শেয়ারবাজার স্থিতিশীল রাখতে তহবিল সংক্রান্ত গেজেট

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২১ । ২১:০২ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২১ । ২১:১৩

সমকাল প্রতিবেদক

অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশের (নগদ অর্থ) ৪০ শতাংশ সরাসরি শেয়ার কেনাবেচার জন্য সংরক্ষণের বিধান রেখে বহুল আলোচিত শেয়ারবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল গঠন সংক্রান্ত আইনি বিধানের গেজেট প্রকাশ করেছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত ৩০ জুন এ গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং মেয়াদি বা বেমেয়াদি সব মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদিত লভ্যাংশের (নগদ বা স্টক) যতটুকু অন্তত তিন বছর অবণ্টিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সেই নগদ অর্থ এবং শেয়ার নিয়ে এ তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। 

আইপিও বা রাইট শেয়ার ক্রয়ের জন্য প্রদত্ত অর্থ বা শেয়ার অবণ্টিত থাকলে তাও এ তহবিলে আসবে। এর বাইরে চাইলে তহবিলে সরকার বা অন্য কেউ অনুদান দিতে পারবে। এ তহবিল চাইলে সরকার বা অন্য কারও কাছ থেকে ঋণও নিতে পারবে। আইনি বিধানে বলা হয়েছে, এ তহবিলটি হবে পারপেচ্যুয়াল বা আজীবনের জন্য। তহবিলটি শেয়ারহোল্ডারদের অবণ্টিত লভ্যাংশের হেফাজাতকারী হিসেবে কাজ করবে। তবে সব লভ্যাংশ বণ্টন হয়ে গেলে এ তহবিল বিলুপ্ত করা যাবে। তহবিলটি ব্যবস্থাপনা ও এর যাবতীয় দায় থাকবে এর ১১ সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড অব গভর্নরসদের।

গেজেট প্রকাশের এক মাসের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ২৯ জুলাইয়ের মধ্যে বিএসইসি প্রথম বোর্ড অব গভর্নরস গঠন করে দেবে। এ বোর্ড তিন বছর দায়িত্ব পালন করবে। পরবর্তী বোর্ড বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন থেকে মনোনীত হবে। এ তহবিল গঠনের পর যখনই কোনো বিনিয়োগকারী বা তার পক্ষে নমিনি লভ্যাংশ দাবি করবেন, সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তার প্রাপ্য পরিশোধ করতে হবে।

একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে কখনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে, তখন এ তহবিল থেকে সরাসরি শেয়ার কেনাবেচা বা বাজার মধ্যস্থতাকারীদের (ব্রোকার ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংক, মার্কেট মেকার, সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি ইত্যাদি) ঋণ দিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা যাবে। এর অর্থ এই নয় যে, এ তহবিল থেকে যেকোনো সময় যেকোনো শেয়ার কেনাবেচা করা যাবে। তহবিলটির গঠন সংক্রান্ত আইনি বিধানে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতার রক্ষার স্বার্থে তহবিল পরিচালনাকারীরা তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন।

তবে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা বলতে কী বোঝানো হয়েছে তার সঙ্গা এ আইনি বিধানে নেই। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে ঠিক কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাকে 'অস্থিতিশীল' বলা যাবে এবং কখন এ তহবিলের নগদ অর্থ দিয়ে কোন শেয়ার কতটা পরিমাণে কেনাবেচা করা যাবে- তা এ আইনি বিধানে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

জানতে চাইলে কমিশন কর্মকর্তারা এর ব্যাখ্যায় বলেন, আইনে বলা না হলেও এ বিষয়ে নীতিমালা করবে এ তহবিলের বোর্ড অব গভর্নরস। এছাড়া যেকোনো বিনিয়োগের বিষয়ে বোর্ড অব গভর্নরস দায়ী থাকবে। এক্ষেত্রে অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো বিনিয়োগ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে বিএসইসি।

শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ সমকালকে বলেন, প্রথমত কমিশনের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তবে মনে রাখতে হবে, এ তহবিলের অধীনে থাকা অর্থ ও শেয়ারের মালিক তহবিলের নিজের নয়। এটা নির্দিষ্ট কিছু জনগণের সম্পদ। ফলে এ তহবিলের অর্থ দিয়ে সরাসরি শেয়ার কেনাবেচার মত ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক হচ্ছে কিনা, তা ভেবে দেখা দরকার। তিনি বলেন, দেশের শেয়ারবাজারে পেশাদার ও ভালো পোর্টফোলিও ম্যানেজার নেই বললেই চলে। আইসিবির বিনিয়োগ ধরন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় যারা এ তহবিলের শেয়ার কেনাবেচার দায়িত্বে থাকবেন, তারা যে বিনিয়োগে খুব দক্ষ হবেন বা সব বিনিয়োগ সরল বিশ্বাসে করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভুল বিনিয়োগে বা কারও দ্বারা প্ররোচিত হয়ে কোনো বিনিয়োগ করে লোকসান করলে তার দায় কে নেবে- এ বিষয়টিও ভাবা দরকার ছিল।

তহবিল গঠন সংক্রান্ত বিধিমালায় বলা হয়েছে, তহবিলটি পরিচালনার জন্য ১১ সদস্যের একটি বোর্ড অব গভর্নরস থাকবে। ফান্ডের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাধিক সাব কমিটি করতে পারবেন তারা। বোর্ড অব গভর্নরসের দায়িত্বের বিষয়ে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত শেয়ারে বিনিয়োগ করে, ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংক বা মার্কেট মেকারকে ঋণ দিয়ে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করার জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন। তবে এ তহবিল কী করে এত বড় বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে তা পরিষ্কার নয়।

আইনি বিধানে বলা হয়েছে, এ তহবিলের অর্থের ৪০ শতাংশ সরাসরি শেয়ার কেনাবেচার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ৫০ শতাংশ সংরক্ষিত থাকবে ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক ও মার্কেট মেকারকে ঋণ সহায়তা প্রদানের জন্য। বাকি ১০ শতাংশ ব্যাংকে আমানত হিসেবে অন্য কোনোভাবে বিনিয়োগ করা যাবে।

ফান্ড গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানির কাছে অবণ্টিত লভ্যাংশ (নগদ অর্থ বা শেয়ার), আইপিও বা রাইট শেয়ারের চাঁদা বা শেয়ার তিন বছর বা তার বেশি সময় পড়ে থাকলে তা এ তহবিলে হস্তান্তর করতে হবে। হস্তান্তরের অন্তত এক মাস আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা বণ্টনের চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে তবেই সে অর্থ বা শেয়ার তহবিলের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। হস্তান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারের নামসহ যাবতীয় তথ্য তহবিলকে দিতে হবে। একই সঙ্গে তা কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং সময়ে সময়ে হালনাগাদ করতে হবে।

তহবিল, প্রাপ্ত অর্থ ও শেয়ার সম্পর্কিত তথ্য পৃথকভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং সময়ে সময়ে হালনাগাদ করতে হবে। কোনো বিনিয়োগকারী বা নমিনি সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লভ্যাংশের দাবি যেকোনো সময় করতে পারবেন। এমন দাবি পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা সম্পদ ব্যবস্থাপক তা পরীক্ষা করে এ তহবিলের ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাছে তা হস্তান্তরের জন্য সুপারিশ করবে। এ তহবিলও ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করবে।

এ তহবিল থেকে সরাসরি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো লোকসান হলে তার বিপরীতে শতভাগ অর্থ সংরক্ষণ (প্রভেসনিং) করতে হবে। তবে আয়ের ক্ষেত্রে অবণ্টিত শেয়ারের বিপরীতে প্রাপ্ত নগদ বা কোনো শেয়ারকে তহবিলের আয় হিসেবে গণ্য না করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।




© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com