খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে পানির জন্য হাহাকার

প্রকাশ: ২৭ মে ২১ । ১৯:০৫

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

ছড়া থেকে পানি সংগ্রহ করছেন স্থানীয় এক বৃদ্ধা -সমকাল

খাগড়াছড়ি জেলার দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে পানির জন্য হাহাকার চলছে। সুপেয় পানি তো দূরের কথা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেও নিত্য ব্যবহার্য্য পানিও মিলছে না। জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সুপেয় বা খাবার পানির জন্য মূলত প্রাকৃতিক ছড়া, ঝিরি ও কুয়ার পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই উৎসগুলোতে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চরম কষ্টে আছে বাসিন্দারা। বিশেষ করে, বৈশাখ ও চলতি জৈষ্ঠ্য মাসে প্রত্যাশিত বৃষ্টি না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দীঘিনালা, গুইমারা, খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি উপজেলার দূরবর্তী এলাকাগুলোতে পানির অভাবে দৈনন্দিন জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এক কলস পানির জন্য দুই-আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তাও আবার অনেক সময় মানুষ বেশি হলে খালি কলসি নিয়ে ফিরতে হয় কাউকে কাউকে। কোন কোন এলাকায় বসতিপাহাড় থেকে কুয়া কয়েক’শ ফুট নিচে থাকায় ঝুঁকি নিয়ে মা ও শিশুদের পানির উৎসে পৌঁছাতে হচ্ছে। বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষদের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা রীতিমতো কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। মাঝে মাঝে সামান্য বৃষ্টিপাতে এসব ঝিরি ও কুয়ার পানি ঘোলাটে ও অপরিষ্কার হয়ে পড়ায় সেই সময় দুর্ভোগ আরও বাড়ে।

সিন্দুকছড়ি এলাকার কলেজছাত্র যশোদা ত্রিপুরা জানান, নিজের গ্রামে সুপেয় পানির উৎস বলতে ঝিড়ি ও কুয়া। প্রতিদিন পরিবারের সদস্যদের জন্য অনেক পথ পাড়ি দিয়ে সুপেয়ে পানি সংগ্রহ করেন তিনি।

স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রত্মা কিশোর ত্রিপুরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দোগ্যছড়াসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামে পানির সমস্যা শুরু হয়েছে। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সুইনুপ্রু মারমার দায়িত্বকালীন সময়েও পানির জন্য বিভিন্ন জনের কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি।

দ্যোগ্যছড়া গ্রামের কার্বারী থোয়াইঅং ত্রিপুরা বলেন, আমাদের এখানে সারা বছরই সুপেয় পানির সংকট থাকে। তবে অন্যান্যবারের তুলনায় এ বছর সংকট বেশি। ৪/৫ শ’ ফুট পাহাড়ি পথ ডিঙিয়ে এসব এলাকার মানুষকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর মিলে উদ্যোগ নিলে মানুষের পানির এই কষ্ট কমবে বলে আশাবাদী তিনি।

সিন্দুকছড়ি ইউপির সদস্য সবেন জয় ত্রিপুরা বলেন, আমার ওয়ার্ডে সমস্যার শেষ নেই। এরমধ্যে পানির সমস্যা অন্যতম। সারা বছর পানির জন্য কষ্ট করতে হয় এখানকার মানুষদের। গভীর নলকূপ বসাতে চাইলেও পাথুরে হওয়ায় পানির উৎস পাওয়া যায় না, তখন ঠিকাদাররা কাজ করতে চান না। সমস্যার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরেও জানিয়েছি, দেখা যাক তারা কী করে?

‘জাবারাং’র নির্বাহী পরিচালক ও গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি এলাকার ঝিরি-ঝর্ণাগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বাণিজ্যিকভাবে গাছ কর্তন, পাথর উত্তোলন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি এর মূল কারণ। অন্যদিকে পর্যটকরা পরিবেশবান্ধব আচরণ না করাও একটি বড় কারণ। 

তিনি বলেন, পাহাড়ে আগে বড় বড় গাছ ছিল। পাহাড় না কেটে আমরা ঘর-বাড়ি তৈরি করতাম। কিন্তু এখন বন উজার হয়ে যাচ্ছে। জঙ্গল আগের মত সবুজ নেই। চারিদিকে ন্যাড়া পাহাড়। যার কারণে পাহাড়ে এখন পানির সংকট।

খাগড়াছড়ি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রেবেকা আহসান জানান, যেসব পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট কিংবা পানির উৎস নেই, সেসব এলাকায় একটি জরিপ করা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় গভীর নলকূপ ও চাপকলের সংখ্যা ৯ হাজার ৬৮৩টি। এর মধ্যে বিদ্যালয়ে বসানো হয়েছে ২৩৪টি। চলতি অর্থবছরে ৩৪টি গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। খাগড়াছড়ি জেলায় মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬ শতাংশকে পানি সরবরাহ করা হয়। অন্যরা প্রাকৃতিক উৎসের (ঝিরি, ঝর্ণা, কুয়া, ছড়া) ওপর নির্ভরশীল।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com