গল্প

হাবলু

০৮ অক্টোবর ২১ । ০০:০০

লিখেছেন আবুল কালাম আজাদ, এঁকেছেন রজত

হাবলু। মাথা খাটিয়ে কিছুই করতে পারে না! সেদিন যাচ্ছিল শ্বশুরবাড়ি। সঙ্গে এক হাঁড়ি মিষ্টি। তার বাবা এলাকার সবচেয়ে ভালো ময়রার কাছ থেকে কিনে দিয়েছে। আর বলেছে, শ্বশুরবাড়ি খালি হাতে তো যাওয়া যায় না। এই মিষ্টি নিয়ে যা। তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন খেয়ে খুশি হবে।

হাঁড়িভর্তি মিষ্টি নিয়ে হাবলু সকাল সকাল রওনা হলো। বেলা যতো বাড়তে থাকে সূর্যের তাপও ততো বাড়তে থাকে। দুপুর গড়িয়ে গেলো, হাবলু মাত্র অর্ধেক পথ পার হতে পারলো। তার পা আর চলে না। পেটের ভেতর ক্ষুধা রাক্ষস জেগে উঠেছে। সেই সাত-সকালে ক'টা মাত্র পান্তা ভাত মুখে দিয়ে বের হয়েছে। এখন পেটে কিছু না দিলে যে সে আর এক পা-ও এগোতে পারবে না। তার কাছে সামান্য টাকা আছে। অথচ আশপাশে নেই কোনো বাজার বা দোকানপাট।

এক বটগাছের ছায়ায় হাবলু বসলো। বসে কাঁদতে লাগলো। এই ক্ষুধার্ত অবস্থায় হাবলু না পারবে শ্বশুরবাড়ি যেতে, না পারবে নিজ বাড়ি ফিরতে। কান্না ছাড়া কোনো উপায় আছে?

পাশ দিয়ে ঝাঁকা মাথায় এক লোক যাচ্ছিল। লোকটা হাবলুর কাছে গেলো। বললো, সমস্যা কী? তুমি এখানে বসে কাঁদছো কেন?

হাবলু তার সমস্যার কথা লোকটাকে খুলে বললো। হাবলুর কথা শুনে লোকটা হাসতে লাগলো। তাতে হাবলুর খুব রাগ হলো। বললো, তুমি মোটেও ভালো মানুষ না। মানুষের সমস্যার কথা শুনে এভাবে কেউ হাসে? যাও, তুমি তোমার কাজে যাও।

লোকটা বললো, হাসছি তোমার বোকামি দেখে।

: বোকামি!

: তোমার অই হাঁড়িতে কী আছে?

: মিষ্টি; শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।

: দেখে তো মনে হচ্ছে হাঁড়িতে অনেক মিষ্টি। তুমি ওখান থেকে দু'টো মিষ্টি খেয়ে ফেলো। তারপর অই খাল থেকে টলটলে পানি পান করে শ্বশুরবাড়ির দিকে হাঁটা দাও।

: খুব ভালো কথা বলেছো তুমি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

হাবলু হাঁড়ি থেকে একটা মিষ্টি বের করে মুখে দিল। আহ কী স্বাদ!

হাবলু শুধু বোকাই না, ভীষণ পেটুকও। তার ওপর পেটে দাউ দাউ ক্ষুধার আগুন। হাবলু খেতে খেতে হাঁড়ির সব মিষ্টি খেয়ে নিল।

এখন উপায়? খালি হাতে তো শ্বশুরবাড়ি যাওয়া যায় না। আবার বাড়িও ফিরে যেতে পারে না। সে সব মিষ্টি খেয়ে নিয়েছে, এ কথা শুনলে নির্ঘাত তার বাবা ক্ষেপে যাবে। না এদিক, না ওদিক। আবার সেই কান্না।

সন্ধ্যা হয় হয়। সেই লোক হাট থেকে ফিরছিল। তার মাথায় ঝাঁকাভর্তি সওদা। লোকটা হাবলুকে কাঁদতে দেখে খুব অবাক হলো। সে মাথার ঝাঁকা নামালো। হাবলুর কাছে গিয়ে বললো, আবার কী সমস্যা?

