ঢাকার ছবির স্মরণীয় জুটি

প্রকাশ: ২৭ মে ২১ । ১৬:২৭ | আপডেট: ২৭ মে ২১ । ১৬:৫১

সাদিয়া মুনমুন

গল্পের প্রয়োজনে জুটি হয়ে অভিনয় করে যাচ্ছেন তারকারা। যার মধ্য থেকে কোনো কোনো জুটি দর্শকের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন। যাদের বারবার পর্দায় জুটি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন দর্শক। নির্মাতারাও তাই যুগ যুগ ধরে জুটি গড়ে নির্মাণ করে চলেছেন একের পর এক চলচ্চিত্র। স্মরণীয় হয়ে থাকা তেমনই কিছু জুটি নিয়ে এবারের আয়োজন।

সিনেমার গল্পে প্রেম, দাম্পত্যের টানাপোড়েন, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই- যেটাই দেখানো হোক না কেন, শিল্পী নির্বাচন প্রায়ই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। এর অন্যতম কারণ পর্দার জুটি। দর্শককে বেশিরভাগ সময় দেখা গেছে, তারা নির্দিষ্ট কিছু জুটির অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সিনেমার গল্প উপভোগ করতে চান। যে কারণে যুগ যুগ ধরে জুটিপ্রথা সিনেমার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশের মতো এ দেশের সিনেমায় জুটির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে সবসময়। দেশীয় চলচ্চিত্রের সূচনালগ্ন থেকে যদি শুরু করি, তাহলে দেখা যাবে স্বাধীনতাপূর্ব ১৯৫৯ সালে পরিচালক এহতেশাম 'এ দেশ তোমার আমার' সিনেমায় খান আতাউর রহমান [আনিস] ও সুমিতা দেবী নামে একজোড়া নতুন মুখের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যারা জুটি হিসেবে দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন সহজেই। এর পরই শুরু হয়েছিল ঢাকার ছবিতে জুটিপ্রথা। যার পরিপ্রেক্ষিতে আবির্ভাব হয় রহমান-শবনম জুটি।

 রাজ্জাক ও কবরী

১৯৬১ সালে 'হারানো দিন' চলচ্চিত্রে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন তারা। রহমান-শবনম জুটি বাংলা ও উর্দু দুই ভাষার সিনেমায় সমানতালে অভিনয় করে গেছেন। তাদের পরপরই জুটি গড়ে দর্শকের নজর কেড়েছিলেন আজিম-সুজাতা। সময়ের পালাবদলে দর্শক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে রাজ্জাক-কবরী জুটির নাম। ১৯৬৭ সালে সুভাষ দত্তের পরিচালনায় 'আবির্ভাব' ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে রাজ্জাক-কবরী জুটির। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এ জুটিকে। 'রংবাজ', 'নীল আকাশের নিচে', 'পরিচয়, 'অধিকার', 'ময়নামতি', 'বেঈমান', 'ঢেউয়ের পর ঢেউ', 'অবাক পৃথিবী'সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে অনবদ্য অভিনয় দিয়ে এই জুটি তাদের কালকে জয় করে নিয়েছেন। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা মনে করেন, এ পর্যন্ত যত জুটি পর্দায় দেখা গেছে, তাদের মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটি সেরা। যদিও রাজ্জাক তার ক্যারিয়ারে একাধিক জুটি গড়ে সাফল্য পেয়েছেন। শাবানা ও ববিতার সঙ্গে অভিনীত তার ছবিগুলো জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। তারপরও অনেকের মতে, রাজ্জাক-কবরী জুটিই সেরা। স্বাধীনতার পর দেশীয় চলচ্চিত্রে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছাড়াও ফারুক-ববিতা, আলমগীর-শাবানা, সোহেল রানা-ববিতা, ওয়াসিম-অঞ্জু, ওয়াসিম-রোজিনা ও ববিতা-জাফর ইকবাল, জসিম-সুচরিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পা, ইলিয়াস কাঞ্চন-দিতি, মান্না-চম্পা থেকে শুরু করে সালমান শাহ-শাবনূর, ওমর সানী-মৌসুমী, মান্না-মৌসুমী, রিয়াজ-শাবনূর, রিয়াজ-পূর্ণিমা, শাকিব খান-অপু বিশ্বাস, শাকিব খান-বুবলী জুটির সিনেমা দর্শক দরুণভাবে গ্রহণ করেছেন।

