কমরেড শ্রীকান্ত দাশ

সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার আজীবন বিপ্লবী

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২১ । ১৬:১৩

ড. জহিরুল হক শাকিল

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি আর স্বাধীন বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রীয় ও গরিবের সম্পদ আত্মসাৎ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া ও স্বৈরাচার এবং মৌলবাদবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে গণসংগীত ছিল প্রতিবাদের ভাষা। আর এসব গণসংগীত নিয়ে বাংলাদেশ তথা পশ্চিমবঙ্গে যাদের বিচরণ ছিল তাদের একজন হলেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। গত ৫ জুলাই নীরবে-নিভৃতে চলে গেল শ্রীকান্ত দাশের ৯৭তম জন্মদিন।

১৯২৪ সালের এই দিনে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার প্রত্যন্ত আঙ্গারুয়া গ্রামে তার জন্ম। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামী, রাজনীতিবিদ। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা, গণসংগীত শিল্পী, অনেক কালজয়ী গানের রচয়িতা ছিলেন তিনি। প্রত্যন্ত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ- তিন আমলেই শ্রীকান্ত দাশের আঙ্গারুয়ার বাড়িটি ছিল রাজনীতিবিদ, কর্মী ও সংগঠকদের জেল-জুলুম-হুলিয়া থেকে বাঁচতে আত্মগোপনে যাওয়ার নিরাপদ ভূমি। একটি প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জন্ম নিয়ে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে সাম্যবাদী ধ্যান-ধারণায় আঁকড়ে ছিলেন আমৃত্যু।

কমরেড করুণাসিন্ধু রায়ের হাত ধরে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে আসা শ্রীকান্ত দাশ ১৯৪৩ সালে সুরমা উপত্যকায় অষ্টম কৃষক সম্মেলন, পরে বিভিন্ন এলাকায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গণসংগীত ও পথসভায় নেতৃত্বদানসহ ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় অল ইন্ডিয়া কৃষক সম্মেলনে যোগদান করেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির পর পাকিস্তানি শাসন-শোষণবিরোধী আন্দোলনে ভাটি অঞ্চল কাঁপিয়েছেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ও তার অনুসারীরা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ আর এর মধ্যবর্তী সব আন্দোলন-সংগ্রামে গণসংগীত ও সাম্যবাদের মন্ত্রণা নিয়ে তরুণ-যুবকদের প্রতিবাদে উদ্দীপ্ত করতে প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাটি বাংলায় জনমত গড়েছেন। আবার গেরিলা হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের একজন ইস্পাত কঠিন সংগঠক হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর হিট লিস্টে ছিলেন শ্রীকান্ত দাশ।

মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে নিজ উদ্যোগে খুলেছেন লঙ্গরখানা। গণসংগীত গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করেছেন। তার গলায় ছিল- 'ভুট্টো দেখরে চাহিয়া, নিপন দেখরে চাহিয়া; বাংলার মানুষ ঘুমে নাইরে উঠছে জাগিয়া। ২৫ মার্চ রাত্রিকালে ছিল বাঙালিরা ঘুমের ঘোরে, এমন সময় মিলিটারি দিলায় তোমরা লেলাইয়া।' স্বাধীনতাউত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত, উপর্যুপরি বন্যা-ঘূর্ণিঝড়ে ফসলহানি আর দাদন ও জোতদারদের নিপীড়নের শিকার দারিদ্র্যপীড়িত ভাটি এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার আদায়ে কমরেড শ্রীকান্ত ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, তেজস্বী ও সাহসী। ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি মেঘালয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন।

শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্টেম্ন বিভোর শ্রীকান্ত দাশের চোখের সামনেই বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে, অনেক কমরেড আদর্শচ্যুত হয়ে পুঁজিবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিশাল অট্টালিকার মালিক ও শিল্পপতি হয়েছেন, নতুন নতুন জোটে যোগ দিয়েছেন বা নিজেরাই ফ্রন্ট গড়ে ক্ষমতার আশপাশে থেকেছেন, ক্ষমতার অংশীদারও হয়েছেন; কিন্তু কমরেড শ্রীকান্ত দাশ সেই ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেকে কখনও জড়াননি। তাই তিনি গেয়ে উঠতেন- 'আজ দিন এসেছে চাষি-মজুর দেখরে চাহিয়া/কে তোদের মুখের অন্ন নেয়রে কাড়িয়া/সাম্রাজ্যবাদের পা চাটারা দাঁড়ায়ে তোর দ্বারে/গদির লোভে পরের হাতে তোদের বিক্রি করে/আজ কর বিচার, দেওরে শাস্তি, সবে মিলিয়া।'

এভাবে আজীবন পরার্থপরতার রাজনীতি করেছেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। শাল্লার মতো উপজেলায় তার নেতৃত্বে উদীচীর কমিটি হয়েছে। সংগীত, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে চিন্তা-চেতনায় ধারণ করে কাটিয়েছেন প্রত্যন্ত এলাকায়ই। জীবনের পড়ন্ত লগ্নে নিজ জন্মভিটায় গড়ে তুলেছিলেন 'শুদ্ধ সংগীত বিদ্যালয়'। ২০০৪ সালের ৬ অক্টোবর সিলেট কোর্টে হলফনামার মাধ্যমে তিনি মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেন। বাংলাদেশে ২০০৪ সালে তাও আবার সিলেটের মতো এলাকায় মরণোত্তর দেহদানের ঘোষণা দুঃসাহসই বটে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে মরণোত্তর দেহদানে লোকজন উৎসাহী হলেও বাংলাদেশে ২০০৩ সালে প্রথম কোনো ব্যক্তি এই দুঃসাহসিক কাজটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসকদের গবেষণার জন্য মরণোত্তর দেহদানের মাধ্যমে করেন। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর মৃত্যু হলে তার মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেলে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য দান করা হয়। তিনি হলেন সিলেটের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত সিলেটের কোনো মেডিকেলে একমাত্র মরণোত্তর দেহদানকারী ব্যক্তি। এভাবে মানব ইতিহাসে কমরেড শ্রীকান্ত দাশ অমর ও অক্ষয়।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ আজীবন বিপ্লবী হয়ে জীবনের জয়গান গেয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তিতে তার পাশের গ্রাম নয়াগাঁওয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা যখন ঘটে, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে- এই বিবর্ণ বাংলাদেশের জন্য কি জীবনের স্বর্ণালি সময় বিসর্জন দিয়েছিলেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ? আমাদের ঘুণে ধরা সমাজে, ফেসবুক আর সোশ্যাল মিডিয়ার নামে দিন দিনে এক অসামাজিক যুগের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রজন্মকে সমাজসংশ্নিষ্ট করতে, ভোগবাদী স্বার্থপর চিন্তা-চেতনায় বুঁদ হয়ে থাকা আমাদের রাষ্ট্রটিকে পরার্থপরতার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে কমরেড শ্রীকান্ত দাশের জীবন ও কর্মে ফিরে যেতে হবে। সেই কাজটির জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাগ্রে। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা ও প্রচার প্রয়োজন। পরার্থপর সমাজ বিনির্মাণে ব্যর্থ হলে প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুউচ্চ শিখরে উঠেও ছিটকে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। যেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি আমাদের থাকবে কিনা তা দৃঢ়ভাবে বলা যাচ্ছে না।


© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com