এখনও অধরা পলাতক পাঁচ খুনি

১৫ আগস্ট ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২১ । ১১:১৩

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

বিশেষ টাস্কফোর্স ও বিদেশি আইনি পরামর্শক নিয়োগের পরও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক পাঁচ আসামিকে এখনও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। যদিও ফিরিয়ে আনতে জোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু কৌশলগত কারণে সব কাজ হচ্ছে অত্যন্ত গোপনে ও সতর্কতার সঙ্গে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ছয়জনের দ কার্যকর করা হয়েছে। আরেকজন পলাতক অবস্থায় বিদেশে মারা গেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর পাঁচ খুনির মধ্যে রয়েছে- লে. কর্নেল (বরখাস্ত) এসএইচএমবি নূর চৌধুরী, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।

প্রসঙ্গ নূর চৌধুরী: এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত নূর চৌধুরী বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছে। নূর চৌধুরীকে ফেরত পাঠালে দেশে তার মৃত্যুদ কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা থাকায় কানাডা সরকার তাকে ফেরত পাঠাতে আগ্রহী নয়। এর পরও তাকে ফেরত পেতে বাংলাদেশ সরকারের জোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ফোরাম থেকে এ দুটি দেশে অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশের মেয়াদ পাঁচ বছরের জন্য বাড়িয়েছে।

সর্বশেষ কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ক্যারিনা গোল্ডের সঙ্গে ভার্চুয়াল এক বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানান। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রসঙ্গ রাশেদ চৌধুরী: মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এ এম রাশেদ চৌধুরী বর্তমানে অবস্থান করছ যুক্তরাষ্ট্রে। তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করছে দেশটির বিচার বিভাগ। সেখানকার অ্যাটর্নি জেনারেল কী রায় দেন তার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাশা করছে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশের মেয়াদ পাঁচ বছরের জন্য বাড়িয়েছে।

অবস্থান শনাক্ত হয়নি তিনজনের: এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম ও মোসলেম উদ্দিনের অবস্থান এখনও সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে রশিদ লিবিয়া অথবা জিম্বাবুয়েতে এবং ডালিম পাকিস্তান বা লিবিয়ায় এবং মোসলেম উদ্দিন পাকিস্তানে পালিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। করোনা মহামারির মধ্যে গত বছরের জুন মাসে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজারে মোসলেম উদ্দিনের ভারতে আটক হওয়ার খবর ছাপা হয়। কিন্তু বিষয়টি পরে নিশ্চিত হতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। এদের সবাইকে ধরতে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। সর্বোচ্চ আদালতে মামলার চূড়ান্ত রায়ও ঘোষণা হয়েছে ১১ বছর আগে। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসি ২০১০ সালে কার্যকর করা হয়। অপর আসামি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদকে ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। ৭ এপ্রিল ঢাকার গাবতলী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে প্রায় দুই যুগ কলকাতায় পালিয়ে ছিল মাজেদ। এ ছাড়া আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা গেছে।

টাস্কফোর্স কতটুকু সক্রিয়: বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফেরাতে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স রয়েছে। তিন মাস পরপর এটির বৈঠক করার কথা থাকলেও তা নিয়মিতভাবে হয় না। সর্বশেষ গত বছর ১০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় ওই টাস্কফোর্সের সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

খুনিদের ফিরিয়ে আনতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে- জানতে চাইলে টাস্কফোর্সের প্রধান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। কোনো শিথিলতা নেই। অবশ্যই একদিন পলাতকদের ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হবে। তিনি বলেন, এই চলমান প্রক্রিয়ার বিষয়ে কিছু বলতে গেলে কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সে জন্য শুধু বলব, তাদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

জানা গেছে, খুনিদের ফেরত আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আইনি পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ করা হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফেরানো নিয়ে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, পাঁচ খুনির মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় ও রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। এই দুটি দেশ সাধারণত ফাঁসির আসামিদের ফেরত দিতে চায় না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি। রাশেদ চৌধুরীর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যেহেতু নাড়াচাড়া করেছে, আশা করব তারা তাকে ফেরত দেবে। আর নূর চৌধুরীকে ফেরত পেতে কানাডার সরকারকে তাগিদ দেওয়া উচিত।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অবস্থান করা বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরী ও নূর চৌধুরীকে দেশে ফেরানো নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, সারা দুনিয়ার সবাইকে জানানো হয়েছে, খুনিদের খবর পেলে আমাদের জানাবেন। কেউ এখন পর্যন্ত জানাননি। রাশেদ চৌধুরীর বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। ভালো একটা রেজাল্ট পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। আর নূ চৌধুরীর বিষয়ে কানাডা কোনো উত্তর দেয় না। তারা একই কথা বারবার বলে, তাদের আইন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ফেরত দেয় না।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com