মানি লন্ডারিং মামলা

সুশাসনের স্বার্থেই নিষ্পত্তি করুন

২২ জুন ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২২ জুন ২১ । ০২:০৬

সম্পাদকীয়

অর্থ পাচার বা অঘোষিত ও অবৈধ লেনদেন তথা 'মানি লন্ডারিং' প্রতিরোধে পৃথক আইন প্রণীত হওয়ার পরও দেশের বিভিন্ন আদালতে এ সংক্রান্ত মামলাগুলো 'ঝুলে' রয়েছে কেন, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা দেখছি, স্বাধীনতার পর থেকেই অর্থ পাচার বা অঘেষিত লেনদেন নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা চলেছে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও কম ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন বলা হয়েছে যে, প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামোর অভাবেই মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিলম্বে হলেও ২০১২ সালে 'মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন' প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু সোমবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে- এই আইনের আওতায় দায়ের করা আলোচিত মামলাগুলোই বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। অনালোচিত মামলাগুলোর কথা বলাই বাহুল্য। এসব মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তেও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- গত আট বছরে এভাবে দেশের বিভিন্ন আদালতে জমে আছে চার শতাধিক মামলা। এই চিত্র আমাদের অবশ্য বিস্মিত করে না। কারণ আমরা জানি, এসব মামলায় অভিযুক্তদের বৃহদংশই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।

এসব রাঘববোয়ালকে আইনের জালে ধরাই যেখানে কঠিন কাজ; বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনাও সহজ হতে পারে না। যেসব কারণে প্রভাবশালী বিভিন্নজনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অনুসন্ধান গতি হারায়; যে কারণে অনেক সময় অভিযোগ গঠনেও ফাঁক-ফোকর থেকে যায়; এ কারণে শুনানির পর শুনানি চলতে থাকে; এখানেও সেসব 'ধ্রুপদি' কারণ থাকতেই পারে। বস্তুত সমকালের প্রতিবেদকের কাছেই এসব মামলা সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন- আইনি জটিলতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে আসামিপক্ষের সময়ক্ষেপণ, সমন্বয়ের অভাব এবং উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ থাকায় বিচারিক আদালতে মামলার বিচার কার্যক্রম যথাসময়ে শুরু ও নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে কতদিন চলবে? আমরা জানি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে যে ২৯টি বিশেষ আদালত রয়েছে, সেখানেই সপ্তাহের এক দিন এসব মামলার বিচার কার্যক্রম চলে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সেগুলোর কার্যক্রমও বন্ধ।

আমাদের প্রশ্ন, এই পরিস্থিতিতে অন্যান্য আদালতের কার্যক্রম যেভাবে চলছে, একইভাবে বিশেষ আদালতগুলোর কার্যক্রম চলতে পারে না? আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হতে পারে। বিশেষত উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে যেসব মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে, সেগুলো নিয়েও ভাবতে হবে। অভিযুক্তের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু এ ধরনের মামলার কার্যক্রম বছরের পর বছর স্থগিত থাকতে পারে না। এতে করে একদিকে যেমন মামলা গতি হারায়, অন্যদিকে প্রমাণ, সাক্ষ্য ফিকে হয়ে যেতে থাকে। আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তার বদলি, অপসারণ, অবসর এমনকি স্থায়ী অনুপস্থিতিও জটিলতাই বাড়াতে থাকে কেবল। আর অভিযুক্তদের বহুলাংশই প্রভাবশালী হওয়ায় এক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা বাড়তেই থাকে।

মনে রাখতে হবে, এ ধরনের অপরাধ নিছক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নয়; বরং রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এর প্রতিকার যত দ্রুত হবে, সুশাসনের সম্ভাবনা তত উজ্জ্বল হবে। আর তার সুফল ভোগ করবে সর্বস্তরের নাগরিক। একই সঙ্গে সম্ভাব্য অপরাধীরাও মানি লন্ডারিংয়ের চিন্তা ও তৎপরতা থেকে সরে আসবে আশা করা যায়। এসব মামলায় অভিযুক্তদের 'ধর্মের কাহিনি' শোনানোও জরুরি। তাদের বলতে হবে- অপকর্ম কখনও চাপা থাকে না। গত কয়েক বছর ধরেই পানামা পেপারস বা প্যারাডাইস পেপারসের মতো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়ে চলছে। বস্তুত এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি আর্থিক অনিয়ম কখনও না কখনও কোথাও না কোথাও গিয়ে ফাঁস হয়ই। এত সাধের 'বেগমপাড়া' এখন অনেকের ভাবমূর্তির সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালীদের 'মাথার ঘাম পায়ে ফেলে' পাচার করা অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় 'ফ্রিজ' হয়ে থাকার নজিরও কম নেই। ভুলে যাওয়া চলবে না, গোটা বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা ক্রমেই ডিজিটালাইজ হয়ে চলায় ফাঁকির সুযোগও ক্রমে কমে আসছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com