জামানতের ২৮ গুণ ঋণ!

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিভাগের অনাপত্তি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে অন্য বিভাগ

প্রকাশ: ০১ জুন ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০১ জুন ২১ । ০১:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

ওবায়দুল্লাহ রনি

অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে রপ্তানি সব পর্যায়ে জালিয়াতি হয়েছে। রপ্তানি না করেই রপ্তানি দেখানোয় মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকে প্রতিবেদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ। ২০১৯ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে কারখানা। জামানতের ২৮ গুণ ঋণ থাকায় তা আদায় নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। এরপরও বিশেষ সুবিধায় এই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির এ সিদ্ধান্তে অনাপত্তিও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের পর্যবেক্ষণে সম্প্রতি পুনঃতফসিল সুবিধা বাতিল করতে বলা হয়েছে। যদিও ব্যাংক তা কার্যকর করেনি। জনতা ব্যাংকের কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ শাখার স্বল্প পরিচিত গ্রাহক সিংকি গার্মেন্টের ক্ষেত্রে ঘটেছে এমন ঘটনা।

প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. ইকরাম উল্লাহ নামের একজন ব্যবসায়ী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সিংকি গার্মেন্ট রপ্তানি না করেই রপ্তানি দেখিয়ে বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছে। বিল অব লেডিং, বিল অব এক্সপোর্ট বা কাস্টম সার্টিফায়েড ইএক্সপির মতো ডকুমেন্ট না থাকার পরও তাদের রপ্তানি বিল কেনে জনতা ব্যাংক। ভুয়া ডকুমেন্টের ভিত্তিতে রপ্তানি

বিল কেনা হয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০১৭ সালের এক পরিদর্শনে উঠে আসে। এ তথ্য উদ্ঘাটনের পর তখন জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদনে প্রতিষ্ঠানটির নামে ৬০ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ঋণ সৃষ্টি করা হয়। সুদসহ যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বন্ধক আছে মাত্র ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদ। এর মানে বন্ধকি সম্পত্তির ২৮ গুণের বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। অথচ বিদ্যমান ব্যবস্থায় জামানত থাকা সম্পত্তির তুলনায় কম ঋণ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

ব্যাংকগুলো নিজস্ব ঋণ নীতিমালার আলোকে বন্ধকি সম্পত্তির বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বিধান নেই। জনতা ব্যাংকের ক্রেডিট ম্যানুয়াল অনুযায়ী, একশ টাকা ঋণের জন্য দেড়শ টাকা মূল্যমানের সম্পত্তি বন্ধকের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, নন-ফান্ডেড থেকে ফান্ডেড হওয়া ঋণে বা সমপরিমাণ একশ' টাকা ঋণের বিপরীতে একশ টাকা বন্ধকি সম্পত্তি নিতে হবে। ব্যাংকের এই নীতিমালা অনুসরণ না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠালে সেখানে বিস্তারিত তথ্য দিতে হয়। বিশেষ করে ওই ঋণে কোনো জালিয়াতি হয়েছে কিনা, আদালত, দুদক বা অন্য কোনো সংস্থার পর্যবেক্ষণ রয়েছে কিনা- এসব থাকতে হয়। তবে জনতা ব্যাংক এক্ষেত্রে তথ্য গোপন করেছে। ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ঋণটি পুনঃতফসিলে অনাপত্তি দেওয়া হয়। এখন পুনঃতফসিল সুবিধা বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া তথ্য গোপনের জন্য ব্যাংকের সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের পর্যক্ষেণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সাল থেকে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ না থাকায় সিংকি গার্মেন্টের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা কম। বিএফআইইউর তদন্তে মানি লন্ডারিংসহ নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসায় ২০১৯ সালের জুনে সিংকি গার্মেন্টের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়। দুদক বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছে কিনা নিশ্চিত না হয়েই গত বছরের ২৯ নভেম্বর ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে এই ঋণ পুনঃতফসিলে অনাপত্তি দেওয়া হয়। এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ পাওনা পরিশোধে ছয় বছর সময় দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গত ১৪ ডিসেম্বর জাল-জালিয়াতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অনাপত্তি প্রত্যাহারে বিআরপিডিকে পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ পুনঃতফসিলে অনাপত্তি দেওয়ায় ভবিষ্যতে এর দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। একই সঙ্গে জনতা ব্যাংককে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেওয়ার বিষয় উদ্ঘাটিত হয়েছে। ফলে বিআরপিডির ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। সমুদয় ঋণ আদায় করতে হবে। এ বিষয়ে সমকালের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনও এ নির্দেশনা পরিপালন করেনি জনতা ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি থেকেও এ বিষয়ে কিছু আর বলা হয়নি।

