জার্মানি

আউফ ভিডারশ্যেন ফ্রাউ অ্যাঙ্গেলা মেরকেল

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২১ । ০৩:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

দাউদ হায়দার

নিশ্চয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, জার্মানিতে বটেই, গোটা ইউরোপে; উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকায়। এক টানা ১৬ বছর ক্ষমতায়। তাও মহিলা। দেখতে নরম-শরম। কণ্ঠও অনুচ্চ। শুরুর দিকে গত শতকের নব্বই দশকের প্রথমার্ধে, প্রথমে ফ্যামিলি মিনিস্টার, পরে প্রকৃতি ও পরিবেশ। কথায় জড়তা ছিল, পরে সরগরম। কেউ ভাবেনি, অ্যাঙ্গেলা মেরকেল এতটা চৌকস হবেন। হতে হয়েছে। অভিজ্ঞতায়।

জন্ম ১৭ জুলাই ১৯৫৪ সালে, হামবুর্গে। পিতা ছিলেন ধর্মযাজক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, বিভক্ত জার্মানির পূর্বাংশে, অর্থাৎ কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির ব্রান্তেনবুর্গ রাজ্যে যাজকতার চাকরি নিয়ে পঞ্চাশ দশকের শেষে।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের শিক্ষা পূর্ব জার্মানির স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেধাবী ছাত্রী। ডিগ্রি কেমিস্ট্রির। কিছুকাল অধ্যাপনাও। ছাত্রাবস্থায় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি দুর্মম মোহ ছিল না। বেছে নেন এসপিডি (সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি)। সদস্য নির্বাচিত। বলা হয়, পূর্ব জার্মানির এসপিডির কিছু নীতির তীব্র মতবিরোধে দলত্যাগী; 'অনিচ্ছা সত্ত্বেও' যোগ দেন পূর্ব জার্মানির ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নে (সিডিইউ)। কী কী বিষয়ে দূরত্ব, ঘুণাক্ষরেও খোলাসা করেননি কখনও। তার দুই জীবনীকারও আবিস্কার করতে পারেননি। না পারলেও ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে জানিয়েছেন, প্রথম স্বামী উলরিস মেরকেলের সঙ্গে বনিবনা হয় না ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার কারণেই। এই বিষয়েও অ্যাঙ্গেলা মেরকেল রা করেননি। বিবাহিত সময়কাল ছয় বছর (১৯৭৭-৮২)। ১৬ বছর পর (১৯৯৮) ওয়াখিম সাউয়ারের মায়ায় জড়িয়ে দ্বিতীয় বিবাহ। সুখী সংসার। এখনও বন্ধন অটুট।

ড. ওয়াখিম সাউয়ার নামি অধ্যাপক। কেমিস্ট্রি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রায়-অদৃশ্য। কালেভদ্রে দেখা মেলে। কোনো সাংবাদিক তার ইন্টারভিউ করতে পারেননি। স্ত্রী, চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে নিয়ে প্রশ্ন করলে মৌনী। নিজের সম্পর্কেও। একবারই বলেছিলেন, 'ওর (অ্যাঙ্গেলা) কাজ আমার কর্মক্ষেত্র আলাদা।'

অ্যাঙ্গেলা প্রথম স্বামীর পদবি ছাড়েননি, সাউয়ারকে বিয়ের পরও জার্মান নারীকুলে গসিপ- "উলরিসের প্রতি 'লিবে' (ভালোবাসা) মনমননে।"

ডয়চে ভেলের বার্লিন সংবাদদাতা ছিলুম পঁচিশ বছর (এখন অবসরে)। অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে দেখেছি বহু সংবাদ সম্মেলনে। ইন্টারভিউও করেছি দু'বার (পরিবার এবং প্রকৃতিবিষয়কমন্ত্রী ছিলেন যখন)। অবসর নেওয়ার কয়েক দিন আগে ওর সংবাদ সম্মেলনে হাজির, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সপ্রতিভ। সংক্ষিপ্ত জবাব। সংক্ষিপ্ততায় সবই বলা।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে দয়াবশত প্রাক্তন চ্যান্সেলর হেলমুট কোল কাছে টানেন; মন্ত্রী পদে ঠাঁই দেন। কোল বুঝতে পারেননি অ্যাঙ্গেলার কূটবুদ্ধি। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে থাকাকালীন বহু কয়েদির 'গীত' শুনেছি- জেনানা কারাগারে নারী দেখলে উঁচু স্বরে 'নারীর গুণ কী চমৎকার/ তার রূপের বাহার/ ক্ষুরধার/ নরের বুদ্ধি ছারখার।'

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল হিসাব কষে, সুকৌশলে হেলমুট কোলকে সিডিইউর নেতা, নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দলনেত্রী। তখনই জার্মানদের ভবিষ্যদ্বাণী- এই নেত্রী 'হবে একদিন'। হয়েছেন। ২০০৫ সালের নির্বাচনে সিডিইউর প্রার্থী। জয়ী। ২২ নভেম্বর থেকে চ্যান্সেলর।

