বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র

করোনার নমুনা পরীক্ষার নামে অবাধ বাণিজ্য

০৮ মে ২১ । ০০:০০

রাজবংশী রায়

প্রতীকী ছবি

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবাধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। নমুনা পরীক্ষার জন্য ব্যবহূত আরটিপিসিআর কিটের মূল্য প্রতিটিতে প্রায় আড়াই হাজার টাকা কমলেও তারা পরীক্ষার ফি এক টাকাও কমায়নি। এভাবে গত ৬৮ দিনেই প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বাড়তি নিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। আগের বছরের হিসাব যুক্ত করলে তারা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের জানুয়ারির দিকে প্রতিটি আরটিপিসিআর কিটের মূল্য ছিল তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা। সে সময় বিশ্বব্যাপী কিটের সংকট ছিল। দেশেও একমাত্র আইইডিসিআর ছাড়া কেউ পরীক্ষা শুরু করেনি। এপ্রিলের শেষ দিকে ৭৭টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষা শুরু হলে ফি নির্ধারণ করা হয় তিন হাজার ৫০০ টাকা। আর বাসাবাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করালে ফি চার হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে কিটের মূল্য কমে ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে; কিন্তু নমুনা পরীক্ষার মূল্য কমেনি। প্রতিটি নমুনা পরীক্ষায় দুই হাজার ৭০০ টাকা বেশি নিচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিটের দাম কমতে কমতে গত মার্চে ৮০০ টাকায় নেমে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৬৮ দিনে বেসরকারি ৭৭টি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ ৫৩ হাজার ৯৪৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার টাকা গড়ে প্রতিটি পরীক্ষার বিপরীতে বেসরকারি হাসপাতালগুলো পেয়েছে ১৯৩ কোটি ৪৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাড়তি টাকা নিয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।

সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সারাদেশে যে ৭৭টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে করোনার নমুনা পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে তার দুই-তৃতীয়াংশই রাজধানী ঢাকায়। এর মধ্যে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, করোনাকালের সংকট কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্নিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোজসাজশে এসব প্রতিষ্ঠান আরটিপিআর ল্যাব তৈরির অনুমোদন বাগিয়ে নিয়েছে। এ সুযোগে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ কারণে কিটের মূল্য কমলেও নমুনা পরীক্ষার ফি কমানো হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, করোনাকালের সংকট কাজে লাগিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নমুনা পরীক্ষা নামে তিন থেকে চারশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিটের মূল্য কমার সঙ্গে সঙ্গে নমুনা পরীক্ষার ফি কমে আসবে, সেটি স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু তা হয়নি। সংশ্নিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা উদ্যোগী হলে কয়েক মাস আগে থেকেই ফি কমানো যেত। সুতরাং তারা দায় এড়াতে পারেন না।

বর্তমানে দেশে মোট ৪৪৩টি পরীক্ষাগারে করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১২৭টি আরটিপিসিআর, জিএন এক্সপার্ট ৩৩টি এবং র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ২৮১টি। বেসরকারি ৭৫টি প্রতিষ্ঠানে আরটিপিসিআর এবং দুটিতে জিএন এক্সপার্ট মেশিনের মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত দেশে ৫৫ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৪১ লাখ ১৮ হাজার ১৫১টি নমুনা পরীক্ষা করেছে। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ১৫১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষার ফি তিন হাজার ৫০০ টাকা এবং বাড়ি গিয়ে নমুনা আনলে চার হাজার ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করে দেয় সরকার। নমুনাপ্রতি তিন হাজার ৫০০ টাকা করে ধরলে ৭৫টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গতকাল পর্যন্ত ৫১৮ কোটি ৩৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছে। বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহের ফি হিসাবে নিলে টাকার অঙ্ক আরও বাড়বে। তবে কতসংখ্যক নমুনা বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলোর সঠিক পরিসংখ্যন নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, কিটের মূল্য তিন হাজার ২০০ টাকা যখন ছিল তখন প্রতিটি নমুনা পরীক্ষায় তাদের গড়ে এক হাজার টাকা করে লোকসান গুনতে হয়েছে। তখন সরকারের অনুরোধে লোকসান মেনে নিয়ে তারা নমুনা পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছিলেন। কিটের মূল্য কমে আসার পর এখন কিছুটা লাভ হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, 'করোনাকালে নমুনা পরীক্ষার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো তিন থেকে চারশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারি করলে এটি এড়ানো যেত। কারণ, যখন কিটের মূল্য কমে আসছে, তখন নমুনা পরীক্ষার ফি আগেরটি বহাল থাকবে কেন? এটি কমে আসার কথা।'

বিশিষ্ট এই চিকিৎসক আরও বলেন, 'এখন সরকারের উচিত বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকদের চাপ প্রয়োগ করে জনগণের কাছ থেকে নেওয়া বাড়তি টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কারণ, মহামারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা এভাবে বাণিজ্য করতে পারে না।'

৭৭টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল ৫৩ হাজার ৪৮৮টি, স্কয়ার হাসপাতাল ৮৬ হাজার ৫২৬টি, প্রভা হেলথ বাংলাদেশ লিমিটেড এক লাখ ১৫ হাজার ৯৬১টি, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ৪৩ হাজার ৯৯৫টি, ইউনাইটেড হাসপাতাল ৪৯ হাজার ৯০৩টি, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ২৬ হাজার ৭৫৪টি এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল নমুনা পরীক্ষা করেছে ৮২ হাজার ৭৯১টি। অন্যদের মধ্যে ডিএমএফআর মলিক্যুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৮০ হাজার ১২৬টি, ডিএনএ সল্যুয়েশন লিমিটেড ৫৬ হাজার ১৭১টি, এ এম জেড হাসপাতাল লিমিটেড ৪১ হাজার ৯৯৮টি, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ২৯ হাজার ৬৬০টি, আইসিডিডিআর,বি ৮৯ হাজার ৮০০টি, আলোক হেলথ কেয়ার লি. ১৬ হাজার ৭২১টি, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৫৯ হাজার ২৯২টি, ফেমাস স্পেশালাইজড হাসপাতাল ৯৬ হাজার ৭৯৫টি, স্টেম হেলথ কেয়ার ৩৩ হাজার ৬৭৩টি, প্রেসক্রিপশন পয়েন্ট লিমিটেড ৩৮ হাজার ৮৫৫টি, বসুন্ধরা মেডিকেল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিব সেন্টার ৩২ হাজার ৮৪০টি, চট্টগ্রামের ইমপেরিয়াল হাসপাতাল ২৭ হাজার ৬৮০টি, শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি ৩৯ হাজার ৩৫১টি, বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রাফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল ২০ হাজার ৬০০টি, সিলেটের সীমান্তিক প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১২ হাজার ৬৭৮টি, খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ ৯৩৯টি, কিশোরগঞ্জের জহরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ১১ হাজার ৭২০টি, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ গাজী কোভিড-১৯ পিসিআর ল্যাব ৪৭ হাজার ৯১৯টি, গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ১৮ হাজার ৭৭৯টি নমুনা পরীক্ষা করেছে।

কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লা সমকালকে বলেন, কিটের মূল্য কমে ৮০০ টাকায় নেমেছে। সুতরাং নমুনা পরীক্ষার ফি আগেরটি বহাল রাখা যুক্তিযুক্ত নয়। এ অবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা ফি এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিঞা সমকালকে বলেন, করোনার নমুনা পরীক্ষার ফি পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে যাচাই-বাছাই করে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সে অনুযায়ী ফি নির্ধারণ করা হবে।

তবে নমুনা পরীক্ষার ফি কত টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন ডা. ফরিদ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com