প্রচ্ছদ

প্রতিপক্ষ: স্বীকার অস্বীকার

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২১ । ১৮:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফারুক মঈনউদ্দীন

সব শত্রুই প্রতিপক্ষ, কিন্তু সব প্রতিপক্ষ শত্রু নয়। যুদ্ধে প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু। আমাদের জীবনের প্রতি পদে থাকে প্রতিপক্ষ, মানুষ কখনো নিজেই তার প্রতিপক্ষ। ঐতিহাসিকভাবেই মানুষের জীবন ও সমাজ দ্বন্দ্ববহুল। প্রতিপক্ষ থাকে বলেই দ্বন্দ্ব, কিংবা দ্বন্দ্ব আছে বলেই প্রতিপক্ষ অস্তিত্বশীল। এমন প্রতিপক্ষের মধ্যে যে সম্পর্ক থাকে, সেটি কখনো বৈরিতার, কখনো বন্ধুত্বের। প্রতিপক্ষের এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত সবসময় অনিবার্য নয়। সংঘাত তখনই ঘটে, যখন প্রতিপক্ষ শত্রুপক্ষে পরিণত হয়। প্রতিপক্ষের যে পারস্পরিক বিরোধিতায় শত্রুতা বা ঘৃণার অস্তিত্ব থাকে না, সেখানে দুই প্রতিপক্ষ থাকতে পারে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে। পরিবারের মধ্যে যেমন স্বামী ও স্ত্রী, পিতা ও পুত্র, ভাই ও বোন কিংবা প্রকৃতির মধ্যে যেমন আলো ও অন্ধকার। এই প্রতিপক্ষ যেন সহযোগী কিংবা পরস্পরের পরিপূরক। প্রকৃতির দিকে গভীরভাবে তাকালে প্রতিপক্ষের অবস্থান ও অনিবার্যতা নির্ণয় করা সহজ হয়। বিষয়টিকে সহজ করে দিয়েছেন নিউটন এই বলে যে, 'প্রতিটি ক্রিয়ার একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।' কিংবা অন্যভাবে ভাবলে কঠিনই করে দিয়েছেন। কারণ প্রকৃতির এই নিয়ম অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিমূর্ত। বিপরীত প্রতিক্রিয়ার এই বিমূর্তরূপ সবসময় দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। প্রতিপক্ষের সংঘাতের মধ্যেই কেবল দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় দ্বন্দ্ব। প্রকৃতির নিয়মে নিউটনেরও প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। তাঁর প্রতিপক্ষ দাবি করছে যে, সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সবসময় সঠিক নয়, বস্তুর ভর, আকার ও ওজনভেদে এই প্রতিক্রিয়া সমান, কম বা বেশিও হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ জয়লাভ করেনি; কারণ এই পক্ষটি অতি দুর্বল।

প্রতিপক্ষের মধ্যে সাধারণত যে সম্পর্ক বিরাজ করে, সেটি দ্বন্দ্বের- অন্য অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতার, কখনও ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুতার। পক্ষের সঙ্গে 'প্রতি' উপসর্গ যুক্ত হলে পক্ষ হয়ে যায় বিরোধী। বিরোধী পক্ষ বলতে সবসময় শত্রুপক্ষ বোঝায় না। শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ Agonism শব্দটির উৎপত্তি Agon যে গ্রিক থেকে, তার একটি অর্থ 'লড়াই' হলেও Agonism বলতে বোঝায় কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক তত্ত্ব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সুস্থ বিতর্ক বা বিরোধিতা। এই বিরোধিতায় থাকে প্রতিপক্ষের মধ্যে গভীর পারস্পরিক সম্মানবোধ। গ্রিক শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থে শব্দটি দিয়ে জয়-পরাজয় নির্বিশেষে মূলত খেলাধুলার প্রতিযোগিতাকেই বোঝানো হতো। প্রতিযোগিতার বিষয়টিই মুখ্য বিধায় এখানে প্রতিপক্ষের ভূমিকা প্রধান, কারণ, প্রতিপক্ষ ছাড়া কোনো লড়াই ঘটতে পারে না। দুর্বল বা অযোগ্য প্রতিপক্ষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেমন সুস্থতা থাকে না, বিজয়ীরও থাকে না যথার্থ সম্মান।

