কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংঘাত

মির্জারা মিলে গেছেন, মুজাক্কির ও আলাউদ্দিন বলি হয়েছেন

দুই পরিবারে এখনও কান্নার রোল

১৩ জুন ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জুন ২১ । ১১:০৯

আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী

'আমার চার বছরের একজন ছেলে ও ১৮ মাস বয়সী একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু রয়েছে। প্রতিবন্ধী মেয়েটির জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। এখন দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। টাকার অভাবে প্রতিবন্ধী মেয়েটির চিকিৎসা করাতে পারছি না। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে ভেবে পাচ্ছি না।' কথাগুলো বলেছেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত আলাউদ্দিনের স্ত্রী পারভীন আক্তার সুমি।

এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জের ধরে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত দুই যুবকের পরিবার শোক কাটিয়ে উঠলেও জীবন-জীবিকা নিয়ে রয়েছেন চরম উৎকণ্ঠায়। এ ব্যাপারে সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কিরের বাবা নোয়াব আলী মাস্টার বলেন, 'দুই পক্ষের এক নেতা আমার বাসায় সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন, আরেক নেতা ছেলের কবর জেয়ারত করতে আসবেন বলে শুনছি। কিন্তু তাতে কি আমার ছেলে ফিরে আসবে? যাদের কারণে আমার নিরপরাধ ছেলের জীবন গেছে আমি তাদের শাস্তি চাই। মির্জারা মিলে গেছেন, আমাদের সন্তানরা বলি হয়েছেন।'

স্থানীয় বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় অটোরিকশাচালক আলাউদ্দিন ও সাংবাদিক মুজাক্কির নিহত হন। নিহতরা হলেন উপজেলার চরফকিরা গ্রামের নোয়াব আলী মাস্টারের ছেলে সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির (২৫) ও চরফকিরা ইউনিয়নের চরকালী গ্রামের মমিনুল হকের ছেলে পরিবহন শ্রমিক আলাউদ্দিন (৩২)। গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চের মধ্যে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিতে তারা মারা যান। এ ঘটনায় পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে। মামলা দুটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নোয়াখালী কার্যালয় তদন্ত করছে।

এদিকে, বেশ কয়েক মাস স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা তার বড় ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলেও সম্প্রতি তিনি বড় ভাইয়ের সঙ্গে মিলে গেছেন। কিন্তু আবদুল কাদের মির্জা ও তার প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অনৈক্যে নিহতদের স্বজনরা বলছেন, দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে যাদের প্রাণ গেল তাদের পরিবারের খবর তো কেউ নেন না, এই অমানবিকতার বিচার কে করবে?

জানা যায়, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদল এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খান। গত ডিসেম্বরে বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা ৩১ ডিসেম্বর তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী ও ফেনীর সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখেন। এ নিয়ে কাদের মির্জার সঙ্গে একরামুল করিম চৌধুরীর অনুসারী মিজানুর রহমান বাদলের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সেই দ্বন্দ্বের জের ধরে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে পুলিশের উপস্থিতিতে আবদুল কাদের মির্জা ও মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের চিত্র ধারণ করার সময় সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। তাকে গুরুতর অহত অবস্থায় প্রথমে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২ ফেব্রুয়ারি রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুজাক্কির মারা যান।

মুজাক্কিরের বাবা নোয়াব আলী মাস্টার সমকালকে বলেন, 'আমার মেধাবী ছেলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি হয়েছে। ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম। ১৯ ফেব্রুয়ারি কাদের মির্জা ও বাদলের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি। কেউ কেউ আমাকে বলেছে, বাদলের লোকের গুলিতে মুজাক্কির মারা গেছে। আবার কেউ কেউ বলেছে, কাদের মির্জার লোকজনের গুলিতে মারা গেছে। যেহেতু ঘটনার সময় আমরা কেউ উপস্থিত ছিলাম না, সেহেতু এ ব্যাপারে আমি কোনো কিছুই বলতে পারছি না। আমার ছেলের খুনের বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর কেউ আর আমাদের খবর রাখেনি। আমরা কীভাবে আছি তাও কেউ খোঁজ রাখে না।'

