রূপে ফলচর্চা

০৯ জুন ২১ । ০০:০০

তৌহিদুল ইসলাম তুষার

কখনও রোদ, কখনও বৃষ্টি। আবহাওয়ার এ খামখেয়ালিপনায় ত্বকের জৌলুস ধরে রাখা যেন দুরূহ হয়ে উঠছে। প্রকৃতি যেন কোনো বিধিনিষেধেরই তোয়াক্কা করছে না। তার ওপর অবহেলা ও অনিয়মিত যত্ন যেন উপরি পাওনা। ফলে ত্বক হারিয়ে ফেলছে সজীবতা। এ ছাড়াও রয়েছে অবিরাম তাপ, ধুলা, ঘামের সংস্পর্শ, ঋতুবদলের চাপ, ঘুমের অভাব এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। সবই প্রভাব ফেলে বাহ্যিক সৌন্দর্যে। এই সবকিছুর সমাধান মিলবে প্রাকৃতিক রূপচর্চায়। যার অন্যতম অনুষঙ্গ হতে পারে ফল। বাজারজুড়ে এখন মৌসুমি ফলের মেলা। সেই সঙ্গে সারাবছরই পাওয়া যায় রকমারি ফল। রকমারি ফলে রূপচর্চা নিয়ে এবারের আয়োজন।

ত্বক উজ্জ্বল করে আপেল

সারাবছরই পাওয়া যায় এমন ফলের মধ্যে আপেল অন্যতম। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি, যা ত্বক সতেজ ও উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এর ভিটামিন-বি ত্বকে চুলকানি, জ্বালাপোড়া ইত্যাদি সমস্যা থেকে রক্ষা করে। আপেল ত্বক উজ্জ্বল, মসৃণ ও প্রাণবন্ত করে তুলতে দারুণ কার্যকর। মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়া ও পিগমেন্টেশনের সমাধানে কার্যকরী ফল।

বলিরেখা দূর করে পেঁপে

পাকা পেঁপে একটি বারমাসি ফল। পেঁপে শরীরের জন্য যেমন উপকারী, তেমনি রূপচর্চায় পেঁপের ভূমিকা অনেক। ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে সাহায্য করে পেঁপে। এ ছাড়া ত্বকের ময়লা পরিস্কার করতে বিশেষভাবে সাহায্য করে পেঁপেতে থাকা এনজাইম। নিয়মিত পেঁপের ব্যবহার ত্বকে বয়সের ছাপ থেকে মুক্তি দেয়। এ ছাড়া ত্বকের অতিরিক্ত তেল দূর করতে পারে। প্রাকৃতিক ক্লিনজার বাঙ্গি

বাঙ্গি ত্বকের জন্য প্রাকৃতিক ক্লিনজারের কাজ করে। প্রাকৃতিকভাবেই ত্বককে ফেয়ার পলিশ করতে সহায়তা করে বাঙ্গি। ত্বকের কালচে, রোদে পোড়া দাগ দূর করে ত্বককে করে তোলে মসৃণ ও সুন্দর। ফেসওয়াশ এবং স্ট্ক্রাবের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য এই বাঙ্গি। মৌসুমি ফলটির পেস্টের সঙ্গে দুধ ও মধু মিশিয়ে মুখে লাগালে ত্বকের রোদে পোড়া ভাব দূর হয়।

ত্বক টানটান রাখে স্ট্রবেরি

স্ট্ক্রাবার অথবা মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করা যায় স্ট্রবেরি। কখনও-বা স্ট্রবেরি ফেসিয়াল করিয়ে নিন। স্ট্রবেরি ত্বক উজ্জ্বল করে। তিন থেকে চারটি স্ট্রবেরি রস করে মুখে লাগিয়ে নিতে পারেন। স্ট্রবেরির রস ভালো টোনারের কাজ করে।

