সমকালীন প্রসঙ্গ

নারীর মর্যাদা রক্ষায় রুখে দাঁড়ান

প্রকাশ: ১৭ জুন ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেলিনা হোসেন

নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক চিত্র যখন আমাদের অধিকতর উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বিস্মিত না করে পারে না। রাষ্ট্রীয় নীতিতে যদি নারীর প্রতি বৈষম্যের বিষয়টি দায়িত্বশীলদের তরফে পুষ্ট করার নজির সৃষ্টি হয়, তাহলে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবি-অঙ্গীকার সংগতই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিকল্প ব্যবস্থা করার। তারা এ ব্যাপারে সুপারিশ পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ের কাছে। এমন সুপারিশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই তো স্বাভাবিক। সংসদ সদস্যরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ পাঠালেন কী করে? তারা ধর্মীয় নিয়ম আর রাষ্ট্রীয় নিয়মের সমদৃষ্টিভঙ্গিরইবা প্রকাশ ঘটালেন কী করে? প্রশ্ন হচ্ছে, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার লিঙ্গ পরিচয় বড় না তার পদের পরিচয় বড়? মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় কমিটির দায়িত্বশীলরা যে সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছেন, তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের বিপরীত। আওয়ামী লীগের নীতির সঙ্গেও এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান এবং স্বাধীনতা-উত্তর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এরই পরিপ্রেক্ষিতে নারীকে মর্যাদা দানের বিষয়টি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। তা কি করে ভুলে গেলেন জাতীয় সংসদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্যরা?

এমন সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ যখন সচেতন জনগোষ্ঠীর মনে আঘাত করেছে, তখনই আরও একটি বিষয় আমাদের ক্ষুব্ধ না করে পারেনি। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পরীমণি তাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ উত্থাপন করে তার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া স্ট্যাটাসে বলেছেন, 'আমি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাকে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এর বিচার চাই। পুলিশে জানিয়েও ফল পাইনি। এই বিচার কই চাইব আমি? কোথায় চাইব? কে করবে এর সঠিক বিচার?' একজন নারীর এমন অভিযোগ ও প্রশ্ন শুধু সভ্যতার সংকটই তুলে ধরেনি, সমান্তরালে প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- এত ত্যাগে অর্জিত রক্তস্নাত প্রিয় বাংলাদেশে নারীর প্রতি অবমাননা-সহিংসতা আর কত আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে। পরীমণি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'মা' সম্বোধন করে প্রতিকার চেয়ে তার সহায়তাও চেয়েছেন। পরীমণিকে নিরূপায়-অসহায় হয়ে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কাছে সরাসরি তার অবমাননা-নিরাপত্তাহীনতার বিচার চাইতে হলো কেন? জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব যাদের তারা কেন তার অভিযোগ তাৎক্ষণিক আমলে নিলেন না? কেন থানা-পুলিশ একজন নির্যাতিতার অভিযোগ আমলে নিয়ে আইনানুগ প্রতিকারে নিষ্ঠ হয়নি? কেন ছয় দিন পর মামলা নিল পুলিশ?

এ রকম অনেক প্রশ্নই আছে। আছে অনেক জিজ্ঞাসাও। তার পরও ক্ষোভ কিছুটা প্রশমন করতে আমরা পেরেছি পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার মূল অভিযুক্তসহ তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করায়। ডিবি পুলিশ ওই পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি নানারকম মাদকদ্রব্যও তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে। পরীমণিকে চক্রান্ত করে ফাঁদে ফেলার মূল অভিযুক্ত নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমির দুস্কর্মের উৎস খুঁজতে গভীর থেকে গভীরে যেতে হবে। পরীমণির ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের এমনকি তার প্রাণনাশের হুমকি স্পষ্টতই ফের প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- বহুমাত্রিক নারী নির্যাতনের বীভৎসতার ঘটনা কি ঘটতেই থাকবে? ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের ঘটনা শুধু সমাজের গাঢ় অন্ধকারই সামনে টেনে আনছে না, বৃহত্তর নাগরিক সমাজকে আরও নানা মাত্রিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ফেলেছে। নারী নির্যাতনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি আইনের কথা বলি, তাহলে একদিকে যেমন বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির প্রসঙ্গ আসবে, অন্যদিকে আসবে বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও দায়িত্বশীলদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে নানারকম ত্রুটি, অসংগতি ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়গুলোও।

আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, হচ্ছে। অনস্বীকার্য, এ ক্ষেত্রে অগ্রগতির দৃষ্টান্তও আছে। কিন্তু তাতে কি নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির তেমন কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়? মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ এ ক্ষেত্রে অতি সাম্প্রতিক একটা দৃষ্টান্ত। কন্যাশিশু, কিশোরী, যুবতী, বিবাহিতা, অবিবাহিতা এমনকি বৃদ্ধাও নানামুখী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন- এমন অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়। পরিবার, শিক্ষাঙ্গন, কর্মস্থল, গণপরিবহন প্রায় সর্বত্রই নির্যাতনের ঘটনাগুলো কী বার্তা দেয়? নারী-শিশু নির্যাতন-নিপীড়ন রোধে এত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধের রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায়ও যান না। আবার কেউ কেউ থানায় গেলেও অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় না। পরীমণি এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্ত।

এসব কারণে নির্যাতন-নিপীড়কদের আশকারা পেয়ে বেড়ে ওঠার পথ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিকার চেয়ে উল্টো হেনস্তার অভিযোগও কম নেই। নাগরিকদের অধিকার, নিরাপত্তাসহ অন্য সবকিছু দেখারই আলাদা আলাদা বিভাগ রয়েছে। সেই বিভাগগুলোর দায়িত্বশীলরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ হলে নাগরিকদের নিরাপত্তা-অধিকার নিশ্চিত না হওয়ার কথা নয়। তাহলে পরীমণিকেও প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়ে তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে হতো না। বিভিন্নভাবে নারীর প্রতি সহিংসতায়ও রীতিমতো উস্কানি দেওয়া হয়, এমন নজিরও বিরল না। সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে পাচারকৃত নারীর বক্তব্যের সূত্র ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা 'টিকটক' তৈরির যে অন্ধকার জগতের সন্ধান পেয়েছেন, তাতেও প্রতীয়মান হয়, ক্ষত কত গভীরে পৌঁছে গেছে। এ রকম দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে আরও অনেক। সমাজে বিরাজমান এই আঁধার কাটাতে শুধু যে আইনি ব্যবস্থায়ই সুরাহা মিলবে তাও নয়। এ জন্য সামাজিক সব শক্তির পুনর্জাগরণও সমভাবেই জরুরি।

নারীর প্রতি সহিংসতার অন্যতম মূল কারণ বৈষম্য ও অবজ্ঞামূলক পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব। পরীমণির যে সামাজিক অবস্থান সেই জায়গা থেকে এমনদেরই যদি এভাবে নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তাহলে অন্যদের কী হবে? যে আচরণের মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। বরং বলা যায়, আমাদের সমাজের স্থায়ী ব্যাধিরই এটি একটি উৎকট রূপ। আমাদের সমাজের একাংশের দৃষ্টিভঙ্গির যদি পরিবর্তন করা না যায়, তাহলে এমন জঘন্য ঘটনার বিস্তার ঘটতেই থাকবে। দেশের দুর্বল ফৌজদারি ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থায় যে নারী ও শিশুরা রয়েছে, এই চিত্র ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে বহুবার উঠে এসেছে। নির্যাতিতাকে হেনস্তা তো নয়ই, বরং কীভাবে তিনি দ্রুত সুবিচার পান এ বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধাকরদের গভীর মনোযোগ জরুরি।

নারী নির্যাতন রোধে আমাদের আইন অনেক শক্তিশালী। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আইনের প্রায়োগিক দিক কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রতিফলিত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই এর কোনো সুফল মিলছে না। আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্যাতক-নিপীড়কদের দ্রুত বিচার আইনে সাজা প্রদান, লিঙ্গ বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার মানবাধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে। শুভবোধসম্পন্ন সবার মুষ্টিবদ্ধ হাত একত্র করে রুখে দাঁড়াতে হবে। মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী হতেই হবে।

কথাসাহিত্যিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com