করোনা-দুর্যোগ

মানবিক বিশ্বের প্রত্যাশা

১৪ জুন ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৪ জুন ২১ । ০৩:০৮

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং এশিয়া সোসাইটির প্রেসিডেন্ট কেভিন রাড মানবিক আবেদন জানিয়েছেন, ভারতে করোনা দুর্যোগ যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, এ জন্য সবাই যেন ভারতের পাশে দাঁড়ান। শুধু কেভিন রাড কেন, যে কোনো মানবিক মানুষই ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যথিত না হয়ে পারবেন না। আমরা ভারতের প্রতিবেশী, বন্ধু। ভারতে ইতোমধ্যে প্রাণহানি ঘটেছে বিপুলসংখ্যক মানুষের। এখন সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কিছুটা নিম্নমুখী হলেও ভয়াবহতা কাটেনি। ভারত ৯৫টি দেশে ৬ কোটি ৬০ লাখ টিকা পাঠিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। অথচ শেষ পর্যন্ত ভারত নিজেদেরই অবনমন পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই কেভিন রাডের মতো সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত ভারতকে সাহায্য করতে। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ভারতকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাহায্য করা মানবিক দায়িত্ব। যেহেতু করোনা অতিসংক্রামক ব্যাধি, তাই সবারই উচিত এ ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া। বাংলাদেশ টিকা পাওয়ার আশাতেই ভারতকে চুক্তি অনুযায়ী টিকার মূল্য পরিশোধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে যে সংখ্যক টিকা পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যায়নি। চুক্তি অনুযায়ী তারা আমাদের টিকা সরবরাহ করবে- এ বিশ্বাস আমরা হারাতে চাই না।

অতীতে যত মহামারি হয়েছে, শেষ পর্যন্ত টিকা দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আমরা ছোটবেলায় স্কুলে কলেরা এবং বিসিজির টিকা নিয়েছি। তখন তো অনলাইন, অফলাইন ছিল না। স্কুলে টিকার টিম এসেছে, টিকা দিয়ে গেছে। দু-চারজন ছাত্র ভয়ে জানালা দিয়ে পালিয়ে গেছে। এবার যখন করোনা মহামারি ভয়াবহ রূপ নিল, তখন সমন্বিত উদ্যোগে ঘাটতি দেখা গেল! এমন একটা ভাব দেখানো হলো, এটি গণচীনের নিজের ব্যাপার; তাই তারাই বুঝুক। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বললেন, এটা চীন আবিস্কার করেছে। আবার বললেন, দুই সপ্তাহের ভেতর চলে যাবে করোনা। মাস্ক না পরে বাহাদুরি দেখালেন। পরে অবশ্য আক্রান্ত হওয়ার পর মাস্ক পরলেন। এদিকে ভারতে পরিস্থিতি যখন ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল, তখনও দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার ব্যস্ত হয়ে পড়ল কয়েকটি প্রদেশের নির্বাচন নিয়ে। বিজেপি নির্বাচনকেই বড় করে দেখল। আপাতত নির্বাচন স্থগিত রেখে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অধিক মনোযোগ দিলে তা নিশ্চয় ফলপ্রসূ হতো। সর্বদলীয় আলোচনায়, সাংবিধানিক পন্থায় সেই পথ কি বের করা যেত না? এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন যজ্ঞ সম্পন্ন করা ভয়াবহ ঘটনা। কেভিন রাড ভারতের এই ভয়াবহ ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হওয়ার কথা বলেছেন। হ্যাঁ, তা হবে। তবে ইতিহাসে তো বিষয়টি একতরফা লেখা হবে না। ভোটের জন্য ভারতের সবচেয়ে বড় গণজমায়েত কুম্ভমেলা বন্ধ করা হলো না। করোনা দুর্যোগের সময় এমনটিই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল। করোনা যখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন সবার দায়িত্ব পুষ্ট হলে হয়তো অন্যরকম কিছু হতে পারত, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর। আমরা দেখলাম বিশ্বের ফুটবল ও ক্রিকেট বোর্ড দর্শকহীন খেলা আয়োজনে অস্থির হয়ে উঠল। ভাবটা এমন, যেন এটা করোনা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।

প্রথমে বলা হলো, ৫০ বছরের নিচে কারও টিকার দরকার নেই। কিন্তু এখন তো ফ্রান্স, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশে শিশুদেরও টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। গোটা বিশ্বে টিকার জন্য চলছে হাহাকার। আগেই বলেছি, ইতিহাসে দেখা গেছে, টিকা ছাড়া মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আশার কথা, করোনার টিকা খুব দ্রুতই উদ্ভাবন করা সম্ভব হলো। কেভিন রাড এই টিকার ওপর অনেক আগে থেকেই জোর দিয়ে আসছিলেন। পরে সবাই এই পথেই হেঁটেছেন। অনেক আগেই রাড বলেছিলেন, টিকার মেধাস্বত্ব উঠিয়ে দেওয়া উচিত। আমরা বলব, উচিত নয়, মেধাস্বত্ব উঠিয়ে দেওয়া কর্তব্য। ভারতে টিকা উৎপাদনের বড় ওষুধ কারখানা রয়েছে। মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত করে দিলে অতি দ্রুত তারা টিকা তৈরি করতে পারত এবং তা অনেকের কল্যাণেই আসত।

