স্মরণ

কবি নজরুলের বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মোহীত উল আলম

বঙ্গবন্ধুর বহু মৌলিক কাজের মধ্যে অন্যতম হলো, কবি নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া। কবি নজরুল স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন ১৯৭২ সালের ২৪ মে। সেদিন কবির ছিল ৭৩তম জন্মবার্ষিকী। কিন্তু ১৯৪২ সালে তার জাগতিক চেতনা লুপ্ত হয় এবং সে কারণে কবি হিসেবে তার মৃত্যু হয় ৭৯ বছর আগে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে তার সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়া যথার্থ। নজরুল যেমন দুঃখী মানুষের কষ্ট দেখে ফুঁসে উঠেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমনি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। এই একই উদ্দেশ্যে যেহেতু দু'জনের জীবন ধাবিত ছিল, এটি প্রায় একটি ঐতিহাসিক নিশ্চয়তা হয়ে পড়ে যে, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নামে যে রাষ্ট্রকে স্বাধীন করলেন, সেটারই জাতীয় কবি হবেন নজরুল। বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতির কবি বলা হয়, তেমনি নজরুলকে কবিতার রাজনীতিক বলা যায়। হাসপাতালে অসুস্থ কবি নজরুলের শয্যাপাশে উদ্বিগ্ন বঙ্গবন্ধু তার (কবির) শিয়রে হাত রেখে সমবেদনা জানাচ্ছেন, এই সাদা-কালো ছবিটি তাই এই দুই মহাপুরুষের মেলবন্ধনের একটি অনুপম স্বাক্ষর।

এই আলোকে যে কথাটি বলতে চাচ্ছি তা হলো- নজরুলের সক্ষম জীবন কেটেছিল ইংরেজ শাসনামলে। সভ্যতার আদর্শের আঁতুড়ঘর যদি ইউরোপের রেনেসাঁকে ধরা হয়, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে রেনেসাঁর দুটি ধারা বিকশিত হতে থাকে। একটি হচ্ছে যুদ্ধনীতি, আরেকটি হলো শান্তিনীতি। যদি ইংরেজ ঘরানার আলোকে ইউরোপের রেনেসাঁর উদ্ভাবনীমূলক চিন্তাশক্তির প্রতিফলন উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি মধ্যবিত্ত এবং অভিজাত পরিবারগুলোর সাহিত্য ও রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে দেখা যায়, তাহলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ যুগের যুদ্ধপ্রীতিও কেন নজরুলের মতো যুবকদের সংক্রমিত করবে না! কারণ ইউরোপের রেনেসাঁর ভিত্তিমূল ছিল ব্যক্তিমানুষের উদ্বোধন- ব্যক্তিমানুষ সমাজের চেয়ে বড় এ রকম একটি চিন্তা। রেনেসাঁ যুগের উপযোগিতামূলক রাজনীতির প্রবক্তা ম্যাকিয়াভেলি তার দ্য প্রিন্স গ্রন্থে বললেন, একজন রাজশাসককে একাধারে যোদ্ধা ও জ্ঞানী হতে হবে। তাই ম্যাকিয়াভেলিসহ অন্যান্য দার্শনিকরা মনে করতেন, 'যুদ্ধ' মানবসমাজের একটি অবধারিত সত্য এবং যুদ্ধের মাধ্যমেই শান্তি আসবে। ধর্মীয়ভাবেও 'জাস্ট ওয়ার' বা 'ন্যায়বাদী যুদ্ধে'র সমর্থন ছিল। কিন্তু রেনেসাঁ মনীষীদের আরেকটি ধারার- অত্যন্ত মানবতাবাদী ও শান্তিবাদী ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ডেসিডেরিয়াস ইরাসমাস, যিনি তার 'কম্পলেইন্ট অব পিস'সহ বহু প্রবন্ধে বললেন, 'যুদ্ধ কখনও শান্তি আনতে পারে না। একটি যুদ্ধ কেবল আরেকটি যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে।'

ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবের ফলে ভারতবর্ষের মধ্যে যুদ্ধ ও শান্তির এ দ্বিধারার প্রবহমানতা লক্ষ্য করা যায় এবং নজরুল কোন প্রবহমানতার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন সেটি সহজেই অনুমেয়। তিনি যুদ্ধের রণদামামা বাজিয়ে কবিতা লিখলেন 'কামাল পাশা', 'আনোয়ার পাশা' ও 'বিদ্রোহী'। 'বিদ্রোহী' কবিতার বিভিন্ন পঙ্‌ক্তি, যেমন 'চির-উন্নত মম শির', 'আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ', 'আমি তাই করি ভাই যখন এ মন চাহে যা' ইত্যাদি পঙ্‌ক্তিগুলো অবশ্যই পরাধীন জাতির স্বাধীনতার আকুলতা থেকে সৃজিত- এ কথা মানতেই হবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যদি আমরা ব্রিটিশ শাসনের মাধ্যমে রেনেসাঁ যুগের ইউরোপীয় রণদামামার কথা মনে রাখি, তাহলে বুঝব নজরুল বস্তুত ম্যাকিয়াভেলির যুদ্ধজাত চিন্তাভাবনার আদর্শে গড়ে উঠেছিলেন এবং সে কারণেই 'বিদ্রোহী' কবিতাটি অত্যন্ত যুদ্ধ-মুখরিত কাব্য হলেও তাতে ব্যক্তিমানুষের চরম উদ্বোধন ব্রিটিশ শাসকদের পছন্দ হওয়ার কথা। সে জন্য 'বিদ্রোহী' কবিতাটি নিয়ে ইংরেজ শাসকদের মধ্যে বিচলিত ভাব আসেনি এবং যে গ্রন্থে এ কবিতাটি নজরুল প্রকাশ করেছিলেন সেই 'অগ্নিবীণা' (১৯২২) কাব্যগ্রন্থটিও ইংরেজ সরকার কখনও বাজেয়াপ্ত করেনি।

কিন্তু এর কিছু পরে ধূমকেতুর ১২তম বা অন্তিম সংখ্যায় প্রকাশিত 'আনন্দময়ীর আগমনে' (১৯২২) কবিতাটি সত্যি সত্যি একটি অ্যাটম বোমা। আমার ধারণা, এটি বন্ধ করার পেছনে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু এবং মুসলমান সমাজের নেতৃগোষ্ঠীরও সমর্থন পেয়েছিল। কারণ কবিতাটিতে আক্রমণের মিসাইল থেকে কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি। প্রথমে তো হিন্দুদের দেবী মা দুর্গাকে এক বিরাট খোঁচা দিয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করলেন তিনি : 'আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?' তারপর নজরুলের চিরকালের শত্রু মোল্লাদের প্রচারিত ধর্মীয় উন্মাদনায় আঘাত : 'দাড়ি নাড়ে, ফতোয়া ঝাড়ে, মসজিদে যায় নামাজ পড়ে,/ নাইকো খেয়াল গোলামগুলোর হারেমে সব বন্দী গড়ে।/ লানত গলায় গোলাম ওরা সালাম করে জুলুমবাজে,/ ধর্মধ্বজা উড়ায় দাড়ি, গলিজ মুখে কোরান ভজে।' ('গলিজ মুখের' রূপক অর্থ নোংরা বা পচনশীল আত্মা।) এরপর গান্ধীর অহিংস আন্দোলনকে কটাক্ষ : 'মাদিগুলোর মাদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি নাকি,/ খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি!' নজরুলের চোখে অহিংস আন্দোলন ছিল 'মাদি' ও 'নপুংসকের' আন্দোলনস্বরূপ। তারপর অভিযোগ এবং আশা : 'হঠাত কখন উঠল ক্ষেপে বিদ্রোহিনী ঝাঁসি রাণী,/ ক্ষ্যাপা মায়ের অভিমানেও এলিনে তুই মা ভবানী।/ এমনি করে ফাঁকি দিয়ে আর কতকাল নিবি পূজা?/ পাষাণ বাপের পাষাণ মেয়ে, আয় মা এবার দশভুজা!'

কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬-১২ ভাদ্র ১৩৮৩)

অন্যদিকে গান্ধীকে আমরা ইরাসমাসের ভাবধারায় শান্তিবাদী রাজনীতিক হিসেবে দেখতে পারি। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে নজরুল ১৯২১ সালে কংগ্রেসের পক্ষে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে 'ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও' বলে গান করলেও এবং গান্ধীর ওপর প্রশস্তিমূলক 'উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন' শীর্ষক প্রবন্ধে "তাঁহার [গান্ধীর] আভিজাত্য-গৌরব নাই, পদ-গৌরবের অহংকার নাই, অনায়াসে প্রাণের মুক্ত উদারতা লইয়া তোমাদের ঘৃণ্য এই 'ছোটলোক'কে বক্ষে ধরিয়া ভাই বলিয়া ডাকিয়াছেন" বললেও পরের বছর, অর্থাৎ ১৯২২ সালে 'ধূমকেতুর পথ' শীর্ষক সম্পাদকীয়তে লিখলেন, "সর্বপ্রথম 'ধূমকেতু' ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না ... পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।" একটু আগেই বলেছি, 'আনন্দময়ীর আগমনে'র কবিতাটিতে তিনি অহিংস আন্দোলনকে 'মাদি' এবং 'নপুংসক' বলেছেন।

বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতায় তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা পেয়েছেন এবং আজকে বোধ করছি সবকিছু ছাড়িয়ে নজরুল ছিলেন বস্তুত মানুষের কবি। তার 'মানুষ' শীর্ষক কবিতাটি সর্বমানবতার জয়গান গাওয়া একটি ইশতেহার :'গাহি সাম্যের গান ... / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্‌!' ঠিক এর আগের লেখা 'সাম্যবাদী' শীর্ষক কবিতার শুরু সে ঝড়-ঝঞ্ঝা তোলা চরণগুলি : 'গাহি সাম্যের গান- / যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম্‌-ক্রীশ্চান। / গাহি সাম্যের গান।'

জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীতে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম। একটি জনবহুল কিন্তু ক্ষুদ্রায়তনের দেশে মানুষকে গিজগিজ করে বাঁচতে হয়, কিন্তু তারপরও মানুষ যাতে মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারে তার জন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দুটি প্রত্যয় নিশ্চিত করতে হয়। একটি হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতার মুষ্টি থেকে বের হয়ে সমন্বয়বাদী চিন্তার প্রতিষ্ঠা করা, আরেকটি হচ্ছে ধনী-দরিদ্র্যের বৈষম্য দূরীভূত করে শোষণবিহীন অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা করা। দুইয়ের সম্মিলিত সফলতা প্রকারান্তরে নিশ্চিত করে মানবতার প্রতিষ্ঠা। এ দুই ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের পথপ্রদর্শক। এটা বলা কঠিন, নজরুল সচেতনভাবে বেঁচে থাকলে তৎকালীন অনেক শীর্ষস্থানীয় বাঙালি মুসলমান কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিজ্ঞদের মতো পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থন দিতেন কিনা, তবে মনে হয় দিতেন না; কারণ তার সমগ্র রচনায় কোথাও সর্বভারতীয় চিন্তার বাইরে কিছু দেখা যায় না। নজরুলের দর্শনে ভারত ভাগ হোক সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে- এ রকম ধারণার অনুপস্থিতি একবারেই নিশ্চিত এবং অন্যদিকে তার অচেতন হওয়ার সময় ১৯৪২ সাল থেকে তখনকার সময় একদিন আকাশবাণীতে একটি প্রোগ্রাম করার সময় পাশের মানুষরা লক্ষ্য করলেন নজরুল অচেতন হয়ে পড়েছেন। দেশভাগ মাত্র পাঁচ বছরের মতো দূরে ছিল, কিন্তু তখনই সর্বভারতীয় রাজনৈতিক আবহাওয়ার মধ্যে এ কথা সঞ্চারিত হয়েছে, মহাযুদ্ধটা শেষ হলেই ইংরেজরা ভারত উপমহাদেশকে দুই টুকরো করে দিয়ে চলে যাবে। নজরুল সব সময় বিশ্বমানবতার মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন, বিশেষ করে নির্যাতিত মানবতার মুক্তির ধ্যান ছিল তার। সে পরিপ্রেক্ষিতে ভারত-পাকিস্তান বিভাজন তার চোখে অনাবশ্যকরূপে প্রতীয়মান হয়েছিল নিশ্চয়। সেজন্য এই সাম্প্রদায়িক তাড়নাকে কোথাও তিনি প্রশ্রয় দেননি।

তবে যে কথাটি বলতে চাচ্ছি, বাংলাদেশ যখন হয়েই গেল, আর নজরুল যখন হয়ে গেলেন আমাদের জাতীয় কবি, নজরুল না জানলেও আমরা ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে বলতে পারছি, এর চেয়ে ভালো যুগলবন্দি আর হতে পারে না। অতীব জনবহুল দেশ বাংলাদেশ, আর অতীব অর্থনৈতিক অস্থিরতার দেশ বাংলাদেশ- সেখানে নজরুল কথিত অসাম্প্রদায়িক কিন্তু সমন্বয়বাদী মানবতা প্রতিষ্ঠা করা কত যে দুরূহ, সেটি আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও ভালোভাবে টের পাচ্ছি। নজরুল এ দুটি ক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক সমতার প্রতিষ্ঠা- যে দুটি প্রতিষ্ঠার পর নিশ্চিত হবে মানবতার জয়- বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু মোক্ষম কথাটি হলো, ত্রাণ প্রক্রিয়ায় তিনিই আসলে আমাদের পথপদর্শক।

বাংলাদেশের নজরুল, নজরুলের বাংলাদেশ তাই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও নজরুল গবেষক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com