মাঠ-পার্কশূন্য ৩৫ ওয়ার্ড

প্রকাশ: ১৯ মে ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ মে ২১ । ০১:২৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

অমিতোষ পাল

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডে (পল্লবীর একাংশ) বাস করেন প্রায় দুই লাখ মানুষ। বাসযোগ্য শহরের মানদণ্ড অনুযায়ী ওয়ার্ডটিতে ৩২টি খেলার মাঠ ও ৩২টি পার্ক-উদ্যান থাকার কথা। যেগুলোর প্রতিটির আকার হতে হবে দেড় থেকে তিন বিঘা। কিন্তু বাস্তবে একটিও মানসম্মত খেলার মাঠ কিংবা পার্ক-উদ্যান নেই এ ওয়ার্ডে। খুবই ছোট আকারের খেলার মাঠ আছে মাত্র চারটি, যেগুলোর মোট আয়তন ২ দশমিক ২০ একর।

রাজউকের জরিপে দেখা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে এক হাজার ১৩৭ একর জায়গায় পার্ক থাকার কথা। কিন্তু আছে মাত্র ২৭১ একর। খেলার মাঠ থাকার কথা এক হাজার ৮৭৬ একর জায়গায়। আছে মাত্র ২৯৪ একর।

সংগত কারণেই খেলাধুলা ও শারীরিক-মানসিক বিকাশের পথ অনেকটাই রুদ্ধ এ ওয়ার্ডবাসী সবার। অবশ্য কেবল ডিএনসিসির ৬ নম্বর ওয়ার্ড নয়-রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের চিত্রই এক। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে এ রকম ওয়ার্ড রয়েছে ৩৫টি, যেগুলোতে শিশু-কিশোরদের জন্য কোনোই খেলার মাঠ বা পার্ক নেই।

সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সংশোধিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়নের কাজ শুরু করলে তারা দুই সিটি করপোরেশনসহ রাজউক এলাকায় একটি জরিপ পরিচালনা করে। সেখানে রাজধানীর পার্ক, খেলার মাঠ ও উদ্যান সংকটের এ নাজুক চিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, যেসব পার্ক-খেলার মাঠ এখনও আছে, সেসবের অধিকাংশও বেদখল হয়ে আছে। এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন। ঢাকার জনসংখ্যা বর্তমানে যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে মানদণ্ড অনুসরণ করে পার্ক-খেলার মাঠ পুরোপুরি নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তবে কিছু কিছু জায়গায় রিডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক কিছু খেলার মাঠ-পার্ক তৈরি করা সম্ভব। এখনই সেই উদ্যোগ না নিলে ১০ বছর পর তাও সম্ভব হবে না। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা এ কথা বারবার বলছি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো

উল্টো যেটুকু উদ্যান আছে, সেটুকুও ধ্বংস করছে।

ড. আদিল বলেন, মাঠ-পার্কের মতো সামাজিক অবকাঠামো থাকলে মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। মানসিক অবস্থাও ভালো থাকে। কিন্তু পার্ক-খেলার মাঠের অপ্রতুলতার কারণে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে রোগশোকে ভুগছে। অনেকে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সবুজ মাঠ না থাকলে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ডিএনসিসিতে নতুন যে ওয়ার্ডগুলো যুক্ত হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিতেই আমরা একটা করে খেলার মাঠ-পার্ক করতে চাই। এ জন্য প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করা হবে। নতুন ওয়ার্ডগুলোতে মাঠ ছাড়াও কমিউনিটি সেন্টার, আঞ্চলিক কার্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র তৈরি করা হবে। সব মিলিয়ে একটি কমপ্লেক্স করার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে কাজও শুরু করা হয়েছে। আর পুরোনো ওয়ার্ডগুলোর প্রতিটিতেও যাতে একটি করে খেলার মাঠ নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য প্রত্যেক কাউন্সিলরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তার ওয়ার্ডে কোনো খাসজমি আছে কি না, তা জানাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের অধীন কোনো খেলার মাঠ প্লট আকারে বরাদ্দ দেওয়া হলে তা বাতিল করতে। পাশাপাশি তাদের যদি কোনো উন্মুক্ত জায়গা থাকে, সেটা খেলার মাঠের জন্য ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তর করতে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে যাতে একটি করে খেলার মাঠ নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য ৩০ বছর মেয়াদি একটি 'ইমপ্লিমেন্টেশন প্ল্যান' প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি কনসালট্যান্ট ফার্মকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। কোথায় খেলার মাঠ-পার্ক তৈরি করা যায়, সে ব্যাপারে তারা পরামর্শ দেবে। এ ক্ষেত্রে যদি জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়, সেটাও করা হবে। খুব শিগগিরই হয়তো কনসালট্যান্ট নিয়োগের কাজ শেষ হতে পারে। পরবর্তী এক বছরের মধ্যে তারা ইমপ্লিমেন্টেশন প্ল্যান জমা দেবে। পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশন সে অনুযায়ী কাজ করবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি খেলার মাঠ ও পার্ক আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আরও কিছু পার্ক-খেলার মাঠ আধুনিকায়নের কাজ চলছে।

