হাজার হাজার মানুষ গন্তব্যে ছুটছেন হেঁটেই

প্রকাশ: ২২ জুন ২১ । ১৯:২৪ | আপডেট: ২২ জুন ২১ । ২০:২৯

গাজীপুর প্রতিনিধি

যানবাহন না পেয়ে হেঁটে গন্তব্য অভিমুখে মানুষ। মঙ্গলবার দুপুরে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার চিত্র- সমকাল

পোশাক কারখানার শ্রমিক মরিয়মের বাম কোলে দেড় বছরের শিশু কন্যা, ডান হাতে জামা কাপড় বোঝাই ব্যাগ। স্বামী হযরত আলীর মাথায় আম কাঠাল ও কিছু শাক-সবজি ভর্তি প্লাস্টিকের একটি বস্তা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে হেঁটে তারা ঢাকার দিকে আসছেন। হাঁটতে হাঁটতে মরিয়মের পা দু'টি ফুলে গেছে। ক্লান্তির ছাপ চোখে।

জামালপুরের বকশিগঞ্জ থেকে মধ্যরাতের পর গাড়িতে উঠে সকাল ৮টার দিকে গাজীপুরের জৈনা বাজার এসে পৌঁছে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন এই দম্পতি। মহাসড়কে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী কোনো যানবাহনই নেই। অটো রিকশা বা সিএনজি চলাচল করলেও ভাড়া দেওয়ার মতো এতো টাকা পকেটে নেই হযরত আলীর। ঢাকায় গিয়ে কাজে যোগদানের জন্য তারা পায়ে হাঁটার কোনো বিকল্প উপায় পাননি। অবশেষে বিকেল ৪টার দিকে পায়ে হেঁটে তারা টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় পৌঁছান। সেখানেই কথা হয় তাদের সাথে।

হযরত আলী বলেন, হঠাৎ করেই লকডাউন ঘোষণা করেছে। বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। পরে যখন মধ্যরাতে জানতে পারেন তখনই ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। এতো গেল হযরত আলী দম্পতির কথা। এর রকম অগণিত নারী পুরুষ ও শিশু ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে মঙ্গলবার গন্তব্যে পৌঁছেছেন।

চলমান বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে গত দুই সপ্তাহ ধরে খানাখন্দে ভরপুর টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কে যানবাহন বসে থেকে যাত্রীদের কেটে যেত ৯-১০ ঘণ্টা সময়। লকডাউনের কারণে এ পথের যাত্রীরা পড়েছেন নতুন যন্ত্রণায়। প্রতিদিন টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত সড়কে ৬০ হাজার যানবাহন চলাচল করে বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, টঙ্গী ব্রীজের উত্তর পাশে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রে ও বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বেশির ভাগ যানবাহনই আবার ঢাকা ফেরত পাঠাচ্ছেন। গাজীপুরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ প্রয়োজনীয় গাড়িগুলো পুলিশের নানা রকম প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেগুলো ছাড়া পাচ্ছে।

এর ঠিক দুই কিলোমিটার উত্তরে চেরাগআলী এলাকায় চলছে খানাখন্দ ভরাটের কাজ। সেখানে সরু গলির মতো করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় যানবাহন ও বিশেষ গাড়িগুলো ওই সরু গলি দিয়ে একটা একটা করে পার হচ্ছে। পুরো দুই কিলোমিটার সড়ক জুড়েই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এই চেরাগ আলী পার হতেই সময় চলে যাচ্ছে ৩ ঘণ্টারও বেশি।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব মো. আবু বকর সিদ্দিক শনিবার চলাচলের প্রায় অনুপযোগী ওই সড়ক সংস্কার করার যে সময় বেধে দিয়েছিলেন। সেটা শেষ হয়েছে মঙ্গলবার। সমকালকে তিনি বলেন, টঙ্গী থেকে উত্তর দিকে ৯শ' মিটার সড়ক চলাচলের উপযোগী করার জন্য রাত দিন কাজ চলছে। বুধবার থেকে স্বাভাবিক ভাবেই গাড়ি চলতে পারবে বলে তার দাবি।

বিআরটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. লিয়াকত আলী বলেন, সড়কে জমে থাকা কাঁদা ও পানি সরিয়ে নেওয়া, গর্তের মধ্যে ইট ফেলে সেগুলো ভড়াট করা ও কোনো কোনো জায়গায় ইটের সলিং এর কাজ চলছে। মঙ্গলবারও ১৩৬ জন শ্রমিক কাজ করেছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার মো. জাকির হাসান বলেন, টঙ্গী, রাজেন্দ্রপুর, শিববাড়ি, কোণাবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ ৯ টি প্রবেশদ্বারে পোস্ট বসানো হয়েছে। সরকার ঘোষিত নলকডাউন বাস্তবায়ন করার লক্ষে পুলিশের এই পদক্ষেপ। যাত্রীবাহী কোনো গাড়ি গাজীপুর ঢাকা ঢোকতে দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয়রা জানান, পণ্যবাহী গাড়ি ও প্রাইভেটকার চলছে আগের মতোই। বাস ছাড়া সব গাড়িই চলছে মহাসড়কে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাড়কে কালিয়াকৈরের চন্দ্রাতে কঠোর লক ডাউন চলছে। সকাল থেকে উত্তরবঙ্গ থেকে শত শত যাত্রীবাহী বাস পুলিশ আটকিয়ে দেন। পরে যাত্রীদের বাস থেকে নমিয়ে নিজ জেলায় বাসগুলো ফিরিয়ে দেন। ফলে গাজীপুরে সরকারের লক ডাউনের ঘোষণা করা হলেও শত শত যাত্রী চন্দ্রা ত্রিমোড়ে এসে ভীড় করেন। এতে পাশের টাঙ্গাইল জেলার গোড়াই ও ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার বাড়ইপাড়া নামক এলাকায় উত্তরবঙ্গগামী যাত্রী ও ঢাকাগামী যাত্রীদের চাপ দিন বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে যায়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের প্রায় আট কিলোমিটার গাজীপুরের মধ্যে পড়াতে পুলিশ দূরপাল্লারর যাত্রীবাহী বাস ও ছোট ছোট যাত্রীবাহী যান বাহন চলতে দেয়নি। ফলে চন্দ্রা এলাকাতে ঢাকা, জয়দেবপুর ও টাঙ্গাইলগামী শত শত যাত্রীদের রোদ বৃষ্টিতে ভিজে অসহনীয় দুর্ভোগে পড়েন।

হাইওয়ের কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, সকালে দুরপালতার বাস চলাচলের চেষ্টা করলে তাদের আটক করা হয়। পরে যাত্রী নামিয়ে নিজ জেলায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুর অংশে কোন যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না।

গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ সমকালকে বলেন, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ২০টি চেক পোস্ট বসানো হয়েছে।

এদিকে খানাখন্দে ভরপুর মহাসড়কের ভোগান্তি থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য রোববার চালু হওয়া ৩টি ট্রেনই বন্ধ হয়ে গেছে। গাজীপুরের সবগুলো রেল জংশনে বন্ধ রয়েছে যাত্রী ওঠানামা। লকডাউনের কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও টঙ্গী রেল ষ্টেশনে কোনো ট্রেন থামেনি বলে জানিয়েছেন টঙ্গী রেল স্টেশন মাস্টার হালিমুজ্জামান। বন্ধ রয়েছে গাজীপুর থেকে কমলাপুর রুটে চলাচল করা তুরাগ ডেমো ও কালিয়াকৈর কমিউটার ট্রেন।




© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com