প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

মেয়রদের আহ্বানে নগরবাসীর সাড়া নেই

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২১ । ০২:৩৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

অমিতোষ পাল

রাজধানীতে বয়স্কদের পাশাপাশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরাও। হাসপাতালে তাদের মশারির মধ্যে রেখেই দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা। মঙ্গলবার ঢাকা শিশু হাসপাতালের ছবি মামুনুর রশিদ

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীর কাছ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা বা সাড়া পাচ্ছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। মেয়ররা বারবার নগরবাসীকে অনুরোধ করে আসছেন প্রত্যেকের বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করার। নিজেরা করতে না পারলে সিটি করপোরেশনকে অবহিত করারও অনুরোধ করছেন। তাতেও নগরবাসীর সাড়া মিলছে না। ফলে প্রতিদিনই রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

গত মে মাস থেকে প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি মাসে তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই নতুন রোগীর সংখ্যা আগের দিনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত ২২ জুলাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৮৫ জন। ১০ দিনের ব্যবধানে ২ আগস্ট নতুন রোগীর ভর্তি হয় প্রায় ৩০০ জন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহমেদ বলেন, আমাদের কাছে আগাম ধারণা ছিল এবার এডিস মশা বাড়বে। সে অনুযায়ী ডিএসসিসি তৎপর ছিল। বছরব্যাপী মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও নিয়েছিলেন মেয়র। জনবল বাড়ানো, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ভালো ওষুধ দেওয়া, যন্ত্রপাতি বাড়ানো ইত্যাদি উদ্যোগ ডিএসসিসি নিয়েছে। আগে প্রতি ওয়ার্ডে একটি টিম কাজ করত। এখন দুটি টিম সকাল-বিকেল কাজ করে। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে মোবাইল কোর্ট, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ করেছি। আগে বাসাবাড়ি পরিচ্ছন্ন করার জন্য একটা নামমাত্র ফি ধরা হয়েছিল। পরে সেটা ফ্রি করা হয়েছে। তার পরও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এত বড় একটা শহরে মানুষ যদি সচেতন না হন, তাহলে কাজটা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকতা লে. কর্নেল গোলাম মোস্তফা সারওয়ার বলেন, ডিএনসিসি এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম। তার পরও এই অবস্থার পেছনে কারণ, আমরা মানুষকে ঠিকমতো সচেতন করতে পারছি না। নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে এডিস মশা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তাদের জরিমানা করছি। কিছুদিন পর ওই ভবন পরিদর্শনে গেলে আবারও সেখানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। বাসাবাড়ির কিছু লোক সচেতন হলেও সরকারি ভবন ও নির্মাণাধীন ভবন মালিকদের কোনোভাবেই সচেতন করতে পারছি না। কিছু ভবনে আমাদের ঢুকতেও দেয় না, নিজেরাও পরিস্কার করে না।

সরকার ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তিন দিনের বেশি জমা পানি কোনোভাবেই রাখা যাবে না। এ রকম পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়ে। এ জন্য বাসাবাড়ি ও আশপাশে পড়ে থাকা নারকেলের মালা, ডাবের খোসা, ক্যান, প্লাস্টিকের বোতল, গাড়ির টায়ার, হাঁড়ি-পাতিল- যেসবে পানি জমতে পারে, সেগুলো নিজ উদ্যোগে অপসারণ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে নগরবাসীকে। পাশাপাশি ফুলের টবেও যাতে পানি না জমে সে অনুরোধ করছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট বিতরণ; রেডিও-টিভিতে বিজ্ঞাপন প্রচার করেও নগরবাসীর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছে না বলে মনে করছে সিটি করপোরেশন।

সর্বশেষ ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম অনুরোধ করেন, 'তিন দিনে এক দিন জমা পানি ফেলে দিন'। সম্প্রতি তিনি নগরবাসীকে অনুরোধ করেন, 'প্রতি শনিবার, নিজ নিজ বাসাবাড়ি করি পরিস্কার'। নগরবাসীর প্রতি এই আহ্বান রাখার পর গত শনিবার ডিএনসিসির দু-একজন কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা ছাড়া কেউ এই আহ্বানে সাড়া দেননি। তবে ওই দিন মেয়র আতিকুল ইসলাম ঠিকই নিজেই নিজের বাসাবাড়ি পরিস্কার করেছেন সকাল ১০টায়। ফেসবুকে সেটা সরাসরি প্রচারও করেছেন। এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান মামুন বলেন, নগরবাসী সাড়া না দিলেও ধীরে ধীরে সাড়া দেবেন বলে বিশ্বাস। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ফেসবুকে ফলোয়ার কম। কিন্তু মেয়র ও কাউন্সিলরদের ফলোয়ার অনেক বেশি। তারাও ফেসবুকে এটা সরাসরি প্রচার করেছেন। ধীরে ধীরে এটা সাধারণের মধ্যে এক সময় ছড়িয়ে পড়বে বলে তার বিশ্বাস।

এ ছাড়া আতিকুল ইসলাম আরেকটি আহ্বান নগরবাসীর প্রতি রেখেছেন, 'এডিস মশা, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন, সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণ'- সেই স্লোগানও আশানুরূপ কাজ দেয়নি বলে মনে করছেন খোদ মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, কারও একার পক্ষে এডিস মশা, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ডিএনসিসির পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম এমপি বলেন, 'বারবার সচেতন করার পরও নগরবাসী সচেতন হচ্ছেন না। সরকারের কাজ হচ্ছে মানুষকে সচেতন করা এবং সেই কাজ সরকার প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে। এখন মানুষ যদি সচেতন না হয়ে এডিস মশার প্রজননে ভূমিকা রাখেন, সেই মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, নানা সমস্যায় ভোগবেন আর চিৎকার করে সরকারকে দোষ দেবেন- এটি সমীচীন হবে না। নিজে সচেতন না হলে সরকার আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না।'

প্রতিদিনই বাড়ছে সংক্রমণ :গত ২২ জুলাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা একশর নিচে থাকলেও পরদিনই তা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। ২৩ জুলাই নতুন রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৪ জনে। ২৫ জুলাই ভর্তি হন ১০৫ জন। ২৬ জুলাই ১২৩ জন। ২৭ জুলাই ১৪৩ জন। ২৮ জুলাই ১৫৩ জন। ২৯ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি হন ১৯৪ জন। গত ১ আগস্ট ২৩৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ২ আগস্ট ভর্তি হয়েছেন আরও ২৮৭ জন। গতকাল ৩ আগস্ট নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ২৬৪ জন।

চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিন হাজার ৪৪৬ জন। ডেঙ্গু সন্দেহে মারা গেছেন চারজন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com