ববিতা ও জাফর ইকবাল

ববিতা তার অভিনয় ক্যারিয়ারে রাজ্জাক, ফারুক ও সোহেল রানার সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করে দর্শক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। কিন্তু অন্যান্য শিল্পীর তুলনায় জাফর ইকবালের সঙ্গে তার অভিনীত ছবির সংখ্যা কম হলেও দর্শকের কাছে জাফর ইকবাল-ববিতা জুটি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। এ জুটির 'অবুঝ হৃদয়' 'এক মুঠো ভাত', 'সূর্য সংগ্রাম', 'সূর্য গ্রহণ' ছবিগুলোর কথা দর্শক আজও ভুলতে পারেননি। নন্দিত অভিনেত্রী ববিতার কথায়, 'দর্শক কার বিপরীতে কয়টি ছবিতে অভিনয় করেছি, সেটা মুখ্য বলে মনে করেন না। কার বিপরীতে বেশি মানিয়ে গেছি, সেটাই গুরুত্ব পায়। এ কারণে নির্দিষ্ট কিছু জুটির প্রতি দর্শকের এত আকর্ষণ।' তার এ কথা কতটা সত্যি, তা চলচ্চিত্র পর্দায় চোখ রাখলেই দেখা যায়। গত কয়েক যুগে আমরা দেখেছি, একটি জুটি জনপ্রিয়তা পেলে কীভাবে তাদের নিয়ে একের পর এক ছবি নির্মাণ হতে থাকে। আলমগীর-শাবানা জুটির কথা দিয়ে শুরু করা যাক। আলমগীর তার অভিনয় ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছেন শাবানার বিপরীতে। এর কারণ একটাই- এই জুটি দর্শকের কাছে ছিল বিপুল জনপ্রিয়। যে কারণে নির্মাতারা তাদের নিয়ে একের পর এক ছবি নির্মাণ করে গেছেন। আশি ও নব্বই দশকে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছে এ জুটি। ১৯৮৪ সালে 'ভাত দে' ও 'সখিনার যুদ্ধ' ছবি দুটির মধ্য দিয়ে তাদের একসঙ্গে চলচ্চিত্রে কাজ করা শুরু। এরপর 'মান-সম্মান', 'ঘরের বউ', 'অস্বীকার', 'রাঙা ভাবি', 'অশান্তি', 'সত্যমিথ্যা', 'মরণের পরে', 'গরীবের বউ' ও 'পিতামাতার সন্তান'সহ মোট ১৩০টি ছবিতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন তারা। একইভাবে জুটি বেঁধে সর্বাধিক ছবিতে কাজ করেছেন ওয়াসিম-রোজিনা জুটি।