পোড়াভাব দূর করে তরমুজ

ত্বকে সজীব ভাব আনতে তরমুজের জুড়ি নেই। কয়েক কিউব তরমুজ ব্লেন্ড করে মধু ও চালের গুঁড়া মিশিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন স্ট্ক্রাব। এই স্ট্ক্রাব ত্বক ও শরীর থেকে সারাদিনের ধুলাবালি, ময়লা বের করবে। বাইরে থেকে ফিরে রোদে পোড়া অংশে তরমুজ ২০ মিনিটের জন্য লাগিয়ে ধুয়ে নিলে পোড়াভাব দূর হবে। এ ছাড়া তরমুজের রস বরফ করে ডিপে রেখে দিতে পারেন। বাসায় ফিরে মুখে ঘষে নিলে ত্বকে সজীবতা চলে আসবে। নমনীয় ত্বকের জন্য তরমুজের রস ও দই একসঙ্গে মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিতে পারেন। আর শুস্ক ত্বকের জন্য তরমুজের রস ও মধু নিন। তারপর মুখে লাগিয়ে পরে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে উপকার পাবেন। ত্বক যদি হয় সংবেদনশীল তবে তরমুজের রস না নিয়ে, এটি চটকে সেটা মধু দিয়ে মিশিয়ে ত্বকে লাগান।

ত্বকের কালচে দাগ-ছোপ থেকে বাঁচায় লিচু

রসালো এই ফলটির স্বাদ যেমন, তেমনই রূপচর্চায়ও অপরিহার্য। ত্বকের কালচে দাগ-ছোপ দূর করতে লিচুর রস অত্যন্ত কার্যকরী। লিচু চটকে তা মুখে মেখে মিনিট পনেরো রেখে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে অন্তত দু'দিন এমন করতে পারলে মুখের ত্বকের কালচে দাগ-ছোপ সহজেই দূর হয়ে যাবে। রোদে পোড়া ত্বক এবং বলিরেখা দূর করতে লিচুর রসের জুড়ি মেলা ভার।

ব্রণ সমাধান দেয় ড্রাগন ফল

ড্রাগন ফলের সঙ্গে টক দই মিশিয়ে প্যাক বানাতে পারেন। তাহলে ত্বক টানটান হয়। অন্যদিকে ব্রণের সমস্যাও দূর করে এই ফল। ড্রাগন ফলের শাঁস বের করে চটকে পেস্ট করে নিতে হবে। এরপর পরিস্কার তুলায় করে পরিমাণমতো পেস্ট নিয়ে ব্রণের ওপর লাগান। একাধিক ব্রণ থাকলে আলাদা আলাদা তুলা ব্যবহার করবেন, যাতে ছত্রাকের সংক্রমণ না হয়। পরে হালকা গরম পানিতে ধুয়ে ফেলুন। এক্ষেত্রে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছবেন না, প্রাকৃতিক হাওয়ায় শুকিয়ে যেতে দিন। তা ছাড়া রোদের পোড়া ভাব দূর করতে পারে ড্রাগন ফল।

কালো দাগ দূর করতে কলা

কলা সারাবছরই পাওয়া যায়। পাকা কলা, টক দই, জলপাই তেল, মধু একত্রে মিশিয়ে মাথার ত্বকে এবং চুলে লাগিয়ে শুকিয়ে গেলে শ্যাম্পু করে নিন। চুল ঝরঝরে মসৃণ হবে। মুখের কালো দাগ দূর করতে পাকা কলা, মধু, গ্লিসারিন আর ডিমের সাদা ভাগের মিশ্রণ ১৫ মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

উজ্জ্বলতা বাড়াতে আঙ্গুর

মুখের ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে আঙ্গুর খুব উপকারী। মুলতানি মাটি, আঙ্গুরের রস, গোলাপজল ও লেবুর রস একত্রে মিশিয়ে ফেসপ্যাক বানিয়ে নিতে পারেন। ফলে আপনার ত্বক হয়ে উঠবে দীপ্তিময় সুন্দর।

অসম রং ঠিক করতে লেবু

ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এবং অসম রং ঠিক করে লেবু। লেবুর রস খুব সহজেই হাতের কনুই, হাঁটু ও ব্রণের দাগ দূর করে ত্বক উজ্জ্বল করে তোলে। একটি লেবু অর্ধেক করে কেটে প্রতিদিন হাতের কনুই ও হাঁটুর কালো দাগের ওপর হালকাভাবে ঘষলে কালচে দাগ কমে যাবে। পাশাপাশি ব্রণের দাগ হালকা করতেও লেবু সমান উপকারী। দাগের জায়গায় লেবুর রস লাগিয়ে রস শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এরপর হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। নিয়মিত ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়। তবে আঘাত বা কাটা জায়গায় লেবুর রস লাগানো উচিত নয়। খেয়াল রাখতে হবে, যেন অতিরিক্ত সময় ত্বকে লেবুর রস লাগিয়ে না রাখা হয়। লেবু, কমলালেবু এবং মালটা একই রকম কাজের জন্য উপকারী।

