দার্শনিক আবদুল মতীন

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদুল ইসলাম

বর্তমান সময়ে একজন প্রাচ্য প্রাজ্ঞ দার্শনিক হিসেবে অভিনন্দিত অধ্যাপক ড. আবদুল মতীন। তিনি সমকালীন দর্শনের নেতিবাচক দিক পরিহার করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে আশাবাদী ছিলেন, যা একজন সফল দার্শনিকের কৃতিত্ব। ড. আবদুল মতীন স্যার ১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক সম্মান এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে দর্শন বিভাগে যোগদান করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দর্শন বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ছিলেন। তিনি কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ১৯৬৮ সালে এবং টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএএচডি ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৬৯ সালে। পরে তিনি কমনওয়েলস ফেলো হিসেবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল করেন। তিনি কিছু গবেষণামূলক মননশীল দর্শনের বই রচনা করেন। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আছে মানুষের জ্ঞানসূত্র, দর্শনের রূপরেখা, বিশ্নেষণী দর্শন, প্রতীকী যুক্তিবিদ্যা, দুই পৃথিবী (কাব্য), যুক্তির আলোকে, হাইলাস ও ফিনোলাসের সংলাপ, মফিজউদ্দিন আহম্মদ ও আবদুল মতীন সম্পাদিত দর্শন পরিভাষা কোষ প্রভৃতি। তাছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণামূলক জার্নালে বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

আমি যখন আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখন স্যারকে দেখতাম অত্যন্ত বিনয়ী ও প্রজ্ঞার অধিকারী। তিনি দর্শনের নিরেটতত্ত্বকে আশ্বস্ত করে সরল-সহজ ভাষায় বুঝাতেন। তিনি ছিলেন নীতিনিষ্ঠ এবং অমায়িক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তার আচার-ব্যবহারে ছাত্রছাত্রীরা থাকতেন উৎফুল্ল। জ্ঞানকে তিনি শ্রদ্ধা করেছেন এবং সে জ্ঞান প্রচার করেছেন মানুষের কাছে অকৃপণভাবে। তাকে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সপ্তম পুনর্মিলনী ২০১৫ স্মরণিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ট্রেজারার শাহ মো. আসাদ উল্লাহ স্মৃতিচারণ করেন এভাবে- বিনম্র গল্পরসিক ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আবদুল মতীন স্যার ছিলেন যেন একজন সাক্ষাৎ অ্যারিস্টটল। একজন সুদর্শন মানুষ কাকে বলে- সেই সুদর্শনের সংজ্ঞা জানা না থাকলেও যারা স্যারকে দেখেছেন তাদের যদি এই সুদর্শনের উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, 'প্রফেসর ড. আবদুল মতীন স্যারই সুদর্শনের উপমা'। তাহলে আমার সমর্থনে হ্যাঁ জয়যুক্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস। স্যারের দীর্ঘকার শরীর, আইরিশ ফর্সা গায়ের রং, কাঁচাপাকা লম্বা চুল, নোটস, নোটস, চক্ষু যুগল পান খেয়ে রাঙানো ঠোঁটের স্মিথ সুন্দর হাসি আর শ্রুতিমধুর বচনে মুগ্ধতার ঘোরে আবিষ্ট হয়ে থাকতাম উপস্থিত শ্রেণিকক্ষের সহপাঠী আমরা।

স্যারকে ঘিরে একটা স্মৃতির কথা এই মুহূর্তে না বললে নয়। একদিন স্যার ড. আমিনুল ইসলাম স্যারের অসুস্থতা উত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সবাই আমিনুল ইসলাম স্যারের ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। স্যার একটু ভান করে স্টেজ থেকে পড়ে গেলেন। সবাই ছুটে এসে স্যারকে তুলতে গেল। স্যার উঠে এলেন স্টেজে। তিনি পরে বক্তৃতায় বললেন, 'আমিনুল ইসলাম অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে উঠে এসে ফুলেল শুভেচ্ছা পেলেন। আমি অসুস্থ হয়ে দেখতে চেয়েছিলাম আমার শুভেচ্ছা কেমন আসে। দার্শনিকরা সুস্থ হলে আনন্দ পাওয়া যায়। আর অসুস্থ থাকলে মনটা খারাপ হয়ে যায়।' সত্যিই সেদিন স্যারকে দেখেছিলাম প্রকৃত দর্শন প্রেমিক, তিনি দর্শনকে ভালবাসেন এবং শ্রদ্ধা করতে জানেন। তিনি অসুস্থ হয়েছিলেন করোনা আক্রান্ত হয়ে। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

প্রভাষক দর্শন বিভাগ, সরকারি ইস্পাহানী কলেজ

কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

shahidulislamiuc@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com