ডিজিটাল পদ্ধতির বাহানায় অব্যবস্থাপনা?

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২১ । ১৭:৫৮

মো. তানজিমুল ইসলাম

প্রতীকী ছবি

বিংশ শতাব্দীর শেষদিকেও এদেশের জনগণ সরকারি ডাক ব্যবস্থার ওপরেই অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। পরে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, যুব শ্রেণি ও অনেক প্রতিষ্ঠানে এ সেবার ব্যাপক চাহিদা। ডাক বিভাগের তুলনায় কুরিয়ার সার্ভিস বেশ দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ছিল বলে আধুনিক ছেলেমেয়েদের ভিড় চোখে পড়ত কুরিয়ারে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপ নিতে শুরু করল। হঠাৎ মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। তারবিহীন এ যন্ত্রের মাধ্যমে অনায়াসে দূরের মানুষের সঙ্গে নিবিড় আলাপনে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ মানুষের অর্থ-সময়-শ্রম সবকিছুতে বাড়তি সহায়ক হয়ে উঠল। এক পর্যায়ে এটি যেন নিত্যদিনের অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল!

বেশ দূর থেকেও এ যন্ত্রের মাধ্যমে মায়ের আদরমাখা কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়! সন্তানের ফলের জন্য আর ডাকপিয়নের পথপানে চেয়ে থাকতে হয় না। ইচ্ছা হলেই প্রিয় বন্ধু বা আপনজনের জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো যায়! বিপদাপন্ন অবস্থায় অন্যের সাহায্য চাওয়া ছাড়াও না ফেরার দেশে চলে যাওয়া মানুষটির খবর দেওয়া-নেওয়া যায় তৎক্ষণাৎ। ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণসহ যাবতীয় ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রাদি জীবনকে আরও সহজ করে দিয়েছে! এসবের সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনাকেই আজকাল বলা হয় 'ডিজিটাল যুগ'।

আধুনিকায়নের ফলে ডিজিটাল সেবা গ্রহীতার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শুধু কথা বলা নয়, তার ছবি দেখা, শর্ট মেসেজ পাঠানো, গান শোনা, সিনেমা-নাটক দেখা, ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, রেকর্ড, ই-মেইল, বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে টাকা লেনদেন, ব্যাংকিং সুবিধা, চিলড্রেন গেমসহ যাবতীয় সুবিধা পাওয়া যায় এই একটি যন্ত্রে (ডিভাইস)।

'ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা' একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে চলে। এখানে কোনো আবেগ, বৈষম্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি চলে না। তবে যারা এটি চালায় তারা অনেকেই কারণে-অকারণে এর অপব্যবহারে ব্যস্ত থাকে। পথ চলতে চলতে মিথ্যা বলার অলিখিত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে অনেকে। ব্যক্তির অবস্থান যদি বগুড়ায় হয়; নির্দি্বধায় বলে বসে, সে নাকি ঢাকায়! মোবাইল গেমের নেশায় আসক্ত হয়ে অবাধ্য ছেলেমেয়েরা পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে যুব শ্রেণির অনেকে যৌনতায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। আবেগ-বিবেকের তোয়াক্কা না করে যে কোনো ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতির লেশমাত্র নেই দেখে হতাশ হয়ে পড়ছে মা-বাবা! গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে তুড়ি মেরে কোমলমতি শিশুরা তাদের শৈশবকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে নানাবিধ মোবাইল গেমে। বাসায় কোনো নিকটাত্মীয় এলেও তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদের সঙ্গে কথা বলা বা শোনার চেয়ে বরং মোবাইল ফোনের টুং-টাং শব্দেই খুশি। অন্যভাবে বলা যায়, মোবাইল ফোনে আসক্ত শিশুদের কোনোকিছুতেই বশ মানানো যায় না! এ অনেকটা মাদকাসক্ত, লক্ষ্যভ্রষ্ট যুবসমাজের মতোই ভয়াবহ। ফেসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক অসামাজিক ও অসামঞ্জস্য ঘটনার জন্ম নিচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে এমনটি ঘটেই চলেছে এখানে-ওখানে। একটু খেয়াল করলে আমাদের আশপাশেই এমন চিত্র আমরা দেখতে পাই অহরহ।

ডিজিটাল কায়দায় আজকাল চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ধরনও অনেকটা পাল্টেছে। এখন আর রাত জেগে কেউ জীবন বাজি রেখে সনাতনি কায়দায় চুরি করতে যায় না। বরং পাসওয়ার্ড চুরি করে। ফলাফল পুকুরচুরি! আজকাল সহজ উপায়ে ডিজিটাল কায়দায় ব্ল্যাকমেইল করা হয়। অশ্নীল ছবির সঙ্গে অন্য মুখের ছবি জোড়া লাগিয়ে বিপাকে ফেলে দেওয়া যায়। ব্যাংকের এটিএম কার্ডের পাসওয়ার্ড ছিনতাই করে বিপদাপন্ন ব্যক্তিকে সর্বস্বান্ত করা হয়। পরিবারের কোনো প্রিয় ব্যক্তি এমনকি কোমলমতি শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মোবাইল ফোনে নানাভাবে হেনস্তা করার বহু পদ্ধতি এ সমাজে বিদ্যমান। মোবাইল ফোনে কথা রেকর্ড করে প্রিয় বন্ধুকেও কখনও কখনও ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ ব্ল্যাকমেইলে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি। আজকাল মূল্যবান জিনিস চুরি হয় না। বরং বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিকের খুব অল্প টাকার পুরাতন ফোনটি সুকৌশলে হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফোনের মালিকের অজান্তেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরিচিতদেরকে সেই ফোন থেকেই তার দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার মিথ্যা খবর দেওয়া হয়। মুমূর্ষু প্রিয় মানুষকে বাঁচানোর প্রত্যাশায় মুহূর্তেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারক চক্রকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য সফল হলে চিরতরে ওই নির্দিষ্ট নম্বর অফ করে রাখে তারা। এটা এক ধরনের ডিজিটাল ছিনতাই। উন্নত যুগের নতুন কৌশল।

এমন নিত্য-নতুন ঘটনার সাক্ষী আমরা। ডিজিটাল যুগের গর্বিত নাগরিক! বেলা-অবেলায় ডিজিটাল বনে গিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। যে মহৎ উদ্দেশ্য মাথায় রেখে ডিজিটাল যুগের আবির্ভাব, তার সুবাতাস নিশ্চয় প্রতিদিনই পাওয়া যায়- এতে কোনো সন্দেহ নেই। পাশাপাশি ডিজিটাল সিস্টেমকে পুঁজি করে দিনের পর দিন যে ধরনের অপকর্মের দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশ, তাতে কি আমরা ভয়ানকভাবে প্রভাবিত হবো না? এ মুহূর্তে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্নম্ন নতুন এক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ডিজিটাল সিস্টেমকে পুঁজি করে আর কতদিন চলতে পারে এ অব্যবস্থাপনা?


© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com