প্রতিবেশী

পশ্চিমবঙ্গে মমতাই আবার যে কারণে

প্রকাশ: ১৯ মে ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অয়নাংশ মৈত্র

গ্রীষ্ফ্মের সকাল ১১টা। মহামারির প্রকোপ উপেক্ষা করেই বিরাট, সুবিশাল, সুবিস্তৃত এক মাঠে হাজারো আবালবৃদ্ধবনিতার প্রতীক্ষা। দিদি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছেন। হেলিকপ্টার এক চক্কর কেটে মাধ্যাকর্ষণের টানে নেমে এলো মাটিতে। হুইল চেয়ার চেপে নির্বাচনী প্রচারে দক্ষিণবঙ্গের এক নগরীতে মঞ্চে উঠলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পায়ে চোট। হাতে একটা সাদাকালো ফুটবল। কণ্ঠে দৃপ্ত স্লোগান- খেলা হবে। তার চোখ, ঠিক তার সাবলীল লড়াকু ব্যক্তিত্ব আর দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রতিফলন। এ লড়াইয়ে তিনি জিতবেনই, তিনি অদম্য। তিনি অপরাজেয়ই থাকলেন। গত ২ মে পশ্চিমবঙ্গে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের রায় বেরোতেই সেই ক্লাস ইলেভেনের ক্লাসরুমে পড়া বাংলাদেশের কবি শামসুর রাহমানের কবিতার লাইনটা বারবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। বাংলা দেখিয়েছে, ভাষা ও সংস্কৃতির ঐক্যের কাছে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় জাতি, ধর্ম, মেরুকরণের রাজনীতি।

প্রায় ২ কোটি ৮৭ লাখ ভোট পেয়েছে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন মূলত রাজ্যের মানুষের তার প্রতি আস্থারই প্রতিফলন। অমিত শাহের নাগরিক সংশোধনী আইন (এনআরসি-সিএএ) নিয়ে রাজ্যের মানুষের আশঙ্কা এবং উদ্বেগ দূর করতে, মমতার কর্মসূচি ও জনসভা রাজ্যবাসীকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। ভোটের ঠিক আগে রাজ্য সরকারের 'দুয়ারে সরকার' নামক কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলে জনমানসে, যার উচ্ছ্বাস ব্যালট বাক্সে এসে পড়ে। এ সরকারের এক দশক পূর্তি হলেও সরকারবিরোধী প্রবণতা মূলত কাজ করেছে কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের বিপক্ষে। প্রচার হোক বা বিজেপির অন্যান্য কর্মসূচি, সর্বত্রই বাংলা রাজ্য কমিটিকে ব্রাত্য করে, নির্দেশনা দেন অমিত শাহ, অমিত মালব্যের মতো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। নির্বাচনী প্রচারকালীন ভাষ্যে, হিন্দি ভাষার অত্যাধিক প্রয়োগ আপামর বাঙালির কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই তৃণমূল দাবি করে, এ লড়াই ছিল বহিরাগত এবং বাংলার নিজের মেয়ের। আট দফায় ভোট করিয়ে বাংলায় একের পর এক সভা করে গেছেন মোদি।

প্রার্থী নির্বাচন হোক বা অন্যান্য সুচারু কৌশল, এই জয়ের পেছনে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরের আই প্যাকের কৃতিত্ব ও গুরুত্ব অপরিসীম। তারা নির্বাচনের প্রাক্কালে গ্রাম নগরী সমীক্ষা করে জানে মানুষের পছন্দ-অপছন্দ, চাওয়া-পাওয়া, বাসনার কথা। কাট মানি, তোলাবাজিসহ বেশ কিছু বিষয়ে তৃণমূলকে আক্রমণ করলেও দুর্নীতিগ্রস্ত বেশ কিছু তৃণমূলের নেতা বিজেপিতে যাওয়ায় দুর্নীতি নিয়ে খুব বেশি বিরোধিতার জোয়ার তুলতে পারেনি বিজেপি। ভাটা দেখা গেছে তাদের জনসভা এবং সংযোগ কর্মসূচিতেও। অতিমারির প্রকোপের মধ্যেও নির্বাচনী প্রচারে বাংলার বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে বাড়ানো হয় জনসভা। পেট্রোল ও রান্নার গ্যাসের অকল্পনীয় মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিজেপি সরকারকে তোপ দাগে তৃণমূল। মমতার নির্বাচনী ইশতেহারে ১০টি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার মানুষের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। অন্যদিকে, বিজেপির সংকল্পপত্রে ভূরি ভূরি প্রতিশ্রুতি ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। মমতার বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পেছনে ছিলেন বিপুল নারী এবং মুসলিম ভোটার। দিদির এই সমর জয়ের পেছনে প্রমীলা বাহিনীর সমর্থন ছিল অপরিসীম। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজ সাথীর মতো নারী, নারী ও শিশুকন্যাদের জন্য প্রকল্পগুলো নারীদের সমর্থন আরও জোরদার করেছে। রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ এবং এই মুসলিম সমাজের ভোট মূলত একমুখী। অনগ্রসরভুক্ত তালিকায় কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি করেন মমতা। মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলোতে উর্দু ভাষাকে দ্বিতীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, মাদ্রাসায় পাঠরত ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাইসাইকেল ও বৃত্তি প্রদান। প্রায় ৬০ হাজার ইমামের মাসিক ভাতা দেওয়া, ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি এবং সর্বোপরি তৃণমূলে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের কারণে মুসলমান সমাজে বিশেষ জায়গা করে নেন মমতা।

অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১টি আসনের মধ্যে ৩০টি পেয়েছে তৃণমূল। তপশিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত পুরুষ এবং মতুয়া ভোটের বড় অংশ বিজেপির কাছে এলেও বাবুল সুপ্রিয়, পায়েল সরকারের মতো তারকা প্রার্থীর পরাজয় বিজেপির কাছে বিশেষ উদ্বেগের এবং উৎকণ্ঠার। হুগলী ও জলপাইগুড়িতে বিজেপির পরাজয়। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে বিজেপির হাওয়া বইলেও দক্ষিণবঙ্গে প্রবাহ ছিল তৃণমূলের অনুকূলেই।

মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ এবং মালদাহর মতো জেলায় যেখানে কংগ্রেস এবং সিপিআইএমের অবিসংবাদিত ঔদ্ধত্য আছে, সেখানেও ভরাডুবি দুই দলের, যারা দীর্ঘদিন রাজ্য শাসন করেছে। মূলত বিজেপিকে রুখতে একমাত্র তৃণমূলই পারে বলে ধারণা জন্মায় এতদঞ্চলে। শান্তি, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পক্ষে এই উপমহাদেশের বা প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশের জলবায়ু প্রতিকূল। হিংসা, হত্যালীলা ও নানাবিধ অপ্রীতিকর ঘটনা নির্বাচনের সময় এক অবিচ্ছেদ্য বিষয়। ব্যতিক্রম ছিল না এ রাজ্যও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজ হবে রাজ্যের ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা এবং হিংসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া। তবে এ নির্বাচন দেখিয়ে দিল বাংলা বাঙালির। ভাষা ও চিরায়ত সংস্কৃতিই এখানে প্রাধান্য পায়। ধর্মীয় বিভেদের রাজনীতি এখানে কখনোই ভাষাগত অন্বয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি। এ রাজ্যের রাজনীতিতে ধর্মের বা মেরুকরণের রাজনীতির মার্গ মোটেই প্রশস্ত নয়।
  ভারতীয় সাংবাদিক এবং ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের জুনিয়র ফেলো

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com