আজ বিশ্ব বাঘ দিবস

কমছে অনুকূল পরিবেশ

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২১ । ০২:২৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

মামুন রেজা, খুলনা ও জাহিদুর রহমান, ঢাকা

সুন্দরবনের বাঘ। বন বিভাগের ক্যামেরা ট্রাপিংয়ে ধরা পড়া ছবি- সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে কমছে বাঘের অনুকূল পরিবেশ, বাড়ছে প্রতিকূলতা। শুধু সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার নয়; পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিতা ও মেছোবাঘ বিলুপ্তির পথে। দূষণ, গাছ কাটা, অপরিকল্পিত পর্যটন, পিটিয়ে হত্যা ও শিকার বন্ধ হয়নি। মানুষের এসব আগ্রাসনের পাশাপাশি রয়েছে প্রাকৃতিক হুমকি। অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বার্ধক্যজনিত কারণেও মারা যাচ্ছে বাঘ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনে জোয়ারের সময় বনভূমি ডুবে যাওয়ায় কমেছে বাঘের বিচরণক্ষেত্র। পাশাপাশি লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় মিষ্টি পানি পাচ্ছে না বাঘ। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন বন বিভাগ ও সুন্দরবন-সংশ্নিষ্টরা।

সুন্দরবনে বিপন্ন বাঘ :সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গড়ে তোলা শতাধিক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান, ফুড সাইলো এবং বনের মধ্য দিয়ে চলাচল করা জাহাজের দূষণ বাঘের ক্ষতি করছে। গাছ কাটা, খাদ্য সংকট, বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও অপরিকল্পিত পর্যটনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বাঘের ওপর। এ ছাড়া লোকালয়ে চলে আসায় পিটিয়ে হত্যার পাশাপাশি রয়েছে পাচারের উদ্দেশ্যে বাঘ শিকার। বন বিভাগের তথ্য বলছে, করোনাকালে দেশে গত ১৬ মাসে তিনটি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী পাচার ও হত্যা প্রতিরোধে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ৩৩টি বাঘ হত্যা করা হয়।

খুলনার সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাঘ হত্যা কিছুটা কমলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার করা হচ্ছে। বনের গাছপালা কেটে বাঘের বসতি হুমকির মুখে ফেলছে কিছু মানুষ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী সমকালকে বলেন, কারখানার তরল বর্জ্য পশুর নদীতে ফেলা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটায় এই বর্জ্য বনের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন করে অসংখ্য শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে। বনের ভেতর দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ চলাচল করছে। এসব জাহাজের বর্জ্য, তেল পানি ও মাটিতে দূষণ ঘটাচ্ছে। এতে ক্ষতি হচ্ছে বাঘের।

মানুষের আগ্রাসনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক কারণেও বাঘের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। সুন্দরবন একাডেমির উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম খোকন সমকালকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় কমছে বাঘের বিচরণক্ষেত্র। পাশাপাশি লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় মিষ্টি পানি পাচ্ছে না বাঘ।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাস ও অস্বাভাবিক জোয়ার মোকাবিলার কোনো প্রস্তুতি বা ব্যবস্থা নেই সুন্দরবনে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়স্থল না থাকায় বিপাকে পড়ে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আজিজ তার গবেষণার উদ্ৃব্দতি দিয়ে জানান, বাঘের জিনগত কাঠামোর ওপর সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা পাঁচটি প্রশস্ত নদীর প্রভাব পাওয়া গেছে। পশুর, শিবসা, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা ও আড়পাঙ্গাসিয়া নদী সুন্দরবনের বাঘকে জিনগতভাবে আলাদা করে ফেলছে। নদীগুলো দেড় থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত হওয়ায় বাঘ সহজে পারাপার করতে পারে না। ফলে প্রজননের মাধ্যমে জিনের আদান-প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মো. মহসিন হোসেন সমকালকে বলেন, বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে সুন্দরবনে জিপিএস সিস্টেমের সাহায্যে 'স্মার্ট প্যাট্রোলিং' চলছে। বন বিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ড বাঘ শিকার প্রতিরোধে কাজ করছে। লোকালয়ে আসা বাঘ রক্ষায় সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম কাজ করছে। এ ছাড়া বনের গাছ কাটা ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধেও অভিযান চালানো হচ্ছে।

