তবুও থেমে নেই ঈদযাত্রা

ভোগান্তি সয়েই গ্রামমুখী ঢল

প্রকাশ: ১১ মে ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২১ । ০৪:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব আহাম্মদ

সীমিত পর্যায়ে চালু হয়েছে ফেরি, পারাপার শুরু হয়েছে যানবাহনের। তারপরও কমেনি ভিড়। দূরপাল্লায় গণপরিবহন নেই, ট্রাকে করেও রাজধানী ছেড়েছে মানুষ। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ছবি-ফোকাস বাংলা

করোনা সংক্রমণের ভয় পাত্তাই পাচ্ছে না ঈদে গ্রামমুখী জনস্রোতের কাছে। যে যেখানে আছেন সেখানেই ঈদ উপযাপন করার অনুরোধ-আহ্বান কাজে আসছে না। বিধিনিষেধ অমান্য করে পথে পথে দুর্ভোগ সয়ে বাড়তি টাকায় পিকআপ ও ট্রাকে করে এবং বাসে ভেঙে ভেঙে শহর ছেড়ে ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছেন লাখো মানুষ। আজ মঙ্গলবার শেষ কর্মদিবসের পর ভিড় আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও গতকাল সোমবার অসংখ্য বাসযাত্রী নিয়ে ফেরি পার হয়ে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চলের উদ্দেশে রাজধানী ছেড়ে গেছে। দূর-দূরান্তের অন্য জেলায়ও যাচ্ছে। আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও গতকাল তা আর দেখা যায়নি। করোনা মহামারিকালে এভাবে গাদাগাদি করে ঈদ উদযাপন করতে গ্রামে যাওয়াকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক 'আত্মঘাতী' বললেও দৃশ্যত জনস্রোত ঠেকাতে না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।

বিজিবির পাহারা বসিয়েও কাজ না হওয়ায় যাত্রীদের চাপে গতকাল বিকেল থেকে শিমুলিয়া ও আরিচা ঘাটে দিনের বেলায়ও ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করেছে অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ। পথে পুলিশের তল্লাশি এবং মুভমেন্ট পাসের জন্যও কোনো কড়াকড়ি ছিল না। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি গতকাল।

দুপুরে গাবতলী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাস টার্মিনাল খাঁ খাঁ করছে। হাজারখানেক দূরপাল্লার বাস টার্মিনালে পার্ক করে রাখা হয়েছে। তবে একেবারেই ভিন্ন চিত্র টার্মিনাল থেকে কয়েকশ গজ দূরে গাবতলী সেতুর পশ্চিম প্রান্তে। সেখানে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাজার হাজার মানুষকে যানবাহনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। সেতু পেরিয়ে এক একটি পিকআপ, ট্রাক আসার সঙ্গে সঙ্গে তাতে হুড়োহুড়ি করে নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে যাত্রীরা চড়ে বসেন।

আগের দিনগুলোর মতো গতকালও শত শত মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও সিএনজি অটোরিকশায় যাত্রীরা পাটুরিয়া ঘাট এবং যমুনার বঙ্গবন্ধু সেতুর দিকে গেছেন। নতুন যোগ হয়েছে বাস। চলমান লকডাউনের শর্তানুযায়ী, গণপরিবহনে অর্ধেক আসন খালি রাখতে হবে, এক জেলার বাস অন্য জেলায় যেতে পারবে না। কিন্তু সেসব থোড়াই কেয়ার করে চালক ও যাত্রীরা ছুটছেন।

গাবতলী সেতুর পশ্চিম প্রান্তে আমিনবাজারে বিদ্যুৎ অফিসের সামনে সারি ধরে যাত্রীর অপেক্ষায় বাস, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সেখানে কথা হয়, ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটের বসুমতি পরিবহনের বাসচালক খোরশেদ আলমের সঙ্গে। বাসটির সামনে হলুদ রঙের ব্যানারে লেখা ছিল 'গার্মেন্টস স্টাফদের জন্য'। তবে খোরশেদ জানালেন, গত দু'দিন ধরে ঢাকার অভ্যন্তরে যাত্রী নেই। মানুষজন গ্রামে চলে যাচ্ছে। তাই বাস নিয়ে চলে এসেছেন। ঘাটে যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন, ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ভাড়ায়।

অথচ স্বাভাবিক সময়ে গাবতলী থেকে পাটুরিয়ার ভাড়া ১০০ টাকা। বাসটির যাত্রী শাহনেওয়াজ আলম বললেন, যাত্রীদের গলা কাটা হচ্ছে। তিন গুণ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। শাহনেওয়াজ যাবেন নড়াইলে। তিনি জানালেন, স্বাভাবিক সময়ে নড়াইল যেতে ভাড়া ৩০০ টাকা। এখন তাকে ৩০০ টাকায় পাটুরিয়া যেতে হচ্ছে। এরপর ফেরিতে পদ্মা পার হতে ১০০ টাকা লাগবে। নদী পার হয়ে গোয়ালন্দ থেকে বাসে বা অটোরিকশায় বাড়ি যেতে আরও ৩০০-৪০০ টাকা লাগবে। সব মিলিয়ে সাত-আটশ টাকা লাগবে। তার ভাষ্য, 'কিন্তু কিছু করার নেই। ঈদে বাড়ি যেতেই হবে। টাকা যাচ্ছে যাক।'

লকডাউনে গ্রামে ঈদ করতে গিয়ে বাড়তি খরচের কশাঘাতে জর্জরিত নিম্ন আয়ের মানুষ। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী যাচ্ছিলেন গাবতলীর কয়লার ঘাটের দিনমজুর মো. ইউনুস। তিনি তার সাত সহকর্মীর সঙ্গে পিকআপে যাচ্ছেন। খোলা পিকআপে ৫০০ টাকায় বগুড়া যাবেন। সেখানে থেকে আরও দুই-আড়াইশ টাকায় গাইবান্ধা যাবেন। স্বাভাবিক সময়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় লোকাল বাসে বাড়ি যেতে পারেন।

করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও কেন বাড়তি টাকায় বাড়ি যাচ্ছেন জানতে চাইলে ইউনুস ও তার সহকর্মীরা বললেন, তাদের জীবনে আনন্দ বলতে রোজার ঈদ। কয়েক মাস ধরে কয়লার ঘাটে দিনমজুরি করেছেন। লকডাউনে বাড়ি যেতে পারেননি। বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান, বাবা, মা পথ চেয়ে আছেন। বাড়িতে বিকাশে টাকা পাঠিয়েছেন। তারা জামা-কাপড় কিনেছেন। তাদের সঙ্গে ঈদের দিন কাটাতে না পারলে জীবনে আর থাকল কী! করোনা হলে হবে।

ইউনুসের সহকর্মীদের মত হচ্ছে, তাদের মতো খেটেখাওয়া গরিবের করোনা হয় না। আর সব কিছুই তো খোলা। কতদিন ধরেই নদীর পাড়ে ছাপরা ঘরে গাদাগাদি করে আছেন তারা। করোনা হলে এতদিনে হয়েই যেত। 'কিন্তু বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবার তো আপনার মাধ্যমে করোনা হতে পারে'- একথা জানালেও উদ্বিগ্ন দেখা গেল না ইউনুসকে। তার জবাব, কপালে থাকলে তিনি বাড়ি না গেলেও তো হতে পারে। কথা বলতে বলতে তাদের পিকআপটি যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায়, বাড়ি ফেরার যুদ্ধে নামেন তারা।

জিগাতলা থেকে নোয়াখালীগামী হিমাচল ও ইকনো পরিবহনের বাস ছাড়ে। দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলার বাস বন্ধ থাকায় এখন এগুলো বন্ধ। রোববার মধ্যরাতে দেখা যায়, বাসের বদলে কাউন্টারগুলোর সামনে মাইক্রোবাস অপেক্ষায় রয়েছে। যাত্রী দেলোয়ার হোসেন, মাসুদ আলম এবং চালক আরমান হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা ভাড়ায় নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর যাচ্ছে এসব মাইক্রোবাস। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নিজেরা জোট বেঁধে এসব গাড়ি রিজার্ভ করেছেন। গতকালও একই দৃশ্য দেখা যায় জিগাতলায়।

সমকালের কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, গাজীপুর ও সাভার শিল্পাঞ্চলের কারখানা ছুটি না হলেও ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপ তীব্র। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার চন্দ্রার ত্রিমোড় এলাকায় হাজারো নারী-পুরুষকে ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাসে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে। নিষেধাজ্ঞা ও স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে বাসেও বাড়তি ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে।

কোনাবাড়ী (সালনা) হাইওয়ে পুলিশ গত রোববার রাত ও সোমবার দিনে অর্ধশতাধিক বাস আটক করেছে। পুলিশ বলছে, ঘরমুখী জনস্রোত ঠেকানো খুবই কঠিন। যে যেভাবে পারছে গ্রামে যাচ্ছে। হাইওয়ে থানার ওসি মীর গোলাম ফারুক জানান, জয়দেবপুর চৌরাস্তা বাইপাস থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত প্রতিটি পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে। চেষ্টা করা হচ্ছে, লোকজন যেন অন্তত নিরাপদে বাড়ি যেতে পারে।

শ্রমিক ও বাস মালিক সূত্রে জানা গেছে, 'সাভার পরিবহন', 'মৌমিতা'সহ নানা কোম্পানির বাস চলছে। হাইওয়ে পুলিশ দেখেও ছাড় দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, হাইওয়ে পুলিশকে চাঁদা দিয়ে বাস চালানো হচ্ছে। বাড়তি ভাড়াও নিচ্ছে দেদার।

রংপুরগামী যাত্রী কাইয়ুম, রাজশাহীগামী ফাইজউদ্দিন, নাটোরগামী ফিরোজ জানান, তারা যানবাহনে উঠতে পারেননি ভিড়ের কারণে। দু-একটি গাড়ি পাওয়া গেলেও তাতে ভাড়া অনেক বেশি।

মৌমিতা পরিবহনের বাসের সুপারভাইজার জামাল উদ্দিন জানান, গাজীপুর জেলার ভেতর যাত্রী নিয়ে চালাতে গিয়ে কয়েকটি মামলা হয়েছে। তাই রিজার্ভে সিরাজগঞ্জে যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন।

টঙ্গী প্রতিনিধি জানান, অভিন্ন চিত্র ঢাকা ছাড়ার আরেক পথ গাজীপুরের টঙ্গীতেও। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও যাত্রীর ঢল অব্যাহত রয়েছে। আজ মঙ্গলবার কলকারখানা ছুটির পর এ ভিড় আরও বাড়তে পারে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার জাকির হাসান সমকালকে জানান, রাস্তায় যাত্রী ও গাড়ির প্রচণ্ড চাপ। গতকাল সন্ধ্যার পর তা আরও বেড়েছে। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাড়তি পুলিশ মোতায়ন রয়েছে। যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মানাতে পুলিশ কাজ করছে।

তবে সরেজমিন দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। টঙ্গী থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, পিকআপ ও ট্রাকে যাত্রীরা যাচ্ছেন। ভাড়াও আকাশছোঁয়া। রিকশাচালক মোস্তফা মিয়া জানান, তারা এক গ্রামের পাঁচজন গাজীপুরে রিকশা চালান। বাকিরা আগেই চলে গেছেন। তিনি তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সোমবার গাড়ি পাননি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com