলা বা
প্রস্তুত প্রণালি পেটেন্টের পরিবর্তে 'ট্রেড সিক্রেট'-এর অধীনে সুরক্ষা
দেয়, তবে সংশ্নিষ্ট মুষ্টিমেয় গবেষক কিংবা উৎপাদকের বাইরে অন্য কারও পক্ষে
টিকার প্রস্তুত প্রণালি জানার কোনো অবকাশ নেই, যেহেতু কিছু করোনা টিকা নতুন
ধরনের প্রযুক্তিগত ভিত্তির ওপর নির্ভর করে উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশকে এ
ধরনের টিকা উৎপাদনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এটি আশার বিষয়, স্থানীয় গ্লোব বায়োটেকের দাবিকৃত উদ্ভাবনটি
(বঙ্গভ্যাপ) একটি এমআরএনএ প্রযুক্তির টিকা। এর অর্থ, স্থানীয় গবেষক দল,
বিজ্ঞানীরা এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো এমআরএনএ প্রযুক্তির টিকা
প্রস্তুত প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট ভালো ধারণা রাখেন। বাংলাদেশের জন্য আরও
আশাব্যঞ্জক বিষয়, সরকার ইতোমধ্যে রাশিয়ায় উদ্ভাবিত টিকা দেশেই উৎপাদন করার
কথা ভাবছে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরও বেশি কার্যকর অন্য কোনো টিকাও হয়তো দেশে
উৎপাদন করার প্রয়োজন হতে পারে। তাই এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকার
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে টিকা উৎপাদনের
সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরির কথা ভাবতে পারে। শুধু বাংলাদেশ নয়;
'সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে টিকা উৎপাদনের
সক্ষমতা বৃদ্ধি'র ধারণাটি স্বল্প বা মাঝারি আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য
সহায়ক হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এসব দেশের সংশ্নিষ্ট
সরকারি কর্তৃপক্ষের বেসরকারি খাতের প্রয়োজন সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করতে
হবে।

সংবাদমাধ্যম থেকে আমরা জানি, বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা গ্লোবাল
বায়োটেক প্রায় তিন মাস আগে তাদের উদ্ভাবিত বঙ্গভ্যাপ টিকার (একটি এমআরএনএ
টিকা) মানবদেহে পরীক্ষার (হিউম্যান ট্রায়াল) সরকারি অনুমতির জন্য আবেদন
করেছিল। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ সংস্থাটি সে অনুমোদন আদৌ পেয়েছে
কিনা কিংবা না পেয়ে থাকলে কেন পায়নি, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। অথচ একই
ধরনের পরিস্থিতিতে আমেরিকার সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ মডার্না উদ্ভাবিত টিকার
মানবদেহে পরীক্ষার অনুমতি দিতে এক সপ্তাহেরও কম সময় নিয়েছিল।

বাংলাদেশের
'বঙ্গভ্যাপ'-এর উদাহরণটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্থানীয়
পর্যায়ে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে মোটেও সুখকর
উদাহরণ নয়। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হলে শুধু বাংলাদেশ নয়; বিশ্বের
স্বল্প কিংবা মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার বা সংশ্নিষ্ট
কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই করোনা টিকা কিংবা চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষণের
সিদ্ধান্ত প্রদানে তৎপর ও আন্তরিক হওয়ার বিকল্প নেই।

যেহেতু করোনা মহামারিটি 'অভিনব' ধরনের একটি ভাইরাস থেকে ছডাচ্ছে, তাই কবে
কিংবা কীভাবে এর বিলুপ্তি ঘটবে, তা কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। অনেক
বিজ্ঞানীর মতো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বিশ্বাস করে, হয়তো এ ভাইরাস আর কখনও
পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে দূরীভূত হবে না। যদি তাই হয়, তবে সব রাষ্ট্রকেই
করোনা মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যেতে হবে, যেখানে
রাষ্ট্রগুলোকে যথার্থ 'ভ্যাকসিন রোডম্যাপ' বা 'টিকা সংক্রান্ত পরিকল্পনা'
প্রণয়ন করতে হবে।

টিকা সংক্রান্ত পরিকল্পনায় রাষ্ট্রগুলো কীভাবে নিয়মিত সব নাগরিকের জন্য
টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করবে, তার একটি টেকসই উপায় কিংবা রূপরেখা থাকা
বাঞ্ছনীয়। এ পরিকল্পনায় প্রয়োজনে রাষ্ট্রগুলো বাধ্যতামূলক লাইসেন্স
প্রদানের বিষয়টিও রাখতে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ও গুরুত্ব
পাওয়ার দাবি রাখে এবং স্বল্প ও মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল কিংবা স্বল্পোন্নত
দেশগুলোর জন্য 'টিকা সংক্রান্ত পরিকল্পনা' প্রণয়ন অধিকতর জরুরি। কারণ, এসব
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী লকডাউন ধরনের পদক্ষেপে খুব বেশিদিন টিকে থাকতে
পারবে না। প্রত্যাশা এই যে, একটি স্বল্পোন্নত কিংবা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ
হিসেবে বাংলাদেশও একটি কার্যকর 'ভ্যাকসিন রোডম্যাপ' বা 'টিকা সংক্রান্ত
পরিকল্পনা' গ্রহণ করবে, যেখানে ভবিষ্যতে দেশের সব নাগরিকের জন্য কার্যকর
করোনা টিকার টেকসই সরবরাহের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা পাওয়া যাবে।






© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com