শ্রদ্ধাঞ্জলি

গণমানুষের অমর শিল্পী

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২১ । ০২:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ খান মেনন

ফকির আলমগীর (১৯৫০-২০২১)

ফকির আলমগীরকে নিয়ে এভাবে লিখতে হবে ভাবিনি। ওর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ওকে নিয়ে লেখার বিষয়গুলো মাথায় ঘুরছিল। সেটা কেবল তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়, একজন সাহসী মানুষের জীবনের কথা লেখার জন্য। তবে কীভাবে লিখব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। লেখার কথা মনে হতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল শহীদ মিনারে শুয়ে থাকা তার নিথর দেহের ছবি। শ্রাবণের ঘোর বারিধারার মধ্যেও তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর জন্য এসেছিলেন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক জগতের নেতৃবৃন্দ। বিভিন্ন সংগঠন। কিছু ব্যতিক্রম যে চোখে পড়েনি তা নয়। কারণ একজন মানুষ, তিনি যত বড়ই হন, সবাই তাকে এক চোখে দেখবে সেটা ভাবা বাতুলতা। বরং শহীদ মিনারে তার ওই শ্রদ্ধা জানানো অনুষ্ঠান সম্পর্কে যে কথাটা ভাবছিলাম, তা হলো করোনার কারণে অব্যাহত লকডাউন না থাকলে শ্রাবণের বারিধারা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ আসত তাকে বিদায় জানাতে। এর মধ্যে থাকত অতি সাধারণ মানুষ, যারা তাকে চিনত তাদেরই মানুষ হিসেবে। তাদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফকির আলমগীর যেসব গান গাইত, সেসব গান তাদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলত। করোনার লকডাউন সে সুযোগ মানুষকে দেয়নি। তবে ফকিরের গানের মধ্য দিয়ে সে বরং ওইসব মানুষের কাছে আরও জীবন্ত হয়ে থাকবে।

ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময়কালে ফকির আলমগীর এসে যুক্ত হয়েছিল 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন-মেনন' গ্রুপে। তার মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। অচিরেই যুক্ত হয় এদেশের গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা কামাল লোহানীর ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীতে। ক্রান্তির হয়ে শ্রমিক অঞ্চল ও সুদূর গ্রামাঞ্চলে গান গেয়ে বেড়াত। তবে তার প্রতিভার স্ম্ফুরণ ঘটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গায়ক হিসেবে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথমে ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী পুনর্গঠন ও পরবর্তী সময়ে লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে গণশিল্পী সংস্থা গড়ে তুললেও পরে নিজেই ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী গড়ে তোলে। তার একক নেতৃত্বে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী গত ৪০ বছর ধরে গণসংগীতাঙ্গনে গণমানুষের কাছের সংগীতের প্রসার ঘটিয়ে চলেছে। গণসংগীত ছিল তার প্রাণের বিষয়। বস্তুত দুই বাংলার গণসংগীতের ধারাকে সে কেবল নিজ দেশেই নয়, বিশ্বময় বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে ছড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর গণসংগীতের এই ধারাকে কতখানি অব্যাহত রাখা যাবে তা এখনই বলা যাবে না। তবে ফকির আলমগীর দুই বাংলার গণসংগীতের ধারাকে যেভাবে জীবন্ত করে রেখে গেছে, তা সহজেই মুছে যাওয়ার নয়।

ফকির আলমগীর কেবল গণসংগীতের ক্ষেত্রেই নয়, আশির দশকে যাদের হাত ধরে বাংলাদেশে পপ সংগীতের প্রচলন ঘটে, ফকির আলমগীর তাদের একজন।

তবে ফকির আলমগীর আরও বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিল বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে তার লেখা ও সুর দেওয়া গানের মধ্য দিয়ে। দেশের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, শহীদ আসাদসহ বিভিন্নজনকে নিয়ে তার যেমন গান ছিল, তেমনি ছিল চে গুয়েভারা, নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিদেল কাস্ত্রোসহ বিশিষ্ট বিপ্লবীদের নিয়ে। ভারতের হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলিল চৌধুরীর গানগুলোকে সে ধরে রেখেছিল তার গায়কির মধ্য দিয়ে। এর বাইরে ছিল তার দেশের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জন্য তার গান বাঁধা। সেসব গান তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে কেবল নয়, তাকে ওইসব মানুষের একজনে পরিণত করেছে।

ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটিই তার মানসিক গঠনকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ধারাকে অনুসরণ করেছে। কোনো দলের সঙ্গে নির্দিষ্টভাবে যুক্ত না হয়েও এই ধারাকে সে অনুসরণ করেছে জীবনভর।

করোনাকালে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। তবে ফোনে যোগাযোগ হয়েছে। বিশেষ করে লোহানী ভাইয়ের অসুস্থতার সময়কালে। তবে ফকির সারাজীবন আমাকে তার জন্য গ্যারান্টেড ধরে নিয়েছিল। এজন্য তার যে কোনো অনুষ্ঠানে আমাকে অতিথি বানিয়ে খবর দিত এবং তার সেসব অনুরোধ রাখতে হতো। আমাদের বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে তাকে গান গাইতে না ডাকলে অভিমান করত। আর তার সেসব অভিমানজনিত বক্তৃতা সহজে থামত না। কোনো আনুষ্ঠানিকতার ধার সে ধারত না। যা বলার সরাসরি বলত, যা করার সরাসরি করত।

ফকির আলমগীরের সঙ্গের বিশেষ যে ঘটনাটি মনে আছে, তা হচ্ছে ১৯৭০-এর স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি ঘোষণার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানে তার স্বতঃস্ম্ফূর্ত গান গাওয়ার ঘটনা। ছাত্র মৈত্রীর সাংস্কৃতিক শাখা গণসাংস্কৃতিক মৈত্রীর ছেলেমেয়েরা যখন গণসংগীত পরিবেশন করছিল, সে সময় কারও আহ্বান ছাড়াই সে মঞ্চে গিয়ে ওই ছেলেমেয়েকে নিয়ে 'বাংলার কমরেড বন্ধু, এইবার তুলে নাও হাতিয়ার' গানটি যখন শুরু করল, তখন পুরো হল আনন্দে ফেটে পড়েছিল।

ফকির একুশে পদক পেয়েছিল। পেয়েছিল দেশের মধ্যে ও দেশের বাইরেও অসংখ্য সম্মাননা। তবে তার একটা দুঃখবোধ ছিল। তার বিশেষ আকাক্ষা ছিল 'স্বাধীনতা' পদক পাওয়ার। জীবদ্দশায় পায়নি। মরণের পর পাবে কি? তাহলে তার সঙ্গে তার অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগীও তৃপ্ত হবেন।

সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com