কে এক পামিস্ট 'নাকি' বলেছিলেন, "অ্যাঙ্গেলার ইচ্ছাশক্তির জয় কেউ 'দাবায়ে' রাখতে পারবে না। জয়ী হবেন। ওর একগুঁয়েমি, নিজের আস্থাশীলতা এবং সুদৃঢ়তায় একনিষ্ঠ। তোয়াক্কা করেন না প্রতিদ্বন্দ্বী।" মিথ্যা নয়। পরিবার, প্রকৃতি পরিবেশমন্ত্রী, চ্যান্সেলরের দায়িত্ব মিলিয়ে কুড়ি বছর। জার্মানির আর কোনো মন্ত্রীর এই রেকর্ড নেই। তিনিই একক। অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল এখনও জনপ্রিয়। নারী ভোটারদের কাছে তো বটেই; পুরুষদেরও। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে অনায়াসে জয়ী। কিন্তু স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসর। বলেন, '১৬ বছর ক্ষমতার শীর্ষে ছিলাম; এখন নতুন কেউ ক্ষমতাসীন হোক। দেশকে ঠিক পথে পরিচালিত করুক। জার্মান অর্থনীতি, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখুক।' এই কথায় 'কিন্তু' আছে। ভাবছিলেন, তার জনপ্রিয়তায় সিডিইউ এবারও (২৬ সেপ্টেম্বর ভোট) জয়ী হবে। চিত্র উল্টো। যদিও সিডিইউর জনসভায় টিভিতে সিডিইউকে ভোট দেওয়ার আকুল আবেদন, কিন্তু চিত্র ভিন্ন। জরিপে এসপিডির চ্যান্সেলর প্রার্থী ওলাফ শলৎস্‌ এগিয়ে। সিডিইউর কোয়ালিশন সরকারে অর্থমন্ত্রী এবং ভাইস চ্যান্সেলর।

ওলাফ শলৎস্‌ ইতোপূর্বে হামবুর্গের মেয়র, এসপিডির জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি। স্বল্পভাষী। গুছিয়ে, যুক্তির মারপ্যাঁচে প্রগলভ। ভোটারও আকৃষ্ট। সিডিইউ তার বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির তত্ত্বতালাশ করতে গিয়ে নাজেহাল। প্রমাণ পায়নি। সিডিইউর কর্মকাণ্ডে ভোটার অসুখী। এক লহমায় ভোট বেড়েছে, সমর্থক শলৎস্‌-এর।

জুলাইয়ের জরিপে সিডিইউর চ্যান্সেলর প্রার্থী আরমিন ল্যাশেট এগিয়ে। আগস্ট থেকে পিছিয়ে ভোটারের বিবেচনায় অযোগ্য। ল্যাশেট জার্মানির বৃহত্তর জনসংখ্যার রাজ্য নর্থ রাইন ভেস্ট ফালিয়ের মুখ্যমন্ত্রী। একদা আইনজীবী। সাংবাদিকতাও করেছেন। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে ওর তুল্যমূল্য আবেদন কদর পায়নি। অনাদর জার্মানদের অপছন্দ।

জার্মানরা নামের আগে সম্মানিত মহিলার 'ফ্রাউ' ব্যবহার করেন। ভদ্রমহিলার তকমায়। হোক বিবাহিতা, অবিবাহিতা। ফ্রাউ অ্যাঙ্গেলা মেরকেল নানা কারণেই স্মরণীয়, দোষগুণে।

এক. প্রথম মহিলা চ্যান্সেলর, দুই. একনাগাড়ে ১৬ বছর চ্যান্সেলর, তিন. জার্মান অর্থনীতির উন্নতি, চার. ইউরোপের অর্থনৈতিক ধসে সামাল। গ্রিসকে উদ্ধার (বিলিয়ন-বিলিয়ন ইউরো সাহায্য দিয়ে)। পাঁচ. সিরিয়া-লিবিয়ার মিলিয়ন উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়ে। করোনা মহামারি অতিদ্রুত সামলে। আমেরিকা বাদ দিয়ে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক গাঁট বেঁধে। রাশিয়ার সঙ্গে (আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও) চুক্তি এবং তৃতীয় বিশ্বকে সাহায্য-সহযোগিতার অর্থদান। দুর্নামও কম নয়। তার আমলেই আ একডের (আলট্রানেটিভ ক্যুর ডয়েচল্যান্ড) রমরমা। এই দল নিও নাৎসির সমর্থক। সংসদে আসীন।

গতকাল ছিল জাতীয় নির্বাচন। কোনো দল একক সংখ্যায় গরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। কোয়ালিশন করতেই হবে। এসপিডি, সিডিইউ, গ্রিন পার্টির সঙ্গে। ত্রিশঙ্কু কোয়ালিশন। এসপিডির সঙ্গে।

বিদায় (আউফ ভিডারশ্যেন) ফ্রাউ অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। ভালো থাকুন। বিদেশিদের জন্য বিস্তর করেছেন। বিদেশিরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতায় আপনি স্মরণীয়। আউফ ভিডারশ্যেন। বিদায়।

কবি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com