করোনা তাদের করেছে ভিক্ষুক

০১ আগস্ট ২১ । ০০:০০

বকুল আহমেদ

রাজধানীর সার্কিট হাউস জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের সামনে ভিক্ষার আশায় বসে আছেন তিন নারী- প্রতিবেদক

মনোয়ারা বেগম রাজধানীর শান্তিনগর এলাকার চারটি বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর কাজ করতেন। গৃহকর্তার বাসাতেই দুপুরের খাবার জুটত ৪৫ বছর বয়সী এই নারীর। চারটি বাসায় কাজ করে মাসে বেতন পেতেন ছয় হাজার টাকা। করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতেই গৃহকর্তারা তাকে কাজে যেতে নিষেধ করেন। এরপরই দরিদ্র মনোয়ারা পড়েন অথৈ সাগরে। সঞ্চিত সামান্য টাকা দিয়ে কিছুদিন চলেন। একপর্যায়ে নিরুপায় হয়ে রাস্তায় নামেন ভিক্ষা করতে। তাতেও তার চলছে না। কারণ, লকডাউনে রাস্তায় মানুষের চলাচল কম, ভিক্ষাও পান কম। অর্থকষ্টে কাটছে তাদের জীবন।

গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণির সার্কিট হাউস জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের সামনে কথা হয় মনোয়ারা বেগমসহ তিন নারীর সঙ্গে। তাদের মধ্যে কমলা বেগমও গৃহকর্মীর কাজ হারিয়ে ভিক্ষা করতে নেমেছেন। তৃতীয়জন সখিনা বেগম কাকরাইলে ফুটপাতে ভাসমান ভাত বিক্রেতা ছিলেন। করোনাকালে ভাত ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই তিনিও নেমে পড়েছেন ভিক্ষাবৃত্তিতে।

সারাদিন রাস্তায় ঘুরে সবমিলিয়ে একশ টাকাও ভিক্ষা পান না। মনোয়ারা ও কমলা সার্কিট হাউস জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের সামনে ফুটপাতেই রাত কাটান।

মনোয়ারা বেগম জানালেন, তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। প্রায় দুই যুগ ঢাকায় বসবাস। স্বামী নাজমুল হোসেন দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করছেন। তিনি পুরানা পল্টনের নূর মসজিদ গলির একটি কক্ষে ১০ নারীর সঙ্গে বসবাস করতেন। মাসে সিটভাড়া দিতে হতো এক হাজার টাকা। অন্য ৯ নারীও গৃহকর্মীর কাজ করতেন।

মনোয়ারা বলেন, 'শান্তিনগর এলাকার চারটি বাসায় কাজ করতাম। গত বছরের এপ্রিল মাসে সব বাসার মালিক কাজ থেকে বাদ দেন আমাকে। তারা বলেন, করোনার মধ্যে তাদের বাসায় গেলে তাদের করোনা হতে পারে।'

তিনি জানান, গৃহকর্মীর কাজ হারানোর পর কয়েক মাস এক হাজার টাকার সিট ভাড়া বাসায় ছিলেন। পরে ভাড়া দিতে না পারায় সেখান থেকে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়েছেন। প্রায়

দেড় বছর ধরে ভিক্ষা করছেন। করোনা মহামারিতেও প্রতিদিন গড়ে দুইশ টাকা পাওয়া যেত জানিয়ে বলেন, লকডাউনের কারণে একেবারেই ভিক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৪৫ টাকা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

৬৫ বছর বয়সী কমলা বেগমের স্বামী সুরুজ আলী ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক ভবনে নিরাপত্তা কর্মীর কাজ করতেন। স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে যে যার মতো

সংসার করছেন। কমলা বেগম শান্তিনগর এলাকার তিনটি বাড়িতে খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর কাজ করতেন। সেখান থেকে যা বেতন পেতেন, তা দিয়ে চলছিল ভালোই। গত বছরের মার্চে

দেশে করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতেই তাকে গৃহকর্মীর কাজ হারাতে হয়। কমলা সমকালকে বলেন, 'বাসার মালিকরা আমাকে বলেছিল, আমি বাইরে থেকে তাদের বাসায় যাই।

আমার কারণে তাদের করোনা হতে পারে। তাই কাজ থেকে বাদ দিয়েছে।'

তিনি জানান, তিনটি বাসা থেকে কাজ হারানোর পর আরও কয়েকটি বাসায় ঘুরেছেন নতুন করে গৃহকর্মীর কাজের খোঁজে। কিন্তু কোথাও কাজ পাননি তিনি। গত বছরের মে মাস থেকে ভিক্ষা শুরু করেন। সার্কিট হাউস এলাকার সড়কে ভিক্ষা করেন। লকডাউনে ভিক্ষাবৃত্তিও কমেছে বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি।

৫০ বছর বয়সী সখিনা বেগম কাকরাইলের ফুটপাতে ভাত বিক্রি করতেন। তিনি জানান, ভাতের ব্যবসায় প্রতি মাসে গড়ে ৭-৮ হাজার টাকা লাভ থাকত। তা দিয়েই সংসার চলত তার। করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে তার ভাতের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।

সখিনা বলেন, 'আমার স্বামীও ভাত বিক্রি করত। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে চাঁদপুরের বাড়িতে চলে গেছে। তার অন্য কোনো কাজ করার শারীরিক শক্তি নেই। তাই আমি ভিক্ষা করা শুরু করেছি। এ ছাড়া কিছু করার ছিল না। প্রতিদিন দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা পাওয়া যেত সারাদিনে। লকডাউনের কারণে এখন একশ টাকাও হয় না সারাদিনে। খুব কষ্টে জীবন কাটছে আমার।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com