শ্বাসের জন্য অক্সিজেন

২০ জুলাই ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২০ জুলাই ২১ । ০১:০৭

গৌতম কুমার রায়

আমাদের সৃষ্টি এবং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় নির্মল বায়ু তথা অক্সিজেন অপরিহার্য। বায়ুমণ্ডলের নিষ্ফ্ক্রিয় গ্যাসে অভিকর্ষজনিত কারণে অন্যান্য উপাদনের সঙ্গে অক্সিজেন পৃথিবীর খুব কাছে অবস্থান করে। আমাদের চলন, বৃদ্ধি এবং সুস্থ-বাড়ন্তের জন্য এই উপাদানগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহমাত্রা বজায় থাকা আবশ্যক। কিন্তু সংগত কারণে এখন তা আর বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়নশীল দেশ হলেও সে হিসেবে আয়তনের অল্প পরিসরের এই দেশের জনসংখ্যা অনেক। আমাদের নগরায়ণ হলেও মানসম্মত কোনো নগর গড়ে ওঠেনি। দেশে বন, বৃক্ষ যা থাকার কথা, তা নেই। আমাদের শিল্প এবং কৃষি পদ্ধতিতে পরিবেশসম্মত আয়োজন নেই। জীবাশ্ম জ্বালানির মাত্রাছাড়া ব্যবহারের জন্য বাতাসে অবাঞ্ছিত পদার্থের উপস্থিতি প্রচুর। বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ।

করোনা মহামারির বিভীষিকাময় আচরণ দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে রাজধানী ঢাকায় বেশি লেগেছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিলে সর্বাগ্রে ঢাকা, তারপর বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রাম। একটু মিলিয়ে নিলে দেখা যায়, এই দুই রাজধানীর বায়ু অতিমাত্রায় বিষাক্ত। বায়ুতে কার্বন, সিসা, ধোঁয়া, বালুর পরিমাণ অনেক বেশি। এখানে বায়ু সব সময় উচ্চ তাপে প্রবাহিত হয়। বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কম হলেও কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেশি। আছে বিষাক্ত আরও অনেক উপাদান।

ঢাকা শহরে এখন সময়ের প্রতি ফোঁটা ব্যবহার করতে হয় এয়ারকন্ডিশন বা এয়ারকুলারের ওপর। কারণটাও সংগত। কেননা গত ২৫ এপ্রিল ২০২১ তারিখে ঢাকার তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ধুলো-বালুর বিষাক্ত বায়ুর এই শহরে এই তাপ কি সহনযোগ্য! অফিস-আদালত, বাজার-মল, বিনোদন পার্ক, এমনকি শোয়ার ঘর থেকে বাথরুমে এখন এসির ব্যবহার করতে হচ্ছে। অভ্যাস এবং বাধ্যগত কারণে এ ব্যবহার। এসিতে উষ্ণায়ন ঘটে। এর উষ্ণায়ন কার্বন ডাই-অক্সাইডের কার্যকারিতার চেয়েও ৭১০০ গুণ বেশি। এই নগরীতে সব সময় দৃশ্যত বা অদৃশ্যত ধূলিঝড় প্রবাহিত হতে থাকে। এখানকার বন ও বৃক্ষ অনেক আগেই উজাড় হয়ে গেছে। এক হিসাব বলছে, গেল ২০ বছরে এই ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। রাজধানীকে এখন সবুজের বেষ্টনীতে ঘিরে ফেলতে হবে। গাছে গাছে তা সম্ভব। সেগুন, আকাশমণি বা ইউক্যালিপটাস গাছ নয়, আমাদের লাগাতে হবে পরিবেশবান্ধব বট, অর্জুন, পাকুড় অশ্বত্থ এবং নিমগাছ। যে গাছ অক্সিজেন স্টোর করে। নগরীর বাতাস, আলো ও শব্দ বিষাক্ত। ঢাকার মানুষের ফুসফুস সবল থাকতে পারে না। যে জন্য কভিড-১৯-এ এখানে মৃত্যু বেড়েছে। এখানে মানুষের শরীরে নির্মল বাতাসের অক্সিজেন উপাদান না পেয়ে নির্ভরতায় জীবন কাটাতে গিয়ে ফুসফুসের অস্বাভাবিক বিপর্যয় ঘটেছে। রাজধানীর মানুষের জীবনের শেষ ক্ষণে হাহাকার এসেছে এক ফোঁটা কৃত্রিম অক্সিজেনের জন্য।

করোনাভাইরাসের বিস্তৃতিতে যখন প্রাকৃতিক অক্সিজেন আমাদের স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না, তখন আমাদের নির্ভরতা বাড়ছে কৃত্রিম ও তরল বা গ্যাসীয় অক্সিজেনের ওপর। যদি বাংলাদেশের কথা বলি, এপ্রিল ২০২১-এর মাঝামাঝি সময়ে এসে দেখি, প্রতিদিন আমাদের এই অক্সিজেনের চাহিদা ঠেকেছে ১৫০ টনের কাছে; সেখানে আমাদের প্রাপ্তি তার চেয়ে কম। অর্থাৎ ১৩০-১৪০ টন। এখন পর্যন্ত দেশে মাত্র ৭৬টি হাসপাতালে এই অক্সিজেন সরবরাহ করা যাচ্ছে। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের অন্তত বিভাগীয় হাসপাতাল পর্যন্ত তা সরবরাহের আপ্রাণ চেষ্টা করছে সরকার।

মানুষ সেই আদিকাল থেকে প্রকৃতি এবং তার সৃষ্টিকে নিজের মতো করে ভোগ করতে বা পেতে, রূঢ় আচরণ করতে করতে তার বিবর্তন ধারায় বৈপরীত্য শক্তি ব্যবহার করে ফেলেছে। যেটা প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি আমাদের সম্পর্কটা নির্দয় ও অমানবিকও বটে। প্রকৃতির থেকে এ জন্য আমরা সাবলীলতা বা সহানুভূতির বদলে বিরূপাক্ষ আচরণ পেয়েছি। এখন সময় এসেছে, এই বিভেদ রেখা সরিয়ে পরশ স্পর্শ বুলিয়ে দেওয়া। নচেৎ প্লেগ, ম্যালেরিয়া, ইবোলা, নিপাহ অতঃপর কভিড-১৯-এর পর আসবে আরও কত কী। মানুষ যখন ভুলে গেছে, সে এই প্রকৃতির দাস, তখন সমস্যা তৈরি হয়েছে এই ভুল থেকেই।

গবেষক ও পরিবেশ কর্মী
advo.goutam@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com