রাজউকের জরিপ জানাচ্ছে, ডিএনসিসির ১৭টি ওয়ার্ডে যে কয়টি খেলার মাঠ ও পার্ক রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। ২৭টি ওয়ার্ডে কেবল খেলার মাঠ আছে। আর ১০টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ ও পার্ক কোনোটিই নেই।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৫টিতে খেলার মাঠ ও পার্ক কোনোটিই নেই। ১১টিতে কেবল পার্ক ও ৩৯টিতে যৎসামান্য খেলার মাঠ রয়েছে।

ড্যাপ প্রণয়নে সম্পৃক্ত নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মাদ হিশাম উদ্দিন চিশতি বলেন, পরিকল্পিত ও মানসম্মত আবাসিক এলাকায় প্রতি সাড়ে ১২ হাজার জনসংখ্যার জন্য এক একর জায়গায় পার্ক ও দুই একর জায়গায় খেলার মাঠ থাকার কথা। কিন্তু তাদের জরিপে প্রয়োজনের ছয় ভাগের এক ভাগও পাওয়া যায়নি। যেটুকু খেলার মাঠ তারা পেয়েছেন, সেগুলোরও বেশ কিছু সাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মিরপুর শেরেবাংলা নগর স্টেডিয়াম বা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মতো সরকার নিয়ন্ত্রিত যেসব খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলোও তারা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু এগুলোতে সাধারণ মানুষের গম্যতা নেই। এসব খেলার মাঠ বাদ দিলে যে চিত্র দাঁড়ায়, তা আরও নাজুক। প্রয়োজনীয় খেলার মাঠ না থাকায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক বৈকল্য সৃষ্টি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, 'দুই সিটিতে নতুন যে ওয়ার্ডগুলো সংযুক্ত হয়েছে, এগুলোতে নতুন করে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে এটা করতে হবে। যে ৩৫টি ওয়ার্ডে কোনো কিছুই নেই, সেখানে সরকারি কোনো না কোনো সংস্থার জায়গা হলেও আছে। সিটি করপোরেশন ও ওই সংস্থার যৌথ ব্যবস্থাপনায় সেই জায়গাগুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠানের যদি জায়গা থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সংগতি রেখে শিশু-কিশোরদের তা ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া কিছু পকেট জায়গা থাকে, সেগুলোকে পাড়ার জায়গা হিসেবে শিশুদের জন্য উপযোগী করে তোলা যায়। ভিডিও গেম প্রজন্ম বাদ দিয়ে যদি বুদ্ধিবৃত্তিক নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, তাহলে এগুলো করতেই হবে।' তিনি বলেন, 'এ জন্য এবার ড্যাপে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্কুল করার কথা বলা হয়েছে। কেউ স্কুল করতে চাইলে তাহলে সেই স্কুল তৈরিতে সরকার যুক্ত হয়ে উন্মুক্ত স্থান বা খেলার মাঠ তৈরিতে সহযোগিতা করবে। তবে এই বক্তব্যগুলো ইমাম সাহেবের মতো বলে দিলে হবে না। প্রয়োজনে নীতিমালা সংশোধন করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকেই বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।'

৩৫টি ওয়ার্ডে কিছুই নেই :জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০টি ওয়ার্ডে কিছুই নেই। এগুলোর মধ্যে আছে- ২১, ২৩, ২৫, ৩০, ৩৫, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪১ এবং ৪৭ নং ওয়ার্ড। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যেসব ওয়ার্ডে কিছুই নেই, সেগুলোর মধ্যে আছে- ২, ৩, ১৬, ২৫, ৩৪, ৩৫, ৩৭, ৪৬, ৪৮, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৪, ৬৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নং ওয়ার্ড।

কিছু ওয়ার্ডে আছে যৎসামান্য :ডিএনসিসির কিছু ওয়ার্ডে পার্ক-খেলার মাঠ থাকলেও তা খুবই কম। যেমন ডিএনসিসির ১১ নম্বর ওয়ার্ডে পার্ক আছে শূন্য দশমিক ২২ একর। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ১০ একর। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৬১ একর। ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে পার্ক আছে শূন্য দশমিক ৩৩ একর। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৪৪ একর। ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৬৩ একর। ২২ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৭৬ একর।

ডিএসসিসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে পার্ক আছে শূন্য দশমিক ১৯ একর; ১০ নম্বর ওয়ার্ডে শূন্য দশমিক ৬ একর। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৯৮ একর। ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ০৭ একর। ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৩১ একর। ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৪৬ একর। ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৪১ একর। ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে আছে শূন্য দশমিক ৩২ একর। এছাড়া আরও অনেক ওয়ার্ড আছে, যেখানে এক একর জায়গায়ও নেই পার্ক বা খেলার মাঠ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com