যখন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান সবাই মিলে দক্ষিণ চীন সাগর দখল করার পরিকল্পনা করছিল, সেই সময় এমনটি না ভেবে টিকা তৈরির মেধাস্বত্ব তুলে নেওয়ার ব্যাপারে সবাই অধিক জোর দিলে ও করোনা মোকাবিলায় সমন্বিত প্রয়াস জোরদার করলে আজ টিকা নিয়ে এত সংকট তৈরি হতো না। শোনা যাচ্ছে, বিশ্বের কয়েকটি কোম্পানি প্রচুর টিকা উৎপাদন করে গুদামজাত করেছে। বলছে, আস্তে আস্তে সরবরাহ করবে। অনেকের আশঙ্কা, এর ফলে অনেক টিকার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবে। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অল্প অল্প করে দেওয়া হোক; নইলে অনেক অনুন্নত দেশ টিকা নষ্ট করে ফেলবে। টিকা দেওয়াটা নতুন কিছু নয় যে অনুন্নত দেশ দিতে পারবে না। আমরা টিকা প্রদানে অতীতে আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছি। বাংলাদেশ এবারও টিকা প্রদানে যে দক্ষতা দেখিয়েছে, তা যে কোনো উন্নত দেশকে হার মানিয়েছে। যদিও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু প্রশ্ন আছে, তার পরও এ ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সাফল্য কম নয়।

আগামী ৫ বছর প্রতি বছরে কমপক্ষে ৮০০ কোটি টিকার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ক্র্যাশ প্রোগ্রামে যেতেই হবে। এ জন্য প্রয়োজন গোটা বিশ্বের সমন্বয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু আগেই বিশ্বের কাছে এমন আবেদন জানিয়েছেন। চার্টার অনুযায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দায়িত্ব এ পরিস্থিতিতে আরও সুদৃঢ় নেতৃত্ব দেওয়া। কেভিন রাড যেসব প্রস্তাব রেখেছেন, এর সবই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও বিশ্বব্যাপী দ্রুত টিকা প্রদানের জন্য শক্তিশালী সংস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন এবং তাতে তিনিও ভূমিকা রাখবেন- এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। তা হলো অক্সিজেন সংকট মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে। অক্সিজেন ব্যবস্থা উন্নত বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এ সংকট দূর করার দায়িত্ব তারা এড়াতে পারে না। পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের স্থির করতে হবে- টিকা আগে, না বারুদ আগে। করোনা দুর্যোগকালেও আমরা তো দেখলাম ফিলিস্তিনের অসহায় অবস্থা। উপর্যুপরি বিমান হামলায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হলো। চলমান মহামারিকালেও টিকার ভ্যান আটকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে ফিলিস্তিনিরা টিকা নিতে না পারে। রাড ভারতের কোনো কোনো স্থানে নানা কুসংস্কারের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে অবৈজ্ঞানিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

গোটা বিশ্ব করোনামুক্তকরণে সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও জোরালো হোক। আমাদের শিশুরাও ঘরে আবদ্ধ। শিশু তো বটেই, বিশ্বের অসংখ্য মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যেরও হানি ঘটিয়েছে করোনা। করোনার নানামুখী অভিঘাত বিশ্বকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। এর মধ্যেও বিশ্বের পরাক্রমশালী কোনো কোনো রাষ্ট্র নেতিবাচকতা থেকে সরে আসেনি। কতভাবেই না ঘটছে মানবিক বিপর্যয়! এই বিপর্যয় ঠেকাতে খুব জরুরি শুভবুদ্ধির উদয়। দু-একজন বিশ্বনেতার প্রচেষ্টায় কি বিশ্বব্যাপী এত বড় দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার পথ মসৃণ করা সম্ভব? জরুরি সবার সমন্বিত মানবিক প্রচেষ্টা। বিশ্বের কোনো কোনো ধনবান দেশের কাছে যথেষ্ট টিকা মজুদ থাকা সত্ত্বেও অধিক আক্রান্ত দেশগুলো এর সুফল পাচ্ছে না। টিকা নিয়ে বাণিজ্যের চিন্তাও অনেকের মাথায় আছে। চলমান মহামারিতে এমনটি কাম্য নয়। আমরা সবার মানবিক উদ্যোগ চাই।

সাবেক সরকারি ও মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com