রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

'ড্যামেজ কন্ট্রোল' করুন দ্রুত

প্রকাশ: ০৯ মে ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী উপাচার্য এম আবদুস সোবহান তার শেষ কর্মদিবসে যে 'কীর্তি' স্থাপন করে গেলেন, তা দেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে 'মাইলফলক' হয়ে থাকবে। খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বৃহস্পতিবার শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে ১৪১ জনকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি নূ্যনতম নিয়ম-নীতির ধার ধারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগপত্রে রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর অত্যাবশ্যকীয়, আমরা জানি। কিন্তু আলোচ্য শিক্ষক ও কর্মচারীদের নিয়োগপত্রে বর্তমান রেজিস্ট্রার স্বাক্ষর করতে না চাওয়ায় তিনি উপ-রেজিস্ট্রারকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়েছেন। শনিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির সামনে রেজিস্ট্রারের এই বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত যে, এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াই 'শতভাগ অবৈধ' হয়ে গেছে। অবশ্য এবারই প্রথম আবদুস সোবহান এমন বেপরোয়া পদক্ষেপ নেননি। এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ধারণার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন নিছক গায়ের জোরে। বস্তুত উপাচার্য হিসেবে দুই মেয়াদেই তিনি আইন ও নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির নিকৃষ্ট নজির স্থাপন করে গেছেন।

আমরা দেখেছি, নিজের কন্যা ও জামাতাকে শিক্ষক বানানোর জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালাই পরিবর্তন করেছিলেন। এবারও তিনি নিজের ব্যক্তিগত কাজ-কর্মে নিয়োজিতদের ও তাদের স্বজনদের চাকরি দিয়ে গেছেন। যুক্তি হিসেবে বিদায়ী উপাচার্য যদিও 'রাজনৈতিক' পুনর্বাসনের কথা বলেছেন, এ ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে যে বিপুল অর্থের কারবারও থাকে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি সহযোগী দৈনিকে মোটা অর্থের যে অঙ্ক প্রকাশ হয়েছে, তাতে অবিশ্বাসের কোনো কারণ দেখি না আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীরা আদর্শ ও নীতি শিখবে; সেখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে 'রাজনৈতিক' বিবেচনা আবার কী? যোগ্য প্রার্থীরাই সবক্ষেত্রে সুযোগ পাবে, এটাই কাম্য। বিদায়ী উপাচার্যের দুই মেয়াদেই এটা স্পষ্ট যে, বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি 'পৈতৃক তালুক' বিবেচনা করেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে এই প্রশ্ন বিলম্বে হলেও উঠতে বাধ্য যে, এই ব্যক্তির অসততা প্রথম মেয়াদেই ধরা পড়ার পরও তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে 'পুরস্কৃত' করা হয়েছিল কেন? এই প্রশ্নের জবাবও বিলম্বে হলেও সংশ্নিষ্টদের দিতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি কার স্বার্থে? মাস ছয়েক আগেই ওই তদন্ত কমিটি বিদায়ী এই উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল। তারপরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন কেবল কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই হাত-পা গুটিয়ে বসে ছিল? এমন ধারণা অমূলক হতে পারে না যে, তখনও যদি আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত তাহলে শেষ কর্মদিবসে তার এই কারসাজি দেখতে হতো না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিয়ম ও নীতি প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই তার খুঁটির জোর খতিয়ে দেখা জরুরি। তারও আগে 'অবৈধ' এসব নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

তিনি যেভাবে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রার্থীদের যেভাবে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, তারও বিরূপ প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বিশ্ববিদ্যালয়টির সার্বিক মান ধরে রাখার স্বার্থে ওইসব শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে আগের উপাচার্যদের সময় যেসব প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ হয়েছে, সেগুলোও যাচাই-বাছাই করা দরকার। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অনিয়ম ও অন্যায়ের দায় রাষ্ট্রীয় অর্থে শোধ হবে কেন? আমরা মনে করি, এম আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা এবং আইনি ব্যবস্থা ছাড়া তার নেতিবাচক উত্তরাধিকার উচ্ছেদ করা যাবে না। তিনি যে ইতোমধ্যেই অপূরণীয় ক্ষতি করে গেছেন, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এখন যত দ্রুতসম্ভব 'ড্যামেজ কন্ট্রোল' করতে হবে। কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশে অন্যান্য উচ্চ শিক্ষালয়েও উপাচার্যরা যেসব নেতিবাচক নজির সৃষ্টি করছেন, তা গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই অশনিসংকেত। এক্ষেত্রে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে সেই মেরুদণ্ড সোজা রাখার স্বার্থেই এর বিকল্প নেই।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com