ঢাকা ওয়াসা

'বহুমূল্য' ব্যবস্থাপনা পরিচালক বটে!

২১ জুন ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২১ জুন ২১ । ০২:৩৫

সম্পাদকীয়

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তথা এমডি তাকসিম এ খানের বেতন-ভাতার যে চিত্র রোববার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। গত বছর সমকালেই একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- অভিযোগের স্তূপ, তবুও তিনি ১১ বছর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যার আবেদন করার যোগ্যতাই ছিল না, তিনি নিয়োগ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অনেকবার সংবাদ শিরোনাম হলেও তাকে সরানো যায়নি! এই এমডির কারণেই 'ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা' প্রকল্প কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তার ব্যাপারে ওয়াসার নিয়ন্ত্রক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সমকালকেই গত বছর বলেছিলেন, 'ওয়াসার অনেক বিষয়েই অসংগতি আছে। তিনি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) কীভাবে বারবার নিয়োগ পেয়েছেন তা বলা মুশকিল।' ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কীভাবে, কোন শক্তিবলে, কার বা কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তার মাসিক বেতন ১১ বছরে তিন দফায় সর্বসাকল্যে এক লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ছয় লাখ ২৫ হাজার টাকা করতে পারলেন- এই প্রশ্নটি শুধু বিস্ময়করই নয়, একই সঙ্গে নিয়মনীতির বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে।

একজন কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী প্রতি মাসে কী করে উৎসব ভাতা, বিশেষ ভাতা কিংবা বৈশাখী ভাতা পান, তা বোধগম্য নয়। ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী গোলাম মোস্তাফা সমকালকে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা শুধু খোঁড়া যুক্তিই নয়, হাস্যকরও বটে। ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নতুন কোনো এমডি 'যোগ্য' তাকসিম এ খানের মতো বেতনভোগী হবেন না। ব্যাংক খাতসহ কোনো সেবা সংস্থার এমডিরই এত বেশি বেতন-ভাতা কিংবা সুবিধা ভোগের নজির নেই। বেতন-ভাতার বাইরেও তিনি যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন তাও নজিরবিহীন। ওয়াসার এমডির পেছনে অবিশ্বাস্য ও অযৌক্তিক এত বিপুল 'খরচ'-এর কারণটা কী? ঢাকা ওয়াসার সেবা নিয়ে রয়েছে অন্তহীন প্রশ্ন। ওয়াসায় বিগত ১১ বছরে অনেকের অদলবদল ঘটলেও কোন জাদুবলে ওয়াসার এমডির বেতন-ভাতা দফায় দফায় বৃদ্ধি পেল, তা জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। আমরা জানি, ওয়াসা একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।

সরকারি নিয়ম মেনেই এ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে কাউকে নিয়োগ দিতে হয়। কিন্তু তাকসিম এ খানের ক্ষেত্রে সব নিয়মকানুনেরই ব্যত্যয় ঘটেছে। আমরা এও জানি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের তরফে ঢাকা ওয়াসার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সেবা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এমডিসহ সব ধরনের চুক্তিভিত্তিক পদে নিয়োগে নিয়মনীতি ও আইনের যথাযথ অনুসরণ ও স্বচ্ছতার দাবি জানানো হলেও এসব আমলে নেওয়া হয়নি। তাকসিম এ খানের প্রতি 'অতি আনুকূল্য' ও দফায় দফায় এত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ফলে সংস্থাটিতে কর্মরতদের মধ্যে সংগত কারণেই দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ।

ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে এই এমডির আমলে ১০০ কোটি টাকার ওপরে খরচ হলেও এর ফল কী, নগরবাসীর তিক্ত অভিজ্ঞতায়ই এর উত্তর নিহিত। অবকাঠামো উন্নয়ন, সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা ও জনসেবার নামে ওয়াসার শত শত কোটি টাকার 'উন্নয়নযজ্ঞের' সুফলও নগরবাসী পাননি। ওয়াসার অন্যতম যে দায়িত্ব সুপেয় পানি সরবরাহ করা, তাও সংস্থাটি করতে পারেনি। এ এমডিই বলেছিলেন, ওয়াসার প্রতিটি পানির ফোঁটা বিশুদ্ধ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনক্ষোভের মুখে তিনি তার অবস্থান থেকে পিছু হটেন। সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নূ্যনতম স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী হলে কী করে একজন ব্যর্থ ব্যক্তিকে এত গুরুত্বপূর্ণ পদে বারবার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে- আমরা তা জানতে চাই।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com