সিগারেট ও আবাসন থেকে বাড়তি রাজস্ব আসছে

নীতি-সহায়তা অব্যাহত রাখার সুপারিশ

প্রকাশ: ০৯ মে ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৯ মে ২১ । ০৪:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাবে সারা পৃথিবীর অর্থনীতি গত বছরের শুরু থেকে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশও এর বাইরে ছিল না। সংকটের মুখে চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেট ঘোষণা করা হয়। এই বাজেটে সামগ্রিকভাবে করের বোঝা না বাড়ালেও রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব সংগ্রহ বেড়েছে ৭ শতাংশ। আর বাড়তি রাজস্বের উল্লেখযোগ্য অংশ আসছে সিগারেট ও আবাসন খাত থেকে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, কয়েক বছর ধরে বাজেটে কিছু নীতির পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন খাতে রাজস্ব আহরণে বেশ অগ্রগতি হচ্ছে। বিশেষ করে টেলিকম, সিগারেট, আবাসন, সিমেন্ট, জ্বালানি ইত্যাদি খাত রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের সর্ববৃহৎ খাত সিগারেট ও দেশের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে আবাসন খাত থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তুলনামূলক ভালো রাজস্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সরকার সিগারেটের কর নির্ধারণ করার পাশাপাশি খুচরা মূল্যও নির্ধারণ করে থাকে। বছরের পর বছর জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে সিগারেটের কর ও মূল্যবৃদ্ধি করে আসছে। ক্রমাগত এই বৃদ্ধির মূল কারণ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি এবং জনস্বার্থ সুরক্ষার্থে ধূমপায়ীর সংখ্যা কমানো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ম্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভোক্তারা কম মূল্যমানের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে সরকার এই খাত থেকে আশানুরূপ রাজস্ব আহরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

সিগারেটের খুচরা মূল্য থেকে সরকার সর্বোচ্চ ৮১ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব পেয়ে থাকে। গত পাঁচ বছরে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। এনবিআর সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব আসার সম্ভাবনা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি।

জানা যায়, সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজারে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া অবৈধ সিগারেটের বাজারও বাড়তে থাকে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এনবিআরের হিসাবে ওই অর্থবছরে সরকারের প্রায় ২৫০০ থেকে ৩০০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়। গত দুই থেকে তিন বছরে এনবিআরসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে অসংখ্য অভিযান চালানো হয়। এনবিআরের পক্ষ থেকে সচেতনতা তৈরিতে অনেক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু শক্তিশালী নীতি না থাকায় এই খাত থেকে রাজস্ব ফাঁকি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্নিষ্টরা মনে করেন, অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মূসক ও সম্পূরক শুল্ক্ক আইনে কিছু নীতিগত পরিবর্তন আনা দরকার এবং আইনে কিছু কঠোর শাস্তির বিধান রাখা দরকার। তাহলে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের কারণে প্রতি বছর ১৫০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকার যে রাজস্ব এনবিআর হারাচ্ছে, তা অনেকাংশেই কমে যাবে।

চলতি অর্থবছর এনবিআর একটি প্রশংসনীয় নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব আহরণের প্রধান মাধ্যম ট্যাক্স স্ট্যাম্প। এনবিআর সিগারেটের এসআরওতে প্রতিটি উৎপাদকের জন্য ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ট্যাক্স স্ট্যাম্পের সমন্বয় বাধ্যতামূলক করে দেয়। এর ফলে কোনো উৎপাদক কী পরিমাণ ট্যাক্স স্ট্যাম্প সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন থেকে উত্তোলন করেছে এবং কী পরিমাণ সিগারেট উৎপাদন করেছে তার একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

বাজার বিশ্নেষকদের মতে, এনবিআরের এমন নীতি করা উচিত যাতে এ খাত থেকে ধারাবাহিক আয় অব্যাহত থাকে এবং করজালের আওতার বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ম্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিগারেটের দাম বাড়ানো দরকার যা তারা বর্তমান অর্থবছরে করেছে এবং সফলও হয়েছে। বেশি রাজস্বের আশায় অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি করলে রাজস্ব আহরণের বদলে উল্টো রাজস্ব ফাঁকি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবাসন খাত-সংশ্নিষ্টরা জানান, ২০১২ সালে এ খাতে মন্দা শুরু হয়। পরের বছর টানা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফ্ল্যাটের মূল্য কমিয়েও ক্রেতা খুঁজে পায়নি অনেক প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সালের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও সংকট কাটেনি। তবে ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে সরকারি কর্মচারীদের ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ঘোষণা আসে। আবার গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে নিবন্ধন ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়। তবে গত বছর করোনায় আবারও আবাসন খাত ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়ে। গ্রাহকের কিস্তি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজও। গত অর্থবছরের বাজেটে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ায় আবাসনের সুদিন ফিরে আসে। ফ্ল্যাট বিক্রি বেড়ে যায়। ফ্ল্যাট বিক্রি বৃদ্ধির পেছনে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। জানা যায়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ থেকে সরকার এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে।

রিহ্যাব সহসভাপতি কামাল মাহমুদ সমকালকে বলেন, চলতি অর্থবছরে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ায় এ খাতে ফ্ল্যাট ও প্লটের বেচাকেনা বেড়েছে। বিশেষ করে রেডি ফ্ল্যাটের চাহিদা বেশি বেড়েছে। বিক্রি বেশি হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে। আগামীতে এ সুযোগ পাওয়া নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় আছেন। আগামী দুই বছরের জন্য আবাসন খাতের উন্নয়নে এ সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে অর্থ পাচার হওয়ার চেয়ে দেশে বিনিয়োগের সুযোগ থাকা অনেক ভালো। আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া আগামী বাজেটে আবাসনের নিবন্ধন ফি কমানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com