মামলার আসামিকে বাঁচাতে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তার কাণ্ড

অডিট ফার্মের কর্ণধারকে হুমকি দিয়ে লিখিয়ে নেন- 'রিপোর্ট মিথ্যা'

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২১ । ০১:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

শহিদুল ইসলাম

প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা প্রতারণার মামলার এক আসামি সাবেক যুবদল নেতাকে বাঁচাতে একটি অডিট ফার্মের রিপোর্ট 'মিথ্যা' বলে লিখিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তা হলেন সিআইডির পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম। ওই অডিট ফার্মের প্রতিবেদনে দেশের পাট খাতের দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। 'অডিট করেননি'- প্রাণভয়ে এই মর্মে লিখে দিলেও কী ধরনের প্রেক্ষাপটে তা লিখে দিতে বাধ্য হয়েছেন, তা জানিয়ে থানায় জিডি, পুলিশ মহাপরিদর্শক এবং সিআইডিপ্রধান বরাবর লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মালিক এ এইচ মোস্তফা কামাল।

জানা গেছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম ওই অডিট ফার্মের কর্ণধারকে জিডি এবং অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকিও দিচ্ছেন। অভিযোগের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিও বিএনপি সমর্থক কর্মকর্তা বলে অভিযোগ রয়েছে।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্ম মোস্তফা কামাল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার এ এইচ মোস্তফা কামাল ৩১ আগস্ট আইজিপি দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলেন, ১ আগস্ট চার/পাঁচজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি পল্টনে তার অফিসে এসে অস্ত্রের মুখে ভয়ভীতি দেখিয়ে অফিসিয়াল প্যাডে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। তাতে লেখা ছিল, 'ভেরিফিকেশন অব অডিট রিপোর্ট অব দাহমাশি জুট মিলস লি. অব দ্য ইয়ার এন্ডেড জুন ৩০, ২০২০। উই কনফার্ম দ্যাট দ্য লেটার আন্ডার আওয়ার রেফারেন্স :এমকেসি/সিএসএল/১৯০ ডেটেড নিল, সেইড টু হ্যাভ নট বিন ইস্যুড ফ্রম আওয়ার ফার্ম।' স্বাক্ষর নেওয়ার পর তারা হুমকি দিয়ে বলে, মোস্তফা কামাল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট কর্তৃক দাহমাশি জুট ইন্ডাস্ট্রিজকে যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন দিয়েছে, ভবিষ্যতে সেটা অস্বীকার করতে হবে। এর কয়েক দিন পর সিআইডি পুলিশের ঢাকা মহানগর উত্তর বিভাগের ইন্সপেক্টর শহিদুল ইসলাম টেলিফোন করে এ এইচ মোস্তফা কামালকে জানান, তার নেতৃত্বে গত ১ আগস্ট ওই কাগজটিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এটা তিনি করেছেন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খালেদুল হকের নির্দেশে। বিষয়টি কোথাও প্রকাশ করলে বড় রকমের ক্ষতি হবে বলেও শাসিয়ে দেন শহিদুল।