প্রকৃতির মধ্যে যে দ্বান্দ্বিকতা আছে তার সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আমরা ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের শরণাপন্ন হতে পারি। তাঁর মতে, দ্বান্দ্বিকতা যখন বিষয়মুখী বা বস্তুগত, সেটা প্রকৃতির সর্বত্র অস্তিত্বশীল। আর আত্মমুখ বা মনোগত দ্বান্দ্বিকতা হচ্ছে বিপরীত চিন্তাধারা, যা সর্বত্র নিজেকে আরোপ করে এবং নিজেদের মধ্যে নিরন্তর সংঘাতের মধ্য দিয়ে একে অন্যের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যায় কিংবা সৃষ্টি করে নতুন কিছু। এভাবেই নির্ধারিত হয় প্রকৃতির জীবন। এঙ্গেলস বিবর্তনের ধারায় ইতিবাচক ও নেতিবাচক, দুই প্রতিপক্ষের অনিবার্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করে দেখিয়েছেন, বংশগতিকে কেউ দেখেন ইতিবাচক হিসেবে, আর প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া তথা অভিযোজনকে ভাবতে পারে নেতিবাচক হিসেবে। বংশগতভাবে পাওয়া সবকিছুকে নিরন্তর ধ্বংস করে চলা এই অভিযোজনকেই অন্যপক্ষ সৃষ্টিশীল, সক্রিয় ও ইতিবাচক ক্রিয়া হিসেবে গণ্য করতে পারে। এই পক্ষ বংশগতিকে নিষ্ফ্ক্রিয়, প্রতিরোধী ও নেতিবাচক বলে মনে করে। এঙ্গেলস বলেন, ইতিহাসের সর্বাগ্রবর্তী জাতিগুলোর সকল সংকটময় যুগে বৈপরীত্যের মাধ্যমে সঞ্জাত গতি সবচেয়ে বেশি ও স্পষ্ট দৃশ্যমান।

এঙ্গেলসের প্রকৃতির দ্বন্দ্বতত্ত্বের মাধ্যমেও আমরা জানতে পারি যে, সব পক্ষেরই থাকে একটা প্রতিপক্ষ। এই পক্ষগুলো যখন পরস্পরের সাথে সংযুক্ত কিংবা সংঘাতে লিপ্ত হয় তখন সৃষ্টি হয় নতুন কিছুর। তাই দেখা যায় সব বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্যেই অস্তিত্বশীল থাকে বিরোধ। এই বিরোধের দুই প্রতিপক্ষের সংগ্রামের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় নতুন কিছু। অর্থাৎ কোনো একটি বিশেষ অবস্থাকে যদি 'অস্তি' ধরা হয়, তার প্রতিপক্ষ হয় 'নাস্তি'। জার্মান দার্শনিক হেগেলের তত্ত্বে ইতিহাস বিকাশের দুই প্রতিপক্ষের দ্বন্দ্ব বা সংগ্রামের এই তিন অবস্থাই ইংরেজিতে থিসিস, অ্যান্টিথিসিস ও সিনথেসিস। থিসিস যদি হয় একটি ধারণা, তার বিদ্যমান বা সম্ভাব্য দুর্বলতা কিংবা সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্ভব হওয়া প্রতিপক্ষের বিপরীত বা সম্পূরক মতবাদ বা ধারণাকে, তাহলে গণ্য করা হয় অ্যান্টিথিসিস হিসেবে। বিবদমান এই বিপরীত মতবাদের দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করে উভয় ধারার সমন্বয় ও সংশ্নেষের মাধ্যমে উদ্ভব হয় নতুন আরেকটি উচ্চতর মতবাদ, সেটিই সিনথেসিস। এটি তখন হয়ে যায় থিসিস, যার আবারও থাকতে পারে অ্যান্টিথিসিস। এভাবেই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটা চলমান থাকে।