নোয়াব আলী মাস্টার বলেন, 'মুজাক্কির মারা যাওয়ার পর মিজানুর রহমান বাদল আমার বাড়িতে একবার এসেছিলেন। আর কোনো নেতা আসেননি। এখন শুনছি কাদের মির্জা মুজাক্কিরের কবর জিয়ারত করতে আমাদের বাড়িতে আসবেন।' তিনি আরও বলেন, 'নেতারা কেউ বাড়িতে আসবেন, কেউ কবর জেয়ারত করবেন, তাতে কি আমার ছেলে ফিরে আসবে? আমার নিরপরাধ ছেলে যাদের গুলিতে মারা গেছে সে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।'

জানা যায়, গত ৯ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে কোম্পানীগঞ্জে বসুরহাট পৌরভবনে অবস্থান নেয় আবদুল কাদের মির্জা ও তার অনুসারীরা। এ সময় পৌর সদরে অবস্থান নেয় মিজানুর রহমান বাদল ও তার অনুসারীরা। এর আগের দিন বিকেলে বসুরহাট বাজারে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার জের ধরে রাতের আঁধারে বসুরহাট পৌরভবনে চারপাশ থেকে গুলি ও বোমা হামলা চালায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। এ সময় গুলিতে ও বোমায় বসুরহাট পৌরভবন ক্ষতিগস্ত হয়। ওই হামলায় চরফকিরা ইউনিয়নের চরকালী গ্রামের মমিনুল হকের ছেলে আলাউদ্দিন (৩২) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন ৩০ জনের বেশি। এ হামলার জন্য কাদের মির্জা মিজানুর রহমান বাদল ও তার লোকজনদের দায়ী করেছেন।

গুলিতে নিহত পরিবহন শ্রমিক আলাউদ্দিনের ছোট ভাই এমদাদ হোসেন রাজু বলেন, 'আমার ভাই সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে বড় কষ্টে আছেন।'

আলাউদ্দিনের ছোট ভাই এমদাদ হোসেন রাজু বলেন, তার ভাই মারা যাওয়ার পর তাদের বাড়িতে মিজানুর রহমান বাদল একবার এসেছেন। সামান্য সহযোগিতাও করেছেন। এ ছাড়া তাদের পরিবারের খবর কেউ রাখেননি। তার ভাইয়ের রেখে যাওয়া দোচালা টিনের জীর্ণ ঘরটিও টাকার অভাবে মেরামত করতে পারছেন না। তিনি তার ভাইয়ের পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা ও একটি ঘর করে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে মিজানুর রহমান বাদল বলেন, কাদের মির্জার সন্ত্রাসীদের গুলিতে সাংবাদিক মুজাক্কির ও শ্রমিকলীগ নেতা আলাউদ্দিন নিহত হয়েছেন। নিহতরা দু'জনেই তার অনুসারী দাবি করে তিনি বলেন, 'পরিবহন শ্রমিক আলাউদ্দিনের পরিবারকে তিনি কয়েক দফায় আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতেও তিনি বড় ধরনের সহযোগিতা করার পরিকল্পনা করেছেন। মুজাক্কিরের বাড়িতেও তিনি একাধিকবার গিয়েছেন, পরিবারের খোঁজখবর রেখেছেন।'

আবদুল কাদের মির্জা বলেন, 'মিজানুর রহমান বাদল ও তার পালিত সন্ত্রাসীরা গুলি করে নিরপরাধ সাংবাদিক মুজাক্কির ও আলাউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করেছে। আমি হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি। ৯ মার্চ রাতে মিজানুর রহমান বাদলের বাহিনী আমার ওপরও হামলা চালিয়েছে। এসব অপকর্মের হোতাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি করছি।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com