এসএসসি-এইচএসসি নাও হতে পারে

পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও বিকল্প ভাবছে সরকার * অনিশ্চিত জেএসসি-জেডিসিও * উৎকণ্ঠায় ৪৪ লাখ পরীক্ষার্থী

প্রকাশ: ১৫ জুন ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২১ । ০২:৫৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বির নেওয়াজ

ফাইল ছবি

একদিকে চলতি বছরের (২০২১ সালের) মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়ার সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে পরীক্ষার বিকল্প পথও অনুসন্ধান করছেন সংশ্নিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধই থাকবে। তাই জুলাইয়ের মধ্যে স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া সম্ভব না হলে এ বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের সব পরীক্ষা বাতিল করা হবে। তবে পরীক্ষার্থীদের অটোপাস দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সিলেবাসের ওপরে দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট, বাড়ির কাজ ও ব্যবহারিক কাজের ভিত্তিতে ২০২১ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি ভালো না হলে এ দুটি পরীক্ষা বাতিল করে সরকারের বিকল্প চিন্তার বিষয়ে এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীও ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, 'এক বছর পরীক্ষা না দিলে বিরাট ক্ষতি হবে না শিক্ষার্থীদের। আগে শিক্ষার্থীদের সুস্থ থাকতে হবে। ২০২১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বলব, বিভ্রান্ত হবে না, ভুল পথে যাবে না। নিজেরা বাড়িতে সুস্থ থাকতে কাজ করো। ভয়ের কারণ নেই। পরীক্ষা হবে কি হবে না, সেটি পরের কথা। আগে সুস্থ থাকো।'

শিক্ষার্থীদের বাড়িতে স্বাভাবিক পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, 'পরীক্ষা নিতে পারব কি পারব না, না নিলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, সে সবকিছু নিয়েই আমাদের চিন্তাভাবনা রয়েছে। অনলাইন ও অ্যাসাইনমেন্ট যা হচ্ছে, তার বাইরে যেটুকু সম্ভব, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাড়িতে চালিয়ে যাক। তাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যাতে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। করোনাভাইরাসের কারণে তো সারাবিশ্বেই শিক্ষার ক্ষতি হচ্ছে।'

করোনার কারণে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে গত দেড় বছর ধরে। সর্বশেষ আরেক দফা ছুটি বাড়িয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ২০২১ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। যদিও শিক্ষা বোর্ডগুলোর উদ্যোগে এসএসসির প্রশ্নপত্র ছাপা হয়ে গেছে। এইচএসসির প্রশ্নপত্র মডারেশনের কাজ চলছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে নীতিনির্ধারকরা মনে করেছিলেন, মে-জুন মাসের মধ্যে করোনার সংক্রমণ কমে যাবে এবং স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ৬০ দিন ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ৮৪ দিন ক্লাস করিয়ে এ দুটি পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া যাবে। এ জন্য পৃথক দুটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাসও প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে চলে গেছে শিক্ষাবর্ষের ছয় মাস। জুলাই মাসের মধ্যেও স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া সম্ভব না হলে এসএসসি ও এইচএসসির ৬০ ও ৮৪ কর্ম দিবস ক্লাস নিয়ে, ১৫ দিন অতিরিক্ত সময় দিয়ে চলতি বছরের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করা আর সম্ভব হবে না। সরকার তাই পরীক্ষার বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে ভাবছে। তবে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

অবশ্য মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সূত্র জানায়, সম্ভব হলে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবেন। এরপরও পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলে বিকল্প পরিকল্পনার দিকে যাবেন। তবে পরীক্ষার এই টানপোড়েনে চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে এসএসসি ও এইচএসসির প্রায় ৪৪ লাখ পরীক্ষার্থী।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহা. মোকবুল হোসেন সমকালকে বলেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আমরা নিয়ে রাখছি। তবে সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে সেভাবেই পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত খোলা না গেলে বিকল্প ভাবনা তো ভাবতেই হবে।

একই অভিমত জানিয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রমা বিজয় সরকার বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই পরীক্ষার কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠান খোলা না গেলে কেমন করে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব? তিনি বলেন, সবকিছুই করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা না গেলে বিকল্প চিন্তা হিসেবে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়ন করার কথাও ভাবা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখেছে তার মূল্যায়নের ভিত্তিতে গ্রেড দেওয়া যাবে।

এরই মধ্যে এ বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সংক্ষিপ্ত সিলেবাস থেকে ছাত্রছাত্রীদের জন্য অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে 'জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড'কে (এনসিটিবি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অ্যাসাইনমেন্টগুলো তৈরি ও চূড়ান্ত হলে মাউশি তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণের জন্য বিদ্যালয়ে পাঠাবে।

এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের আলোকে এনসিটিবিকে এখন অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। ক্লাসে পড়িয়ে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়ন করে গ্রেড দেওয়া হবে।

একাধিক বিকল্প চিন্তা :শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ডিসেম্বরে পরীক্ষা নিতে হলে শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েক মাস আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে গুরুত্বপূর্ণ চার-পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার বিকল্প চিন্তা আছে। তবে কোনোভাবেই পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলে অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক মূল্যায়ন হতে পারে। ইতোমধ্যে ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া শুরু হয়েছে। একইভাবে চলতি বছরের এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদেরও অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। এটা অনেকটা 'ওপেন বুক এক্সাম' সিস্টেমের মতো। তবে এই দুই পাবলিক পরীক্ষায় অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হলে এর সঙ্গে আগের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার নম্বর যুক্ত করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এসএসসিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং এইচএসসিতে জেএসসি ও এসএসসির নম্বরও যুক্ত হতে পারে।

সবশেষ বিকল্প হচ্ছে আগের পরীক্ষাগুলোর ভিত্তিতে মূল্যায়ন। কিন্তু গত বছর জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ভিত্তিতে এইচএসসি পরীক্ষার মূল্যায়ন করা হলেও তা ছিল অনেকটাই 'অটোপাসের' মতো। কিন্তু কোনোভাবেই এই সর্বশেষ বিকল্পে যেতে চায় না শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, 'এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত রয়েছে, পরীক্ষা নেওয়া হবে। অন্তত আমরা ডিসেম্বর পর্যন্ত দেখতে চাই। এর মধ্যে সম্ভব না হলে বিকল্প ভাবতে হবে। তবে অটোপাস শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। কোনোভাবেই সেদিকে যেতে চাই না। আর অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়াও এ দেশের প্রেক্ষাপটে কঠিন।'

অনিশ্চিত জেএসসি, জেডিসিও : এদিকে, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষাও। এ ক্ষেত্রে এ বছরও জেএসসিতে শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেওয়া হতে পারে। যদিও বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুস বলেন, আমরা অটোপাস দিতে চাই না। পরীক্ষা না হলে অন্তত অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমেই তাদের মেধার মূল্যায়ন করতে চাই। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com