আলমগীর-শাবানা

নব্বই দশকের শুরুতে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছিল ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে গড়ে ওঠা অঞ্জু ঘোষ, চম্পা ও দিতির জুটি। এর মধ্যে ইলিয়াস কাঞ্চন-অঞ্জু ঘোষ অভিনীত 'বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না' ছবিটি এখন পর্যন্ত দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ টাকা আয় করা সিনেমা। অন্যদিকে, একই সময়ে তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আগমন ও জুটি গড়ে অভিনয়ের বিষয়টি ছিল চোখে পড়ার মতো। নব্বই দশকের আরেকটি আলোচিত জুটি নাঈম-শাবনাজ। 'চাঁদনী' থেকে শুরু করে 'জিদ', 'লাভ', 'চোখে চোখে', 'ফুল আর কাঁটা', 'অনুতপ্ত' 'বিষের বাঁশি', 'সোনিয়া', 'টাকার অহঙ্কার', 'ঘরে ঘরে যুদ্ধ'সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করে তারা দর্শকের মনে জুটি হিসেবে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন। চলচ্চিত্র থেকে এ জুটি বিদায় নেওয়ার পর দর্শকের কাছে জুটি হিসেবে জায়গা করে নেন সালমান শাহ-শাবনূর ও মৌসুমী-ওমর সানী। এই দুই জুটি নিয়ে নব্বই দশকের মাঝামাঝি নির্মাতাদের মাঝে একরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাও চোখে পড়েছে। ওমর সানীর কথায়, তার ক্যারিয়ারে সেরা কাজগুলো ছিল মৌসুমীর সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করা ছবিগুলো। তবে মৌসুমী পরে মান্নার সঙ্গে জুটি বেঁধেও দর্শকের মনোযোগ কাড়তে পেরেছেন। কিন্তু ওমর সানীকে অন্যদের বিপরীতে সেভাবে সফল হতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, সালমান শাহ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যত কাজ করেছেন, তার মধ্যে শাবনূরের সঙ্গে অভিনীত ছবিগুলো বেশি আলোড়ন তুলেছে। 'চাওয়া থেকে পাওয়া' 'সুজন সখী', 'বিক্ষোভ', 'স্বপ্নের ঠিকানা', 'স্বপ্নের পৃথিবী', 'স্বপ্নের নায়ক', 'আনন্দ অশ্রু', 'মহামিলন', 'বিচার হবে', 'তোমাকে চাই', 'জীবন সংসার', 'বুকের ভিতর আগুন'সহ আরও কিছু ছবিতে অভিনয় করে সালমান-শাবনূর জুটি দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন। এ নিয়ে শাবনূর বলেছেন, 'আমার ক্যারিয়ারে যত শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করেছি, তার মধ্যে সালমান শাহ অন্যতম একজন। অন্যদের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেও দর্শক প্রশংসা পেয়েছি। কিন্তু বারবারই প্রমাণ হয়েছে, সালমানের সঙ্গে যে কাজগুলো করেছি, তার আবেদন কখনোই দর্শকের কাছে ফুরোবে না।'

রিয়াজ-পূর্ণিমা 

সালমান শাহর পর রিয়াজের সঙ্গে জুটি বেঁধে সবচেয়ে বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন শাবনূর। রিয়াজ-শাবনূরের পাশাপাশি একই সময়ে শাকিল খান-পপি জুটিও দর্শকের মনোযোগ কেড়েছিল। কিন্তু অভিনয়ের ভুবন থেকে শাকিল আড়ালে চলে যান, শাকিল-পপি জুটির পথচলা থেমে যায়। অন্যদিকে, শাবনূরের পর রিয়াজ আলোচনায় আসেন পূর্ণিমার সঙ্গে একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে। 'মনের মাঝে তুমি', 'হৃদয়ের কথা', 'মেঘের পরে মেঘ', 'আকাশছোঁয়া ভালোবাসা', 'এ জীবন তোমার আমার', 'মায়ের সম্মান', 'জামাই শ্বশুর', 'তুমি কত সুন্দর'সহ এই জুটির আরও কিছু ছবি দর্শকের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। জুটি বিষয়ে রিয়াজ বলেন, 'দর্শকের ভালোলাগার কথা ভেবেই জুটি গড়া হয়। এর মধ্যে কোনো জুটি এতটাই সফল হয় যে, তাদের নিয়ে দর্শকের প্রত্যাশাও বাড়তে থাকে। শাবনূরের পাশাপাশি পূর্ণিমার সঙ্গে জুটি বেঁধে বেশি কাজ করেছি শুধুই দর্শকের প্রত্যাশা পূরণের জন্য।' তার এ কথা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, যুগ যুগ ধরে সিনেমায় জুটি গড়া হয়েছে দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য। তবে জুটি যেমনই হোক, অভিনয়ের বিষয়টাও সবসময় গুরুত্ব পেয়েছে, এ কথাও স্বীকার করেন সব অভিনয়শিল্পী।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com