চোখের ডার্ক সার্কেল দূর করে শসা

চোখের ক্লান্তি ভাব ও ডার্ক সার্কেল দূর করতে শসার ব্যবহারের কথা আমরা প্রায় সবাই জানি। ত্বকের পুষ্টি বাড়াতে শসা কেটে তাতে দই ও ওটমিল মিশিয়ে মুখে ও গলায় লাগিয়ে নিন। মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন।

ত্বকের নমনীয়তা বাড়ায় ডাব

ত্বকের জন্য কচি ডাব উপকারী। প্রতিদিন দুটি ডাবের পানি পান করলে ত্বকের নমনীয়তা বাড়ে। সেই সঙ্গে কচি ডাবের পানিতে মুখের দাগও দূর হয়ে যায়। প্রতিদিন ডাবের পানিতে মুখ ধুলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়।

ফল খেলেই উজ্জ্বল ত্বক

এ তো গেল ত্বকের ওপর লাগিয়ে রূপচর্চার বিষয়। কিছু ফল রয়েছে খেলেই হবে, বাড়তি কষ্ট করে প্যাক বানাতে হবে না। তার মধ্যে অন্যতম এই সময়ের ফল আম। ফলটিতে রয়েছে ভিটামিন-এ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। প্রাকৃতিকভাবে ত্বক সজীব করতে পারে এ ফল। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নরম, কোমল ও মসৃণ করে তুলতেও সাহায্য করে। অন্যদিকে রক্ত পরিস্কারক হিসেবে সুপরিচিত আঙ্গুর। রক্তের দূষিত পদার্থ দূর করে ভেতর থেকে ত্বক সুন্দর করে তোলে এই ফল। এ ছাড়া ত্বক শুস্ক ও রুক্ষ হয়ে যাওয়ার সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে এই ফল। আঙ্গুরের বীজে আছে পলিফেনল নামের একটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান, যা ত্বকের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি পূরণ করে ত্বকে বয়সের প্রভাব কমিয়ে আনে। ফলটিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-সি থাকায় শরীরের দূষিত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে। ফলে ভেতর থেকে ত্বক পরিস্কার ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করে। কমলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে বেটা-ক্যারোটিন; যা ত্বকের কোষ গঠন করতে সহায়তা করে। আর বয়সের ছাপ দূর করতে পারে। ত্বকের সৌন্দর্য রক্ষায় দারুণ উপকারী বেদানা। এই ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। তাই নিয়মিত এই ফল খেলে ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখা যায় দীর্ঘদিন। বেদানা বীজের নির্যাস ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কমায়, এমনটা জানা গেছে এক গবেষণায়। তা ছাড়া ব্রণের সমস্যা কমাতেও উপকারী এই ফল। প্রতিদিন আপেল খেলে ত্বকে বলিরেখা পড়ার সম্ভাবনা কমে। ত্বক পরিস্কারক হিসেবেও কাজ করে এই ফল।

ত্বকে ফল ব্যবহারে সতর্কতা

ফল খুবই কার্যকরী ত্বকের জন্য। কোনো কোনো ফলে অনেকের অ্যালার্জি সমস্যাও দেখা দিতে পারে, সেই ফল ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। সিট্রাস ফল ব্যবহারের কারণে ত্বকে আলোক সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে। তাই এটা ব্যবহারের কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে বাইরে বের হতে হবে। ত্বক বা চুলে ব্যবহারের জন্য তাজা ও ভালো ফল দেখে নিন। ত্বক একটি সংবেদনশীল অঙ্গ। পচা বা আগের কেটে রাখা ফল ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। আশানুরূপ ফল পেতে যে কোনো প্যাক নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে। সব প্যাক সবার ত্বকে মানায় না। আপনার ত্বকে যে প্যাক মানায় সেটিই ব্যবহার করুন। প্রথমবার ব্যবহারে ত্বকে কোনো রকম সমস্যা বোধ করলে সেই প্যাকটি ব্যবহার বন্ধ করে দিন। পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়ার পর নরম টাওয়েল দিয়ে চেপে পানি মুছে নিন। কখনও ত্বক মুছবেন না। ফ্রিজে রাখা ফলের রস বা যে কোনো ধরনের প্যাক বেশিদিন ব্যবহার করবেন না। নরমাল ফ্রিজে রাখলে সর্বোচ্চ ৩ দিন এবং ডিপ ফ্রিজে রাখলে ৭ দিন ব্যবহার করতে পারেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com