প্রতিপক্ষের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব ও মিথস্ট্ক্রিয়ার ফলে যে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে সেই অবস্থা সংঘাতহীন থাকে বটে, কিন্তু দ্বন্দ্বহীন থাকে না, কারণ পক্ষগুলো সদাপরিবর্তনশীল। ফলে প্রতিপক্ষের অবস্থানগত পরিবর্তনও প্রকৃতির নিয়মের আয়ত্তাধীন। পৃথিবীর বহু দেশে শাসিত পক্ষ কালক্রমে পরিণত হয়েছে শাসকপক্ষে, দক্ষিণ আফ্রিকার শাসিত কালো মানুষের উদাহরণই এই পরিবর্তনশীলতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। একসময় প্রতিপক্ষের মধ্যে যে বিরোধ, সেটা চরম হয়ে পর্যবসিত হতে পারে শত্রুতায়, আবার শত্রুর মতো প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারে পরম মিত্রে। এভাবেই পরিবর্তনশীল সমাজে বিভিন্ন প্রতিপক্ষের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে।

প্রতিপক্ষ যদি শত্রুতে পরিণত না হয়, তাহলে পরস্পরকে পরাজিত করে নিজেকে কিংবা নিজের মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করাই থাকে উভয়পক্ষের মূল লক্ষ্য। শত্রুতে পরিণত হলে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই হয় অভীষ্ট। প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্মানজনক সমঝোতা হতে পারে, অবসান হতে পারে বিরোধের। কিন্তু শত্রুপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা নয়, সন্ধি হতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম অজস্র সন্ধির উদাহরণ আছে। সাধারণ প্রতিপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস থাকতে পারে, কারণ তাদের মধ্যে থাকে না ধ্বংসকামী দ্বেষ। শত্রুভাবাপন্ন প্রতিপক্ষের মধ্যে থাকে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অন্যপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে বিলুপ্ত করে দেওয়াই থাকে মুখ্য উদ্দেশ্য।

আমরা যদি এঙ্গেলসের এই দ্বান্দ্বিকতার সূত্র মেনে নিই, তাহলে বুঝতে পারব সমাজ ও প্রকৃতির বিবর্তন ও প্রগতির পেছনে প্রতিপক্ষের মধ্যকার বৈপরীত্য সদা ক্রিয়াশীল। একসময় মানুষের প্রতিপক্ষ ছিল প্রকৃতি ও বন্য প্রাণিকুল। হিংস্র পশুর সঙ্গে লড়াই করে নিজের জীবন রক্ষা করে এবং তার খাদ্যে ভাগ বসিয়ে বেঁচে থাকতে হতো মানুষকে। প্রকৃতি ছিল আরেক প্রবল প্রতিপক্ষ, তার রহস্যের কিনারা করতে না পেরে মানুষ প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষের মাঠ থেকে তুলে এনে সম্মানের উচ্চাসনে বসিয়ে গণ্য করত আরাধ্য দেবতা হিসেবে। কিন্তু কালক্রমে সেই প্রকৃতিকে জয় করেছে মানুষ, প্রকৃতিকে দেবতার স্থান থেকে সরিয়ে বসিয়েছে বন্ধুর আসনে। প্রতিপক্ষ বন্যপশুকে পোষ মানিয়ে পরিণত করেছে স্বপক্ষে। কিন্তু এই দুই প্রতিপক্ষকে নিরপেক্ষ ও নিষ্ফ্ক্রিয় করলেও মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে আরও বহু প্রতিপক্ষ, সেই প্রতিপক্ষ কখনো মানুষ নিজেই, কখনো বিশেষ গোষ্ঠী, কখনো সরকার, কখনো সময়। আশ্চর্যের বিষয় প্রতিপক্ষ মনুষ্য প্রজাতির হলেও তারা কখনো হিংস্র পশু কিংবা প্রবল বৈরী প্রকৃতির তুলনায় হিংস্র ও প্রবলতর। শিউরে ওঠার মতো এই হিংস্রতার প্রমাণ আজ আর মানুষকে বিস্মিত করে না, হয়তো পশুদেরই বিস্মিত করে।

