শোকের মাস

বঙ্গবন্ধু ও ক্রীড়াঙ্গন

০৪ আগস্ট ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২১ । ০১:১৩

ইকরামউজ্জমান

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী এবং ক্রীড়াপিপাসু ব্যক্তিত্ব। গণমানুষের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও সারাটা জীবন মনের মধ্যে ক্রীড়ামনস্কতা পোষণ করেছেন। ক্রীড়ার নির্মল বিনোদন তাকে সব সময় টেনেছে। বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভেবেছেন। তিনি শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য সব সময় লড়েছেন। মানুষ, পরিবেশ এবং পরিস্থিতি বুঝতে তার কখনও ভুল হয়নি। সাধারণ মানুষের কল্পনা তাকে শুধু একজন রাজনীতিক থেকে তাদের আশা ও স্বপ্নের প্রতিমূর্তি করে তুলেছিল। তার পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং গভীর উপলব্ধি ছিল অসাধারণ। তিনি জীবনকে দেখেছেন অন্যদের চেয়ে আলাদাভাবে। ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গে বাঙালির ক্রীড়াঙ্গনে তার উপলব্ধি, পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রীড়াঙ্গনকে শূন্য থেকে শুরু করার লক্ষ্যে তার উদ্যোগ, দূরদর্শিতা এবং অবদান অসাধারণ। তিনি আগাম অনেক কিছুই ভেবেছেন, চিন্তা করেছেন, বলেছেন যা এখনকার বাস্তবতায় অবাক না হয়ে পারা যায় না। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও চেতনা থেকে ক্রীড়াঙ্গন দূরে সরে গেছে, তার কিছু অগ্রসর চিন্তা এবং ধ্যান-ধারণাকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলেই সুবর্ণজয়ন্তীতে পৌঁছে আমরা দেখছি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সমতার ক্রীড়াঙ্গন, যোগ্য নিবেদিত সংগঠকদের নেতৃত্ব, ক্রীড়াঙ্গনে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত তারুণ্যের ক্রীড়াঙ্গন লক্ষ্য এখনও দূরে। অথচ বঙ্গবন্ধুর চিন্তা, চেতনা ও বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হলে অনেক বেশি এগিয়ে যেত। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সেই উপাদান ছিল। 

পাকিস্তানের দিনগুলোতে রাজনীতিতে ব্যস্ত এবং বছরের পর বছর কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়াঙ্গনের সব খবর রাখতেন শেখ মুজিবুর রহমান। ক্রীড়াঙ্গনে তার কয়েকজন বন্ধু-সংগঠক হিসেবে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু কখনও তার নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাসকে ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিফলিত করেননি। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন, পশ্চিমারা কীভাবে ক্রীড়াঙ্গনকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে। কীভাবে চলছে পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গন। এই ক্রীড়াঙ্গনে কার ও কাদের কী ভূমিকা। কোনো কিছুই তার অজানা ছিল না। তিনি লিখেছেন, 'পাকিস্তান হওয়ার পরেও দালালি করার লোকের অভাব হলো না- যারা সবকিছুই পাকিস্তানকে দিয়ে দিচ্ছে সামান্য লোভে (কারাগারের রোজনামচা পৃষ্ঠা-১১১)।' শেখ মুজিবুর রহমানের বন্ধু মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সংগঠক অ্যাডভোকেট জহিরউদ্দিন বলেছেন, 'শেখ মুজিবুর রহমান সব সময় ক্রীড়াঙ্গনের বন্ধুদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের হিস্যার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেন। বৈষম্য এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি সব সময় বলতেন, পূর্ব পাকিস্তানিদের ক্রীড়াঙ্গনেও ঠকাচ্ছে এবং দমিয়ে রেখেছে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এই অবস্থার অবসান হতেই হবে।'

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৫ সালের জুনে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লিতে নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য, শ্রম এবং শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ ছাড়া তখন খেলাধুলার দায়িত্বে মন্ত্রীও ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এটা ছিল তার অতিরিক্ত দায়িত্ব। তিনি ক্রীড়ার দায়িত্বে থাকাকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনে বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন খেলার জাতীয় স্পোর্টস বডিতে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত চেষ্টা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্মরণীয় হয়ে আছে।

শেখ মুজিবুর রহমান নিজে খেলোয়াড় ছিলেন। শৈশব থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি তার ছিল বিশেষ দুর্বলতা। স্কুলজীবনে নিয়মিত খেলেছেন। তার প্রিয় খেলা ফুটবল। ফুটবল ছাড়াও তিনি ভলিবল ও হকি খেলতেন। শেখ মুজিবুর রহমান মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলেন। তিনি শুধু স্কুলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি, ভালো দল গঠনের জন্য শিক্ষকদের সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন। স্কুল পর্যায় ছাড়াও তৎকালীন মহকুমায় 'শিল্ডের' খেলায় তিনি স্কুল দল নিয়ে অংশ নিয়েছেন। এসব জেনেছি তার 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' (পৃষ্ঠা ১৪ ও ১৫) থেকে। বঙ্গবন্ধু এক সময় ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব স্বাধীনতার পর তাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সম্মানিত করেছে। 