এর দু'দিন আগে ২৯ আগস্ট সিআইডিপ্রধানকেও একই বিষয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়ে সিআইডির ওই কর্মকর্তাদের শাস্তি চাওয়া হয়। এ ছাড়া ভয়ভীতি দেখিয়ে কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় ৫ আগস্ট পল্টন থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন মোস্তফা কামাল। জিডির তদন্তের অগ্রগতির ব্যাপারে জানতে চাইলে পল্টন থানার এসআই মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, তার এক বোন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। মাও হাসপাতালে ভর্তি। তাই জিডির তদন্তের বিষয়টি এখনও সেভাবে অগ্রগতি হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত প্রবাসফেরত ব্যবসায়ী নোমান চৌধুরী তার মালিকানাধীন দাহমাশি গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দাহমাশি জুট ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে তোলেন। পাট খাতের বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা জেনে মৃধা মনিরুজ্জামান ও তার ছেলে মেহেদী জামান সনেটকে অংশীদার করেন। মৃধা মনিরুজ্জামানের গ্রামের বাড়ির এলাকা ফরিদপুরের মধুখালীতে জুট মিলটি গড়ে তোলা হয়। সিংহভাগ অংশীদারিত্ব থাকলেও অন্যান্য ব্যবসায় ব্যস্ততার কারণে নোমান চৌধুরী শুরু থেকেই জুট মিলে সময় দিতে পারেননি। তাই ব্যবস্থাপনা অংশীদার হিসেবে মৃধা মনিরুজ্জামান ও তার ছেলে মেহেদী জামান সনেটকে মিলটি পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব দেন। মৃধা মনিরুজ্জামান দাহমাশি জুট মিল প্রতিষ্ঠাকালে জমি কেনা থেকে মেশিনারিজ আমদানি, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিম্নমানের পাট সরবরাহ করে বেশি দাম নিয়ে এবং ভালো সুতা নষ্ট দেখিয়ে মাত্র কয়েক বছরেই প্রায় অর্ধশত কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জুট মিল প্রতিষ্ঠার আগে তখন মনিরুজ্জামানের অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন না নোমান চৌধুরী। কিন্তু একপর্যায়ে কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়লে জুট মিলের হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করেন তিনি। কোম্পানির চেয়ারম্যান হওয়া সত্ত্বেও নোমান চৌধুরীকে আর্থিক বিষয়ে নাক না গলাতে বলেন মনিরুজ্জামান। নোমান চৌধুরী প্রতিষ্ঠানের খবর নিতে চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন মনির। একপর্যায়ে নোমানের পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এরপর নিজের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডিও করেন নোমান চৌধুরী। এরই মধ্যে দুদকের মামলায় মৃধা মনিরুজ্জামান কারাগারে গেলে অফিসের কাগজপত্র ঘেঁটে মনিরুজ্জামানের প্রতারণা ও জালিয়াতি প্রকাশ পায়। জেল থেকে বের হওয়ার পর তার কাছে প্রতারণা ও জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চেয়ে জুট মিলের হিসাব চাওয়া হয়। তিনি হিসাব দিতে গড়িমসি করতে থাকলে একপর্যায়ে পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অডিট ফার্ম মোস্তফা কামাল অ্যান্ড কোংকে অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাঁচ মাস পর গত ১০ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি অডিট প্রতিবেদন দাখিল করে। এতেই মৃধা মনিরুজ্জামান ও তার ছেলে মেহেদী জামান সনেটের প্রতারণা ও জালিয়াতি ফাঁস হয়ে যায়। পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে বুঝতে পেরে এর কিছুদিন আগেই মনিরুজ্জামান তার ও ছেলের শেয়ার বিক্রি করে প্রাপ্য টাকার পে-অর্ডার নিয়ে চলে যান। সেই পে-অর্ডার ভাঙিয়ে টাকাও তুলে নেন তিনি। এর আগে পাট সরবরাহকারীদের প্রায় ১২ কোটি টাকাও তার পকেটে গেছে বলে অভিযোগ নোমান চৌধুরীর।

এদিকে, অডিট রিপোর্ট পাওয়ার পর হতবাক হয়ে যান নোমান চৌধুরী। মৃধা মনিরুজ্জামান ও তার ছেলের প্রতারণা ও জালিয়াতির প্রমাণসহ ১ মার্চ বনানী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। এর পর থেকে ওই অডিট ফার্মের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন মনিরুজ্জামান। তারা অডিট করেনি মর্মে লিখে নেওয়ার চেষ্টাও করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সিআইডির কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে অডিট রিপোর্ট মিথ্যা বলে লিখিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সিআইডির পরিদর্শক শহিদুল দাহমাশি জুট মিলে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাক্ষ্য না দেওয়ার কথা জানিয়ে এও বলেন, '৪৬ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা ভুয়া।'

দুদকের মামলাসহ বেশ কিছু মামলার আসামি যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মৃধা মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এখনও তিনি তার অংশ বিক্রি করে দেওয়ার পরও জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে গিয়ে স্বাক্ষর না করে দাহমাশি জুট মিল দখলের চেষ্টা করছেন। মিল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও তিনি মাঝেমধ্যেই বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের নিয়ে জুট মিল দখলের চেষ্টা চালান। মামলার বাদী জানান, এখনও নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'যে কেউ অভিযোগ করতেই পারে। কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দেখবে এর সত্যতা কতটুকু। সে খুনের মামলার আসামি নয়, এটা একটা প্রতারণার মামলা। এখনও এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাইনি, যে কারণে আসামি গ্রেপ্তার করতে হবে। তথ্য-প্রমাণ পেলে আসামি গ্রেপ্তার করব। তদন্তের স্বার্থে ওই অডিট ফার্মের কাছে তথ্য জানতে পারি।

সিআইডির মুখপাত্র আজাদ রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে অডিট ফার্মের অভিযোগপত্রটি কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে বলতে পারেননি তিনি।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com