হাবলু খুব কুণ্ঠিত। সব মিষ্টি খেয়ে ফেলার কথা বললো। লোকটা হেসে বললো, সত্যিই তুমি খুব বোকা এবং পেটুক। ঠিক আছে, আমি তোমাকে একটা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

হাবলু বিস্ময় নিয়ে তাকালো লোকটার মুখে। কী ব্যবস্থা করবে সে?

লোকটা বললো, আমি তো অনেক জিনিস কিনেছি। সেখান থেকে তোমাকে কিছু দিচ্ছি। এসব নিয়ে তুমি শ্বশুরবাড়ি যাও। তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন বরং খুশিই হবে।

লোকটা একটা ব্যাগ নিল। তাতে কিছু শাকসবজি, ডিম, একটা মুরগি আর একটা রুই মাছ দিল।

হাবলু বললো, এগুলোর তো অনেক দাম হবে। আমার কাছে অতো টাকা নেই।

:দাম দিতে হবে না। তুমি বিপদে পড়েছো। বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে আমার ভালো লাগে। যাও, হাঁটা শুরু করো। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে। চাঁদের আলোয় হাঁটতে বিশেষ সমস্যা হবে না।

ঠিকঠাক হাবলু এসব নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গেলো এবং কিছু দিন বেশ সুখেই কাটলো। কিন্তু এভাবে তো শ্বশুরবাড়ির সুখ ভোগ করলে চলবে না। ক্ষেতে-খামারে অনেক কাজ পড়ে আছে। এবার ফিরতে হবে।

শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার সময় হাবলুর শ্বশুর-শাশুড়ি হাবলুকে এটা-ওটা অনেক কিছু উপহার দিল। শুধু কি হাবলুকে? তার বাবা-মায়ের জন্যও দিল। পথে যাতে হাবলু ক্ষুুধায় কষ্ট না পায় তাই খাবারও দিয়ে দিল। শত হলেও একমাত্র মেয়ের জামাই। যত্ন-আত্তির শেষ নেই।

পথে চলতে চলতে অনেক দূর এসে হাবলু দেখলো এক থুরথুরে বুড়ি লাঠি হাতে ঠকঠক করে কোথায় যেন যাচ্ছে। হাবলু বললো, ও বুড়ি মা, কোথায় যাও?

: কোথায় আর যাবো বাবা। দুনিয়ায় এক নাতনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। সেই নাতনির কাছে যাচ্ছি।

হাবলুর বুড়ির জন্য খুব মায়া হলো। শ্বশুর বাড়ি থেকে হাবলুর মায়ের জন্য দেওয়া শাড়ি আর চাদর সে বুড়িকে দিয়ে দিল।

কিছু দূর এগিয়ে হাবলু দেখে পথের পাশে বসে এক ভিখারি সাহায্য চাচ্ছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে যে টাকা দিয়েছিল সব টাকা সে ভিখারিকে দিল। উপহার হিসাবে পাওয়া তার নতুন জুতা জোড়াও দিল।

সেই বটগাছের তলায় এসে হাবলু দেখে এক বৃদ্ধ লোক বসে বসে হাঁপাচ্ছে। মনে হলো, সে খুব ক্ষুধার্থ। হাবলু তার সঙ্গে থাকা খাবার সেই বৃদ্ধের সঙ্গে ভাগ করে খেলো। তারপর তার বাবার জন্য দেওয়া লুঙ্গি, জামা সেই বৃদ্ধকে দিয়ে দিল।

তারপর হাবলু খালি হাতে বাড়ি ফিরলো।

হাবলু বাড়ি ফিরলে মা-বাবা ভ্রমণ বৃত্তান্ত শুনতে আগ্রহী হলো। শত হলেও বোকা-সোকা ছেলে, জীবনের প্রথম একাকী শ্বশুরবাড়ি গেছে। হাবলু আদ্যোপান্ত খুলে বললো। শুনে হাবলুর বাবা খুব খুশি। বললো, তুমি বড় একটা শিক্ষা নিয়ে ফিরেছো। সেটা হলো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা। মানুষ মানুষের জন্য।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com