জানতে চাইলে সিংকি গার্মেন্টের মালিক মো. ইকরাম উল্লাহ সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে কিছু অনিয়ম ধরা পড়ার পর থেকে তার কারখানা বন্ধ আছে। বিভিন্ন চেষ্টার পর ঋণ পুনঃতফসিলের পর কারখানা চালুর প্রস্তুতি নিয়েছেন। তিনি জানান, শুরুতে তার ঋণ ছিল নন-ফান্ডেড। পরে তা ফান্ডেড হওয়ায় জামানতের পরিমাণ কম দেখাচ্ছে। তার মতে, তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা সাধারণত এমন কম জামানতেই ঋণ নেন। তিনি বলেন, পুনঃতফসিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিভাগের অনাপত্তি আরেক বিভাগ বাতিল করেছে, তেমন নয়। বরং কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। তিনি স্বীকার করেন, তার ঋণে অনিয়ম হয়েছে। কিছু পণ্য স্টকলট হয়ে যাওয়ায় অনিয়ম হয়েছিল।

সূত্র জানায়, ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য পরিচালনা পর্ষদের কাছেও কিছু তথ্য গোপন করে জনতার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। পরিচালনা পর্ষদের ৬৩৭তম সভায় যে স্মারক উত্থাপন করা হয়, সেখানে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উত্থাপিত জালিয়াতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অপরাধের বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য দুদকে তথ্য পাঠানোর বিষয়টিও জানানো হয়নি।

জনতা ব্যাংকের কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক আশরাফুল আলম এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা জানান। তবে প্রধান কার্যালয়ের ফরেন ট্রেড বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তি নিয়ে ঋণটি পুনঃতফসিলের পর এখন নিয়মিত হয়েছে। তবে বকেয়া ঋণের সাড়ে ৭ শতাংশ কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট দেওয়ার শর্ত থাকলেও ইকরাম উল্লাহ তা দেননি। ফলে তিনি এলসিসহ কোনো ধরনের ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন না। সার্বিক বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আরজেএসসিতে ২০১০ সালে নিবন্ধিত মেসার্স সিংকি গার্মেন্টের পরিশোধিত মূলধন ৫০ লাখ টাকা। এর ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা দেখানো হয়েছে ইকরাম উল্লাহর। বাকি ৪৯ শতাংশ নেদারল্যান্ডসের বোগারার্ডস ইন্টারন্যাশনাল বি.ভি-এর প্রতিনিধি রোনাল্ড বোগারার্ডসকে দেখানো হয়। এই দুই নাম ব্যবহার করে যৌথ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। তবে হিসাব খোলার ফরমে স্বাক্ষর রয়েছে শুধু ইকরাম উল্লাহর। আবার বিদেশি বিনিয়োগকারীর নামে অ্যাকাউন্টের জন্য বিনিয়োগ বোর্ড থেকে অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি। ফলে পুরো বিনিয়োগ ইকরাম উল্লাহর একার হলেও তিনি বিদেশি বিনিয়োগ দেখিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক সময়ের সেরা জনতা এখন জালিয়াতিতে ব্যাপক আলোচিত। ক্রিসেন্ট, অ্যাননটেক্স, বিসমিল্লাহসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির ঋণ ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংকটি। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা বা ২৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা।

সার্বিক বিষয়ে উল্লেখ করে মতামত জানতে চাইলে বেসরকারি খাতের এনসিসি ও মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন সমকালকে বলেন, জামানতের তুলনায় এত বেশি ঋণ দেওয়া অস্বাভাবিক। প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা কোনো পরিচালকের চাপ কিংবা কোনো কিছুর বিনিময়ে এমন সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এটা ব্যাংকিং অনুশীলনের চরম পরিপন্থি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে হয়তো আগে ব্যাপক অনিয়ম থাকার পরও বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল সুবিধায় অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে অবশ্যই সুবিধা বাতিল করা উচিত। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুই বিভাগের দুই নীতি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি ভুল বার্তা যায়। ফলে যে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে অবশ্যই ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com