বিশ্বমানবের জীবনযাত্রার যতই প্রবৃদ্ধি ঘটছে, উৎকর্ষ ঘটছে প্রযুক্তিতে, মানুষকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে একাধিক প্রতিপক্ষের সাথে। কিছু প্রতিপক্ষ সর্বকালে সর্বদেশে বিরাজমান, আবার কিছু প্রতিপক্ষ নির্দিষ্ট দেশ বা সমাজে ক্রিয়াশীল। অতিসরলীকরণের আশঙ্কা না করেই বলা যায় ঠিক বর্তমান সময়ে মানুষের নতুন প্রতিপক্ষ একটি নতুন অতিমারি, যদিও বিশ্ব ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরালে এরকম বহু অতিমারি আরও বহুগুণ বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বিপর্যস্ত করে গেছে আপাতশক্তিমান মানবজাতির জীবন। কিন্তু বর্তমানের বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তির উৎকর্ষ, কোনো কিছু দিয়েই অদৃশ্য পরাক্রমশালী এই প্রতিপক্ষটিকে ঘায়েল করা যাচ্ছে না।

ওপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি জীবনে প্রতিপক্ষের অস্তিত্বকে অস্বীকার নয়, তার সাথে সহাবস্থানই প্রকৃতির ধর্ম, তাকে নির্মূল করার কল্পনাও অবাস্তব, যতক্ষণ না সেই প্রতিপক্ষ প্রবল ও শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ সমাজের ধনী ও নির্ধন দুই প্রতিপক্ষ সম্পর্কে রাশিয়ার চিঠিতে লেখেন, 'আজ পৃথিবীতে যে যুগান্তকারী দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছে, সে ভিন্ন ভিন্ন মহাজাতির মধ্যে নয়, মানুষের এই দুই বিভাগের মধ্যে শাসয়িতা এবং শাসিত, শোষয়িতা এবং শুস্ক।" এই দুই প্রতিপক্ষের মধ্যকার লড়াইয়ের অনিবার্যতা উপলব্ধি করে তিনি আরো লেখেন, 'য়ুরোপে অন্য সকল দেশেরই সাধনা ব্যক্তির লাভকে, ব্যক্তির ভোগকে নিয়ে। তারই মন্থন-আলোড়ন খুবই প্রচণ্ড, আর পৌরাণিক সমুদ্রমন্থনের মতোই তার থেকে বিষ ও সুধা দুই-ই উঠছে। কিন্তু সুধার ভাগ কেবল এক দলই পাচ্ছে অধিকাংশই পাচ্ছে না- এই নিয়ে অসুখ-অশান্তির সীমা নেই। সবাই মেনে নিয়েছিলে এইটেই অনিবার্য; বলেছিল মানবপ্রকৃতির মধ্যেই লোভ আছে এবং লোভের কাজই হচ্ছে ভোগের মধ্যে অসমান ভাগ করে দেওয়া। অতএব প্রতিযোগিতা চলবে এবং লড়াইয়ের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা চাই।'

