প্রতিবেশী

মমতার বিজয় যে বার্তা দেয়

১১ মে ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২১ । ০৪:০৬

সুধীর সাহা

মেরুকরণের রাজনীতির বিরুদ্ধে, হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ৬৫ বছরের এক জননেত্রীর সামান্য হ্যাটট্রিক। পশ্চিমবঙ্গের আবেগের অন্য নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মীয় বিভাজন, সামাজিক বিভাজন, জাতিসত্তার বিভাজন, সামাজিক শ্রেণিবিভাজন- বাঙালির বিরুদ্ধে যত রকম বিভাজন হতে পারে, সমস্ত বিভাজনকে হাতিয়ার করে বিজেপি কৌশল নির্ধারণ করলেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাদের দেখিয়ে দিয়েছে তারা বিভাজনে নেই, মেরুকরণে নেই। জাত-ধর্ম-দলিত-মতুয়ার পরিচিতির রাজনীতির বিভাজনে নেই। এ যেন ছিল বাঙালির আবেগের সার্থক প্রতিচ্ছবি। প্রমাণ হলো, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির শেষ কথা- আদিগঙ্গার কোলে বাংলার সাধারণ ঘরে বেড়ে ওঠা অসীম সাহসী এক নারী। মোদি-অমিত শাহের মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে বুক চিতিয়ে মাঠজুড়ে তিনি খেললেন এক পায়েই। জিতলেনও। সার্থকভাবেই তিনি পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে। প্রগতিশীল রাজনীতির হাত ধরে বাংলার যে সত্তা ও পরিচিতি নির্মাণ করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন, সেই সংস্কৃতি ও মতামত প্রকাশের ওপর বিজেপির খবরদারির অবসান হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের এ রায়ে। এ নির্বাচন ছিল পশ্চিমবঙ্গের নিজের সত্তা ও সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করতে এসে পশ্চিমবঙ্গের শেকড় ধরে টান দিয়েছিল মোদির বিজেপি। কিন্তু সবশেষে মমতার হাত ধরে তার সমুচিত জবাব দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ।

পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বাংলাদেশের জন্যও। নির্বাচনটি পশ্চিমবঙ্গকে একটি ক্রান্তিকালের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। বাঙালি বাংলাকে কীভাবে দেখবে- এমন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল এ নির্বাচন। চরম বিভাজনমূলক এ রকম বহু প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল সুকৌশলে। হিন্দু বাঙালিরা মুসলিম বাঙালির দিকে তাকিয়ে বলবে, ওকি বাঙালি নাকি? ও তো মুসলিম! ভারতে বিভাজনের রাজনীতির প্রবর্তক বিজেপি এটা করেছিল ক্ষমতা দখলের জন্য। মমতার তৃণমূল কংগ্রেস বাংলা ধ্বংসের বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে বিজেপিবিরোধী একটা সফল মঞ্চ দাঁড় করিয়েছিল। মহানগরের জনসমাবেশ, মিছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বত্র তাদের বক্তব্য ছিল- 'যেখানে খুশি, যে কোনো দলকে ইচ্ছেমতো ভোট দিন; কিন্তু একটি ভোটও যেন না দেওয়া হয় বিজেপিকে।' রাজ্যের সুস্থ সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এভাবে নাগরিক সমাজের এগিয়ে আসাটা মমতা ব্যানার্জির বিজেপিবিরোধী লড়াইকে আরও শক্তি দিয়েছিল। মমতা বোঝাতে চেয়েছিলেন, বিজেপির পরাজয় সমগ্র বাঙালির সুস্থ চেতনার জয়। বিভাজনের বিরুদ্ধে মানবতার জয়। বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে সমগ্রতার জয়। মৌলবাদের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির জয়। ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসের জয়।

মোদির নৌকা বাংলায় নোঙর করতে চূড়ান্ত ব্যর্থ। কিন্তু বিজেপির প্রস্তুতি ছিল অনেকটাই। বিরোধীদের দলে টানার কৌশল হিসেবে বিজেপি গ্রহণ করেছিল 'রাবড়ি' থিওরি। রাবড়ি তৈরির সময় আগুনের গনগনে আঁচে দুধ ফোটানো হয়, আরও পরে দেওয়া হয় পাখার বাতাস। বহু ক্ষেত্রে এই থিওরি খাটিয়ে বিজেপি এবার দখল করতে চেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ। চাকরি বা দল বদল হোক, এ নৌকা থেকে ওই নৌকায় লাফ দেওয়ার নেপথ্যে কিছু চাওয়া-পাওয়ার আশ্বাস লুকিয়ে থাকে। যাকে বলা যায় 'টোপ'। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ঝড়ের আশায় তৃণমূলের ছোট-বড় অনেক মাছই সেই 'চার' গিলে নিয়েছিল। কেউ এমপির টিকিট কনফার্ম করাতে, কেউ কয়লার ময়লা গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে, কেউ কৃতকর্মের মাশুল চুকানোর আশঙ্কায় বেসুরো হয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপির ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল ঠিকই; কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, রাজনীতি টি-২০ ম্যাচ বা ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট নয়, এ হলো ম্যারাথন দৌড়। পশ্চিমবঙ্গে হেরে গিয়ে এমনটাই প্রমাণ দিল বিজেপি।

একবার নয়, দু'বার নয়, পরপর তিনবার তার এ অসামান্য গোল করার যোগ্যতা দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি। ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১। তারও আগে আড়াই দশকের প্রতিনিয়ত সংগ্রামের ইতিহাস তার। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মধ্যগগনে, সিপিএমের নামে তখন বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়। ঠিক সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েও রাস্তায় নেমে তাদের মোকাবিলা করেছেন মমতা ব্যানার্জি। পরিচিত রাজনীতির নামে গোটা সমাজটাকে হিন্দু আর মুসলিম আড়াআড়ি দু'ভাগে ভাগ করে দেওয়ার যাবতীয় চক্রান্তও ব্যর্থ করে দিলেন মমতা ব্যানার্জি। পশ্চিমবঙ্গে মমতার এ জয় শুধু মমতা ব্যানার্জির জয় নয়, শুধু তৃণমূলের রাজনীতির জয় নয়- এ জয় ধর্ম, জাত, শ্রেণির ঊর্ধ্বে থাকা বাঙালির জয়। বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি, মানবিক বাঙালিয়ানার এ ক্রান্তিকালে যিনি পশ্চিমবঙ্গকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে রক্ষা করলেন, সেই মমতা ব্যানার্জির কাছে বাঙালিকে ঋণী থাকতেই হবে। কারণ, এ নির্বাচনটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের নিজের সত্তা ও সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই। বিষয়গুলো যে কোনো বাঙালিপাড়ায় ভোটের লড়াইয়ে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে। বাংলাদেশের বাঙালিপাড়াও এ থেকে আলাদা নয়। তাই বাংলাদেশের সামনের ভোটযুদ্ধে মমতার উদাহরণ হতে পারে বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী; কলাম লেখক
ceo@ilcb.net

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com