প্রকল্পে 'শত ত্রুটি'

চট্টগ্রামের দুঃখ ঘুচবে কবে

২১ সেপ্টেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২১ । ০০:৫৮

সম্পাদকীয়

চট্টগ্রামের দুঃখ জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিবছর বিপুল অর্থ খরচ করা হলেও বাণিজ্যিক রাজধানীর নগরবাসীর দুর্ভোগ দূর  হয়েছে সামান্যই। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে নেওয়া জনগুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রকল্পের সুফল পাওয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। সোমবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন অনুসারে সেই প্রকল্পগুলোর মাঝখানে বের হয়েছে নানা ত্রুটি। এমনকি নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম ওয়াসার মহাপরিকল্পনায় ৫৬টি খাল খনন করার সুপারিশ করা হলেও খনন করা হচ্ছে ৩৬টি খাল। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী খালের দৈর্ঘ্য যা হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা মানা হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন অনুসারে, চট্টগ্রাম শহরের খালগুলোর চরিত্র জানার জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা প্রয়োজন ছিল, তা তড়িঘড়ি করে করা সমীক্ষা প্রতিবেদনে ছিল না। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করায় নির্মাণ কাজের নকশা, বাজেট এবং সময় নির্ধারণে নানা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থেকে যায়।

এখন তাই কাজের সময় প্রতিনিয়ত নকশা সংশোধন ও পরিমার্জন করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এই সময়েও কাজ শেষ করা যাবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের অবস্থাও তথৈবচ। বারবার ব্যয় সংশোধন করে সাত বছরেও তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি খাল খনন করতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। উল্টো তারা দফায় দফায় ব্যয় বাড়াচ্ছে।

এমনকি মাঝপথে এসে অভিমুখ সংশোধন করছে চাক্তাই-কালুরঘাট সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। একই সঙ্গে বন্দরের আপত্তির মুখে ২০১৯ সালে নেওয়া 'চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা বা জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিস্কাশন উন্নয়ন' প্রকল্পের নতুন নকশা করতে হচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। কার্যত প্রকল্পের নামে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ঘিরে। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও সুফল আসছে না। আমরা বিস্মিত, এত বড় বড় প্রকল্প শুরুর আগে যে ধরনের সমীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল, তা না করেই কীভাবে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হলো! প্রকল্পগুলোর দুর্দশা এটাও প্রমাণ করছে, মহানগরীর বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ যেমন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। এ ধরনের খামখেয়ালিপনার কারণে জনদুর্ভোগ কমবে বলে মনে হয় না। সেখানকার ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে ক্ষতির শিকার। এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাইকারি মোকাম চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে শুধু জলাবদ্ধতার কারণেই গত এক দশকে পাঁচ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা।

এতে আরও বলা হয়েছে, পুরো বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে আমলে আনলে এই ক্ষতি প্রতি মাসে ছাড়িয়ে যাবে হাজার কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরে এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বন্দরনগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের ১১ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্পের ত্রুটি নগরবাসীকে নিঃসন্দেহে হতাশ করবে। আমরা মনে করি, যাদের কারণে এ প্রকল্পগুলোয় ত্রুটি দেখা দিয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায়িত্বশীলদের এভাবে ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। বলা বাহুল্য, কেবল চট্টগ্রামের প্রকল্পের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সংশ্নিষ্টদের দায়িত্বহীনতা আমরা দেখে আসছি। তাতে প্রকল্প গ্রহণকারীদের কিছু না হলেও সরকারের অর্থ গচ্চা যায়। আমরা চাই, বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামকে রক্ষা করতে হলে জলাবদ্ধতার বিষফোড়া কেটে ফেলতেই হবে। চট্টগ্রামের আলোচ্য চারটি প্রকল্পের ত্রুটির বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, 'কিছুটা দেরি হলেও কোন প্রকল্পে কী ত্রুটি আছে, তা এখনই সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের কোনো সুফল পাবে না চট্টগ্রামবাসী।' আমরাও চাই, চট্টগ্রাম মহানগরীর দুঃখ দূর করতে। যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হোক।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com