ধর্ম

ইসলামের ঐতিহাসিকতা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ইসলাম অকস্মাৎ আবির্ভূত কোনো দ্বীন-ধর্ম নয়। পৃথিবীতে আবির্ভূত সব নবী-রাসুলই ইতিহাসের ক্রমধারায় ইসলামের সত্যায়নকারী ছিলেন। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী ও রাসুল বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.)-এর সময় এসে ইসলামের সর্বময় রূপ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাই ইতিহাসের পরম্পরায় মহান স্রষ্টা প্রেরিত সব নবী-রাসুল ছিলেন ইসলামেরই ফরমাবরদার। সমকালীন সমাজ, গোত্র ও ষড়যন্ত্রকারীদের সব নির্যাতন ও অবিচার থেকে নবী-রাসুলদের স্বয়ং আল্লাহই সুরক্ষা দিয়েছেন। ভয়াবহ বিপদাপদ, বালা-মুসিবত ও জটিল পরীক্ষাগুলোর মধ্যেও নবী-রাসুলদের আল্লাহপাক স্বীয় ক্ষমতাবলে হেফাজত করে পরবর্তীদের জন্য নজির রেখে দিয়েছেন।

মহান আল্লাহর ঘোষণা 'ইন্নি জায়িলুন ফিল আরদি খালিফাহ্‌' অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করব। এর বাস্তব ফলশ্রুতি হচ্ছে হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও রাসুল হিসেবে তাঁর আবির্ভাব। ফেরেশতাকুলের ভিন্নমত সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালা আদম (আ.)-এর সৃষ্টিকর্মে অনড় ও দৃঢ়পদ ছিলেন; কেননা 'ইন্নি আ'লামু মালা তা'লামুন' অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা জান না। মহান আল্লাহ মানব সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত এবং পৃথিবীতে তাঁর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্যেই এই মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য নিহিত। তাই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেই তিনি যাবতীয় জ্ঞানভাণ্ডার তাঁকে দান করলেন। পরবর্তী সময়ে আল্লাহর নির্দেশ 'ওয়ালা তাকরাবা হাযিহিশ্‌ শাজারাতা ফাতাকুনা মিনাজ জালেমিন' অর্থাৎ আর এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, অন্যথায় জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে- এর ফরমাবরদারি করতে না পারায় আদম (আ.) সাময়িক মুসিবতে নিপতিত হন এবং জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। সুদীর্ঘ অনুশোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহই হজরত আদম (আ.)কে সুরক্ষা দান করেন। পবিত্র কোরআনে বিষয়টি এভাবে এসেছে- 'অতঃপর আদম (আ.) স্বীয় পালনকর্তার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নিলেন, তারপর আল্লাহপাক তাঁর প্রতি করুণাভরে লক্ষ্য করলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।'

হজরত আদম (আ.)-এর পরে আগমনকারী বিখ্যাত নবী হলেন হজরত নুহ (আ.)। আল্লাহপাক নবী নুহ (আ.)কে প্রেরণের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন- 'আমি নুহকে প্রেরণ করেছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি এ কথা বলে যে, তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক কর, তাদের প্রতি মর্মন্তুদ শাস্তি আসার আগে।' হজরত নুহ (আ.) নিজেও তাঁর পরিচয় দিলেন এভাবে- 'হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট সতর্ককারী এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।' কিন্তু নুহ (আ.)-এর জাতি তাঁর কোনো সতর্কবার্তায় কান দেয়নি; বরং নানাভাবে তাঁকে আরও অপদস্ত ও পর্যুদস্ত করতে চেয়েছে। হজরত নুহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়ের লাগামহীম পাপাচার ও ঔদ্ধত্যের কারণে মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানালেন- 'হে আমার পালনকর্তা! আপনি পৃথিবীতে কোনো কাফের গৃহবাসীকে রেহাই দেবেন না।' অবশেষে আল্লাহর গজব হয়ে মানবেতিহাসের ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী বন্যার আবির্ভাব ঘটল; যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে শুধু হজরত নুহ (আ.) এবং তাঁর অনুসারীরাই নিরাপদ থাকলেন।

নুহ (আ.)কে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, 'যারা ইতোমধ্যে ইমান এনেছে তাদের ছাড়া আপনার জাতির অন্য কেউ ইমান আনবে না।' বরং পাপিষ্ঠরা হজরত নুহ (আ.)-এর ওপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। তারা বলল- 'হে নুহ! আমাদের সঙ্গে আপনি তর্ক করেছেন এবং অনেক কলহ করেছেন। এবার আপনার সেই আজাব নিয়ে আসুন, যে সম্পর্কে আপনি আমাদের সতর্ক করেছেন, যদি আপনি সত্যবাদী হয়ে থাকেন।' অবশেষে 'মহান আল্লাহর নির্দেশে নুহ (আ.) একটি নৌকা তৈরি করলেন এবং তাতে সর্বপ্রকার জোড়ার দুটি করে ও ইমানদারসহ তাঁর পরিবাররা আরোহণ করলেন।' 'অতঃপর আমি মুষলধারায় বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে আসমানের দ্বারগুলো খুলে দিলাম এবং জমিনে প্রস্রবণরূপে প্রবহমান করলাম।' সর্বগ্রাসী সেই মহাপ্লাবনের হিংস্রতা থেকে মাত্র ৮০ জন নৌকা আরোহী আর নির্বাচিত অন্যান্য জোড়ার প্রাণিকুলকে মহান আল্লাহ সুরক্ষা দান করলেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হলো- 'হে পৃথিবী, তোমার পানি গিলে ফেল, আর হে আকাশ, ক্ষান্ত হও। আর পানি হ্রাস করা হলো এবং কাজ শেষ হয়ে গেল আর জুদি পর্বতে নৌকা ভিড়ল এবং ঘোষণা করা হলো, দুরাত্মা কাফেররা নিপাত যাক।' হজরত নুহ (আ.) ১০ রজব কিশ্‌তিতে আরোহণ করেছিলেন। দীর্ঘ ৬ মাস পর্যন্ত এই কিশ্‌তি তুফানের মধ্যেই চলছিল। যখন কাবা শরিফের পাশে পৌঁছল, তখন সাতবার কাবা শরিফের তাওয়াফ করল। আল্লাহতায়ালা বায়তুল্লাহ শরিফকে পানির ওপরে তুলে রক্ষা করেছিলেন। পরিশেষে ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার দিনে জুদি পাহাড়ে এসে কিশ্‌তি ভিড়ল। হজরত নুহ (আ.) সেদিন শুকরানার রোজা রাখলেন এবং সহযাত্রী সবাইকে রোজা পালনের নির্দেশ দিলেন। ফলে কিশ্‌তিতে অবস্থানরত যাবতীয় প্রাণীও সেদিন রোজা পালন করেছিল। এ বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে মহান প্রভু কর্তৃক তাঁর প্রিয়জনদের সুরক্ষার এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com