কুড়িয়ে পাওয়া টাকা যুগ্ম জজকে ফিরিয়ে দিলেন শাহিদা

প্রকাশ: ২৩ জুন ২১ । ২১:২৫ | আপডেট: ২৩ জুন ২১ । ২২:৩৬

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

জজের মানিব্যাগ ফিরিয়ে দেন কর্ণফুলীর শাহিদা আকতার, ছবি: সমকাল

কিডনি রোগে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্ণফুলী উপজেলার শাহমীরপুর গ্রামের শাহিদা আকতার। মেয়ের উন্নত চিকিৎসার জন্য তার প্রয়োজন টাকার। চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে হারিয়েছেন নিজের জমানো টাকাও। চোখে-মুখে যখন অন্ধকার দেখছিলেন, ঠিক তখনই পড়ে থাকা একটি মানিব্যাগ কুড়িয়ে পান তিনি।

ব্যাগটি খুলে দেখলেন ১৮ হাজার ৫৭২ টাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে পড়ে যান দুঃচিন্তায়। কী করবেন তিনি এ ব্যাগের টাকাগুলো নিয়ে! ব্যাগে থাকা কার্ডের নম্বরে ফোন করতে থাকেন বার বার। কিন্তু ফোন ধরছিল না কেউ।মেয়ের চিকিৎসার জন্য এক দিকে টাকার প্রয়োজন, অন্য দিকে ব্যাগের মালিককে পাচ্ছিলেন না খুঁজে।

অবশেষে মঙ্গলবার বিকেলে কর্ণফুলী থানা পুলিশের সহযোগিতায় সেই ব্যাগ ও টাকা ফিরিয়ে দিলেন শাহিদা আকতার। প্রকৃতপক্ষে নিজের কঠিন সময়েও টাকার লোভ না করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি। ব্যাগের প্রকৃত মালিক চট্টগ্রাম জেলা দায়রা জজ আদালতের যুগ্ম জজ মুনতাসির রাসেল।

শাহিদা বলেন, আমার মেয়ের চিকিৎসার জন্য তখনই আমার টাকার প্রয়োজন ছিল। সে মুহূর্তে আমি ব্যাগটা কুড়িয়ে পাই। এটা পাওয়ার পর আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। মেডিকেলে তো কেউ এমনি এমনি আসে না। নিশ্চয় তিনিও আমার মতো কোনো রোগী নিয়ে মেডিকেলে এসেছেন। ব্যাগের মধ্যে থাকা একটি কার্ড থেকে নম্বর নিয়ে ফোন দিতে থাকি। কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করছিল না।

একপর্যায়ে ফোন রিসিভ করলে জানতে পারি তিনিই এ ব্যাগের প্রকৃত মালিক। তখনই মনে শান্তি আসে। পরে কর্ণফুলী থানা পুলিশের সহযোগিতায় আমি তার ব্যাগ আর টাকা ফিরিয়ে দিই। এখন অনেক খুশি আমি।

বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মুনতাসির রাসেল বলেন, ‘ওয়ালেট এবং মহানুভবতা, আব্বার অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই নিয়মিত মেডিকেলে যেতে হয়েছে। পনের দিন আগে সন্ধ্যায় মেডিকেলের গেটে আমার ওয়ালেট হারিয়ে ফেলি। ওয়ালেটে বেশ কিছু নগদ টাকার সঙ্গে আমার আইডেন্টিটি কার্ড, জাতীয় পরিচয় পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ক্রেডিট কার্ডসহ গুরত্বপূর্ণ ডকুমেন্টও ছিল। ধরেই নিয়েছি, পিক-পকেট হয়েছে! সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতলের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহির সাহেবকে জানালে তিনি পাঁচলাইশ থানায় জিডি করার ব্যবস্থা করেন এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখেন। কিন্তু মিলেনি কোনো হদিস। পরে কল সেন্টারে ফোন করে ক্রেডিট কার্ড উইথহেল্ড করি। পুলিশ কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে যায়। কিন্তু আমার ওয়ালেটের সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। এরপর আব্বা কিছুটা সুস্থ হওয়ার পরে উনাকে বাসায় নিয়ে আসি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এক ভদ্রমহিলা আমার পরিচয় জানতে চান! আমি উনার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেও নাম বলেননি। বার বার আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। পরে কিছুটা বিরক্ত হয়েই আমার নাম বলেছি। জিজ্ঞেস করলেন, আমার কিছু হারিয়েছে কি-না! মানিব্যাগ হারিয়েছে জানালাম। তিনি কিছু প্রশ্ন করে আমার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে নিজের নাম-ঠিকানা জানালেন। বললেন, কর্ণফুলী থানার শাহমীরপুর গ্রামের শাহিদা। অপরিচিত এলাকা। তাই বন্ধু অ্যাডিশনাল সিএমএম মুরাদকে জানালাম। ও নিজেই কর্ণফুলী থানার ওসিকে বলেন। ওসি সাহেব কথা বলে জানালেন, তিনি ওয়ালেট সংগ্রহ করবেন। বিকেলে শাহমীরপুর গ্রামে শাহিদার বাড়ি গিয়ে তিনি ওয়ালেট সংগ্রহ করে আমাকে পাঠালেন। শাহিদা তার অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য মেডিকেলে ছিলেন। সেখানেই ওয়ালেট কুড়িয়ে পেয়েছেন। এর আগেও তিনি দুইদিন আমাকে ফোন করেছেন। আমি রিসিভ করিনি। শাহিদা চাইলেই ওয়ালেট রেখে দিতে পারতেন। আমার জানার কোনো উপায়ই ছিল না। কিন্তু তিনি মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে আমাকে খুঁজে বের করে জানিয়েছেন। তার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা। আমি সব গুরুত্বপূর্ণ কার্ড, টাকা অক্ষত অবস্থায় পেয়েছি। শাহিদা এবং তার সন্তানদের জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তাদের মঙ্গল করুন। আর সেইসঙ্গে ধন্যবাদ জানাই বন্ধু মুরাদ ও কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল মাহমুদসহ পুলিশের সব সদস্যকে।’

কর্ণফুলী থানার ওসি দুলাল মাহমুদ জানান, খারাপ অবস্থায় থাকার পরও শাহিদা একটা টাকাও খরচ করেননি। আসলে দেশে এখনও এমন মানুষ আছেন। তিনি ব্যাগ ও টাকা ফিরিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com