অক্টোবরে আবার বাঘ শুমারি :২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। আর ২০১৮ সালে ক্যামেরা ট্রাপিং পদ্ধতিতে করা সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল সমকালকে জানান, একটি প্রকল্প অনুমোদন পেলে আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের নির্ধারিত কিছু এলাকায় শুমারি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মেছোবাঘের ওপর মানুষের আচরণ নির্মম :দেশের গ্রাম-গঞ্জে মেছোবাঘ প্রায়ই মানুষের হাতে মারা পড়ছে। কারণে-অকারণে হত্যার শিকার হওয়ায় প্রকৃতি থেকে এ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে মেছোবাঘের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৩০টি। বিশ্বে ১০ হাজারের মতো মেছোবাঘ টিকে থাকলেও বাংলাদেশে কত মেছোবাঘ আছে, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০ থেকে ১৩ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৮২টি মেছোবাঘ আটক হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি বাঘ মেরে চামড়া ছাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেছোবাঘ দেখা গেলেও হাওরাঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। সেখানে এর মৃত্যুহারও বেশি। বৃহত্তর সিলেটে এ বাঘ বেশি মারা পড়ে।

বিপন্ন চিতাবাঘ :বন দখল করে বসতি স্থাপনের কারণে একদিকে যেমন চিতাবাঘের বাসস্থান কমছে, তেমনি যথেষ্ট শিকার পাচ্ছে না তারা। এতে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে এসে বিপদে পড়ছে চিতাবাঘ। তিন পার্বত্য বনসহ দেশের আরও তিনটি বনাঞ্চলে এখন কোনোমতে টিকে আছে চিতাবাঘ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের বন বিভাগ এবং ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স যৌথভাবে দেশের চিতাবাঘ চিহ্নিত করা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। ২০০২ থেকে ২০ সাল পর্যন্ত দেশে দেখা গেছে এমন চিতাবাঘের ধরন, বৈশিষ্ট্য এবং পরিণতি নিয়ে তারা একটি মূল্যায়নও করেছে। তাতে ওই সময়ে দেশে ২২টি চিতাবাঘ দেখা গেছে। এর মধ্যে সাতটি চিতাকে গ্রামবাসী পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। মেরে ফেলার সব ঘটনা ঘটেছে দেশের উত্তরাঞ্চলে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, বাংলাদেশে মোট আট ধরনের বিড়াল জাতীয় প্রাণীর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পরেই চিতাবাঘের অবস্থান। এরা দেশের কয়েকটি বনে বিস্তৃত এলাকা ধরে বিচরণ করায় এদের শুমারি বা জরিপ করা কঠিন। তবে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৫০টি চিতা থাকতে পারে।

২০১৬ সালে প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন চিতাবাঘকে বাংলাদেশের জন্য অতিবিপন্ন তালিকায় যুক্ত করেছে।

বাঘ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শাহাদাত হোসেন শুভ সমকালকে বলেন, ভারতীয় সুন্দরবনের ভেতর বসবাস করা মানুষকে অন্যত্র পুনর্বাসন করা হয়েছে। এতে ভারতে বাঘের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। বাঘের বিচরণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন; বন ও লোকালয়ের মাঝে সোলার প্যানেল বসানো, জনসাধারণের চলাচল পর্যবেক্ষণ ও জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে পুনঃপ্রবর্তন। 0

বাঘ দিবসে কর্মসূচি :আজ ২৯ জুলাই বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে বিকেল ৩টায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আজ বিকেল ৫টায় 'বাঘ দিবসে বাঘের গল্প' শীর্ষক ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com