প্রকৃতির নিয়মে প্রতিপক্ষহীন ছাড়া বিশ্বমানব, দেশ কিংবা সমাজ অকল্পনীয়, সুতরাং বিষয়টির ব্যাপকতা এবং সীমাহীনতাও অচিন্তনীয়। যে মূলমন্ত্র নিয়ে 'বিরোধিতা' শব্দটি প্রাচীন গ্রিস থেকে চালু হয়েছিল, সেটি রাজনীতি কিংবা ক্রীড়া সম্পর্কিত হলেও আমাদের রাজনীতিতে আজকাল প্রতিপক্ষ বলতে বোঝায় পরমতঅসহিষ্ণু শত্রুপক্ষ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আজ আর অহিংস নেই। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ শব্দটাই যেন এখন আর প্রযোজ্য নয়, এখন পক্ষগুলো পরিণত হয়েছে শত্রুপক্ষে, একের নিধনে অন্যের টিকে থাকাই সকল পক্ষের ব্রত।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, জগতে সবকিছুর মতো সাহিত্যেরও রয়েছে প্রতিপক্ষ। তিনি প্রযুক্তিকে সাহিত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাবার প্রয়াস পেয়েছেন। প্রযুক্তি যে মানুষের সঙ্গে বই পড়ার বন্ধনটাকে ক্ষীণ করে দিচ্ছে সেটা নিয়েই তাঁর উদ্বেগ। প্রযুক্তি ব্যবহারকে তিনি সাহিত্যের বিকল্প হিসেবে গণ্য করছেন না, তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী প্রযুক্তি সাহিত্যের প্রতিপক্ষ হতে চাইছে। সমস্যাটা এখানেই দেখছেন তিনি। প্রযুক্তির সাথে পুঁজিবাদকে যুক্ত করে তাকে সাহিত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, 'আধুনিক প্রযুক্তি মানুষকে যে বিচ্ছিন্ন করতে পারছে, সে দোষটা কিন্তু প্রযুক্তির নয়, দোষটা হচ্ছে প্রযুক্তির যে মালিক তার। মালিকের নাম পুঁজিবাদ। সাহিত্যের অনেক প্রতিপক্ষের বিষয়ে জানি আমরা, সাহিত্যের প্রধান প্রতিপক্ষ হচ্ছে এই বিচ্ছিন্নতা।'

মানুষের জীবনে ও প্রকৃতিতে, সমাজে ও সংসারে প্রতিপক্ষ সদা অস্তিত্বশীল, তাকে অস্বীকার করা প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং অসম্ভব। সুতরাং প্রতিপক্ষের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই জীবনের শ্রেয়তর পথ। হিংসাবিদীর্ণ বিশ্বে প্রতিপক্ষ টিকে থাকবে, যেমন থাকে 'আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।' সমাজব্যবস্থার মধ্যে নানান বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্বের কারণে মানুষের মধ্যকার ক্রমবিস্তৃত বিচ্ছিন্নতাই এখন এক প্রবল প্রতিপক্ষ। সেটি ছড়িয়ে আছে বিশ্বমঞ্চে দেশে দেশে ও জাতিতে জাতিতে। তাই সহাবস্থানই বোধহয় বিনাশের হাত এড়াবার প্রকৃষ্ট প্রক্রিয়া। হারুকি মুরাকামির দ্য উইন্ড আপ বার্ড ক্রনিকল উপন্যাসে ওকাদাকে বলা সংলাপটি মনে রাখলে প্রতিপক্ষ ও সহাবস্থানের বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হবে 'ঘৃণা একটা দীর্ঘ ঘন ছায়ার মতো। যার ওপর সে ছায়া পড়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে-ও জানতে পারে না কোথা থেকে আসে ওটা। এটা যেন দু-ধারি তলোয়ার। অন্যকে কাটলে, নিজেকেও কেটে ফেলছ তুমি। যত প্রচণ্ডভাবে অন্যকে কোপ দাও, তত প্রবল হয় তোমার নিজেকে কোপানো। এটা প্রায়ই প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে এটা থেকে অব্যাহতি পাওয়া সহজ নয়।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com