প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

শেকৃবি: কৃষি উন্নয়নের সূতিকাগার

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তৎকালীন ঢাকার অদূরে তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউটের (বিএআই) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেটিই ছিল বাংলায় প্রথম কৃষির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ৩০০ একর জমিসহ এক বড়সড় ক্যাম্পাস। প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে এখানে যোগ দিয়েছিলেন ডি ক্লার্ক। ১০ জন মুসলমান আর ১০ জন হিন্দু ছাত্র ভর্তির মধ্য দিয়ে শুরু হয় এর শিক্ষা কার্যক্রম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদীয় মর্যাদায় বিএআইর যাত্রা শুরু হয়। প্রথম ২০ জন ছাত্র কৃষি গ্র্যাজুয়েট হিসেবে ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৪৩ সালে। ১৯৬১ সাল থেকে ৮০ জন ও ১৯৭১ সাল থেকে এখানে প্রতি বছর ১২০ জন ছাত্র ভর্তি করা হয়। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত মোট ২৫ বছর পর্যন্ত উচ্চতর কৃষি শিক্ষার ক্ষেত্রে বিএআই ছিল এ দেশে একক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সে কারণেই একে উচ্চতর কৃষি শিক্ষার সূতিকাগার বলে চিহ্নিত করা হয়।

এ দেশের কৃষির সব ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে রয়েছেন এখানকার গ্র্যাজুয়েটরা। আজকে বাংলাদেশের কৃষির যে উল্লম্ম্ফন ঘটেছে, এর পেছনে নেপথ্যে থেকে অনুক্ষণ যারা কাজ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং কর্মকৌশল নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন, তাদের প্রায় সবাই আমাদেরই গ্র্যাজুয়েট। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ধানের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে এ দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনকে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছেন তারা। তাদের শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং কর্মনিষ্ঠার কারণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কৃষি প্রতিষ্ঠান যেমন- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ তথা বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট্রাল এক্সটেনশন রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট তথা সার্ডি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

বিএআইর একাডেমিক উৎকর্ষতা বেশ খানিকটা ভাটা পড়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৪ সালে এর অনুষদীয় মর্যাদার পরিবর্তে একে অধিভুক্ত ইনস্টিটিউট হিসেবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তির কারণে। এটি একটি আবেগ সংবলিত, কিন্তু বড় রকম এক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক স্বাধীনতা ব্যাহত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সিলেবাসে রেপ্লিকা ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ এতে ব্যাহত হয়। অন্যদিকে, এর প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পিত হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওপর, যা বাস্তবায়িত হতো বিএআরআইর মাধ্যমে। বলা যায়, ত্রিবিধ টানাপোড়েন আর শিক্ষকদের ট্রান্সফার-ভীতি এর শিক্ষা কার্যক্রমকে একটি সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আটকে দেয়। এর ঐতিহ্য ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঢাকা ফার্মের জমিসহ বিএআইর অনেক জমি সংসদ ভবন নির্মাণসহ অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য হস্তান্তর করেছিল বিএআরআইর মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়। ফলে এই ইনস্টিটিউটের জন্য থাকল ৮৬.০২ একর জমি। এর মধ্যে হঠাৎ ১৯৮৫ সালে এসে এর স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ পর্যায়ে ১৯৮৫ সালে গাজীপুরের সালনায় বিএআরআই কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে চালু করা হয় 'ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ' বা ইপসা। সিনিয়র কৃষিবিদদের প্রবল সমালোচনার মুখে বিএআইর নিজস্ব ঠিকানায় টিকে যায়।

শিক্ষার এরকম ক্রমঅবনতিশীল এক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ছুটে বেড়ায় শিক্ষকরা শিক্ষক সমিতির ব্যানারে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে সাবেক গ্র্যাজুয়েটরা সে সময় এগিয়ে আসেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় 'শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়'। ত্রিবিধ যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তিলাভ করে বিএআই। শুরু হয় এক নতুন অভিযাত্রা। নতুন উদ্যমে সেমিস্টার সিস্টেমে চালু হয় এর স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং এক সময় চালু হয় এখানে পিএইচডি কোর্স। কৃষি অনুষদ দিয়ে শুরু হয় এর যাত্রা বটে, তবে ২০০৭ সালে এখানে চালু করা হয় এগ্রিবিজনেস ম্যানেজমেন্ট অনুষদ। ২০১২ সালে এখানে অ্যানিম্যাল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের আওতায় চালু হয় বিএসসি ভেট সায়েন্স অ্যান্ড এএইচ কোর্স। ২০১৭ সালে বিএসসি ইন ফিশারিজ (অনার্স) কোর্স শুরু হয় ফিশারিজ, একোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের আওতায়। মোট ৩২২ জন শিক্ষকের মাধ্যমে ৩৫টি বিভাগের অংশগ্রহণে চলছে এর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম। স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি মিলে এখানে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এখন ৪৭৭০ জন। ফসলের নতুন নতুন বেশ কয়েকটি জাতও উদ্ভাবিত হয় এখানে। উদ্ভাবিত হয় একাধিক ফসল ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রযুক্তিও। গড়ে তোলা হয় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (সাউরেস) এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বহিরাঙ্গন কার্যক্রম। চালু হয়েছে ইনস্টিটিউট অব সিড টেকনোলজি। চালু হয়েছে ছয়তলাবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় গবেষণাগার। নির্মিত হচ্ছে বিশাল আয়তনের টিএসসি। নির্মিত হয়েছে নতুন শহীদ মিনার। নির্মাণকাজ চলছে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল সংবলিত স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভের।

একটি ভালো শুরু এবং এর ধারাবাহিকতা আমাদের ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত মানে নিয়ে পৌঁছাবে তেমনটি আশা করা যায়। ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার মিলিত প্রয়াস এবং সহযোগিতা অতীত গৌরব ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পথ করে দেবে নিশ্চয়। শিক্ষা ও ভাবনার স্বাধীনতা এবং উত্তম নেতৃত্ব কৃষি শিক্ষার এই বাতিঘরের শৌর্যবীর্য যেমন ফিরিয়ে আনতে পারে, তেমনি এখানকার গ্র্যাজুয়েটরা পারে আজকের ও আগামী দিনের কৃষির চাহিদা পূরণের জন্য কৃষির সব ক্ষেত্রে অবদান রাখতে।

উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com