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এটি বৈষম্য আর শোষণের অবসানের দাবি এবং আন্দোলন। ছয় দফার আন্দোলনে তো ক্রীড়াঙ্গনে যে বৈষম্য এবং অবহেলা ছিল তার চেতনা নিহিত ছিল। রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে ক্রীড়াঙ্গনে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বার্ষিক ক্রীড়া অনুদান বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফুটবল, ভলিবল, হকি এবং ক্রিকেটের আসর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বৃদ্ধি করা হয়েছে যোগ্য খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্ব। জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। বাঙালি সংগঠকদের ক্রীড়া দলে অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। 

স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই ন্যায়ভিত্তিক ক্রীড়াঙ্গনের কথা বলেছেন। বলেছেন স্বাধীনতা বাঙালির অনাবিস্কৃত শক্তিকে অবমুক্ত করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তি ও সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সম্মিলিত মানুষ ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনে বাঙালির স্বপ্ন দেখার এখন আর কোনো ধরনের বাধা নেই। বাংলাদেশের মানুষ এখন নিজেরাই ক্রীড়াঙ্গনের চালিকাশক্তি। এই শক্তি হতে হবে আরও সম্মিলিত। 

বঙ্গবন্ধু ছিলেন 'ক্যারিশম্যাটিক লিডার'। ছিলেন আবেগপ্রবণ খোলা দিলের মানুষ। তার স্মরণশক্তি ছিল প্রখর। একবার যাকে কাছে থেকে দেখেছেন, কথা বলেছেন, তাকে ভোলেননি। এটি তার মহত্ত্ব এবং বড় গুণ। ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে তার 'ভিশন' ছিল। এই সংবেদনশীল ব্যক্তিত্ব সময়কে পড়তে পারতেন বলেই ক্রীড়াঙ্গনে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং পরামর্শ দিতে ভুল করেননি। এখন বুঝতে পারছি কেন তিনি স্বাধীনতার পর পর ক্রিকেট খেলার 'পক্ষে' দাঁড়িয়েছিলেন। কেন তিনি প্রথম থেকেই চেয়েছেন ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হোক নিবেদিত ক্রীড়া সংগঠকদের দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে। বিদেশে ক্রীড়া প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ, কোর্স, সেমিনার এবং আন্তর্জাতিক স্পোর্টস ইভেন্টে অংশ নেবেন ক্রীড়া সংগঠক এবং ক্রীড়া-সংশ্নিষ্টরা। সরকারি কর্মকর্তার নাম কেটে বঙ্গবন্ধু ক্রীড়া সংগঠকের নাম লিখে দিয়েছেন এমন উদাহরণ ফাইলে আছে। ক্লাবগুলো কীভাবে ভালোভাবে পরিচালিত হতে পারবে তার একটা উপদেশ তিনি দিয়ে গেছেন! যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অস্থির সময়ে এর দরকার ছিল। ভবিষ্যতের জন্য খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তার কথা চিন্তা করে উদ্যোগ নিতে চেয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গনে তারুণ্যকে কাজে লাগানোর কথা বারবার বলেছেন। বলেছেন জনমিতির সুবিধাকে কাজে লাগাতে। এখন সবাই বুঝতে পারছেন কত বেশি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ভালো খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিটিএমসি, বিজেএমসি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এসব খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদ সার্ভিস রুল অনুযায়ী অবসরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত চাকরি করেছেন। দুস্থ ও গরিব খেলোয়াড়-ক্রীড়াবিদদের সাহায্য এবং পাশে দাঁড়ানোর জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছেন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। ওই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠন করেন। আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক কাজী আনিসুর রহমানকে। অলিম্পিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ থেকে কাজী আনিসুর রহমানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে 'জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা' বিল পাস করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশের মধ্যে ঢাকা স্টেডিয়ামে। এই প্রদর্শনী ম্যাচের উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ১৩ মে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা স্টেডিয়ামে এসেছিলেন বাংলাদেশ একাদশ বনাম কলকাতা মোহনবাগানের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনী ম্যাচ দেখতে। যখনই বাংলাদেশ থেকে কোনো খেলার দল দেশের বাইরে খেলতে গেছে, বঙ্গবন্ধু ব্যস্ততার মধ্যে সময় দিয়েছেন খেলোয়াড়দের। একইভাবে বিদেশ থেকে আসা দলের খেলোয়াড়দের সাক্ষাৎ দিয়েছেন। এটা তার উদার খেলোয়াড়ি মানসিকতার পরিচয়। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে নিখিল ভারত গ্রামীণ ক্রীড়ায় অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক লুৎফুন্নেসা হক বকুলের নেতৃত্বে একটি খেলোয়াড়ি দল পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা গঠন, মেয়েদের জন্য ক্রীড়া পরিকল্পনা, পৃথক ক্রীড়াচত্বর- এসব কিছুই বঙ্গবন্ধুর অবদান। তার স্বপ্ন ছিল ক্রীড়াঙ্গনে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরা তাদের সামর্থ্য এবং সম্ভাবনা তুলে ধরবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা এ সময় দেশের বাইরে ছিলেন) নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। 



ক্রীড়া লেখক ও বিশ্নেষক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com