বইয়ের ভুবন

শত প্রশ্নের মুখোমুখি

০৮ অক্টোবর ২১ । ০০:০০

রাজীব নূর

আমাদের সবার নারীবাদী হওয়া উচিত, এবং একটি নারীবাদী ঘোষণাপত্র, মূল-চিমামান্দা এনগোজি আদিচি, অনুবাদ-শিমিন মুশশারাত, প্রকাশনী-বাতিঘর, দাম-২০০ টাকা

তিনি আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন শত প্রশ্নের মুখে। বলছি নাইজেরিয়ার লেখক চিমামান্দা এনগোজি আদিচির কথা। তার দুটি ছোট বইয়ের বাংলা অনুবাদ এক মলাটে নিয়ে এসেছে 'বাতিঘর'- 'আমাদের সবার নারীবাদী হওয়া উচিত এবং একটি নারীবাদী ঘোষণাপত্র'।

প্রশ্নগুলো নিয়ে কথা বলবার আগে একটু চিমামান্দা এনগোজি আদিচির পরিচয়টা বলে নিই। কেননা, এই অনুবাদটি পড়ার আগে আমার নিজেরই এ লেখক সম্পর্কে কিছু জানা ছিল না। চিমামান্দার ছোট বই দুটির অনুবাদ করেছেন শিমিন মুশশারাত। তার লেখা ভূমিকা থেকে জানলাম, চিমামান্দা একজন ঔপন্যাসিক। তার উপন্যাস 'পার্পল হিবিসকাস', 'হাফ অব আ ইয়েলো সান', 'দ্য থিং অ্যারাউন্ড ইয়োর নেক' ও 'আমেরিকানা' সমাদৃত হয়েছে দেশে-বিদেশে। 'হাফ অব আ ইয়েলো সান' প্রকাশের পর 'ওয়াশিংটন পোস্ট' চিমামান্দাকে 'চিনুয়া আচেবের একুশ শতকের কন্যা' খেতাব দেয়। বিশ্ববিখ্যাত নাইজেরীয় লেখক চিনুয়া আচেবের কন্যা খ্যাতি পাওয়া এই লেখকের শৈশব কেটেছে নাইজেরিয়ার নুসকা শহের। নুসকার যে বাড়িতে তার বেড়ে ওঠা, সেই বাড়িটিতেই একসময় থাকতেন চিনুয়া আচেবে। দশ বছর বয়সে আচেবের 'থিংস ফল অ্যাপার্ট' উপন্যাসটি পড়ে দারুণ প্রভাবিত হন চিমামান্দা। কারণ, বইটিতে তিনি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলেন। চিমামান্দার জন্ম নাইজেরিয়ার এনুগু শহরে, চিমামান্দার জন্ম ১৯৭৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। দশ বছর বয়সে আচেবের 'থিংস ফল অ্যাপার্ট' উপন্যাসটি পড়ে দারুণ প্রভাবিত হন চিমামান্দা। কারণ, বইটিতে তিনি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলেন।

চিমামান্দার কোনো উপন্যাস আমার পড়া হয়নি। নারীবাদবিষয়ক বইটি সম্পর্কেও আমার কিছুই জানা ছিল না। তবে অনুবাদটি প্রকাশের পর এক শুক্রবার সন্ধ্যায় বইটি কিনে আনলাম। অন্য আরও কাজ ছিল হাতে। সেই সব সেরে বইটি নেড়েচেড়ে দেখার জন্য হাতে নিলাম। ঘুমাবার আগে সাধারণত আমি গল্প-উপন্যাস পড়ি। সেদিনও 'দেশ' পূজা সংখ্যায় আধখানা পড়া জয় গোস্বামীর উপন্যাস 'মায়ের প্রেমিক' আমার পাঠের অপেক্ষায় ছিল। বলে রাখা ভালো, আমি নিয়মিত পাঠক, তবে পাঠক হিসেবে খুব একটা উঁচু দরের নই। যা পড়তে ভালো লাগে, তা-ই পড়ি। যেসব লেখায় গল্প নেই, সেগুলো আমাকে টানে না। চিমামান্দার বই দুটির বিষয় নারীবাদ হলেও পড়তে গিয়ে আমি একের পর এক গল্প পেতে শুরু করি এবং 'আমাদের সবার নারীবাদী হওয়া উচিত' শেষ করার আগে থামতে পারিনি। আমি নাইজেরিয়ার এই লেখকের লেখায় বাংলাদেশকে দেখতে পেলাম, নাইজেরিয়ার মানুষ ও শহরগুলোর নাম বদলে দিলেই হবে।

শুরু করেছেন এক বন্ধুর গল্প দিয়ে। যে আর বেঁচে নেই, সেই মানুষটি কৈশোরে প্রথমবারের মতো তাকে নারীবাদী বলে আখ্যা দিয়েছিল, যখন চিমামান্দাকে নারীবাদ কী তা জানার জন্য অভিধানের সহায়তা নিতে হয়েছিল। পরে অবশ্য বহুবার তাকে শুনতে হয়েছে কথাগুলো। চিমামান্দার ভাষাতেই একটু উদ্ধৃত করি, 'স্বামী না পেয়ে যেসব মেয়ে অসুখী, তারাই নারীবাদী। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি হব একজন সুখী নারীবাদী। তারপর একজন নাইজেরিয়ান নারী শিক্ষাবিদ আমাকে বলেন, নারীবাদ আমাদের সংস্কৃতি নয়, আমি পশ্চিমা বই পড়ে নিজেকে নারীবাদী বলি। যেহেতু নারীবাদ আফ্রিকান নয়, ঠিক করলাম, আমি নিজেকে একজন সুখী আফ্রিকান নারীবাদী বলব। তারপর এক প্রিয় বন্ধু বলল, নারীবাদী মানে যে পুরুষকে ঘৃণা করে। এবার আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি হলাম একজন সুখী আফ্রিকান নারীবাদী, যে পুরুষকে ঘৃণা করে না।'

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে সূচনাকাল থেকে নারীর প্রতি বৈষম্যের বিষয়গুলো বর্ণনা করেছেন লেখক। গল্পচ্ছলে লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন পুরুষতন্ত্রের বিস্তার শুধু নারী নয়, পুরুষের জন্যও গভীর ভোগান্তির কারণ হয়ে ওঠে। যে আমি আমার মেয়ের জন্য সমতার একটি পৃথিবী দেখতে চাই, আমার মেয়ে সমান অধিকার ও মর্যাদার চেতনা নিয়ে বড় হবে বলে ভাবি, সেই আমি এ বইটি পড়তে গিয়ে অনেক আত্মগ্লানিতে ভুগেছি। মনে পড়েছে জীবনভর কত পুরুষতান্ত্রিক আচরণ আমিও করেছি। শুরুতে যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছিলাম, এই সেই প্রশ্ন। অনেকগুলো প্রশ্ন একটি প্রশ্ন হয়ে সামনে এলো আমার। যদিও প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তরও জানা।

দ্বিতীয় বইটি, যা 'একটি নারীবাদী ঘোষণাপত্র' নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বাতিঘরের অনুবাদ বইয়ে, তার পুরো নামটি 'প্রিয় ইজাওয়েলে : পনেরো পরামর্শে একটি নারীবাদী ঘোষণাপত্র' মূলত বন্ধুকে লেখা চিমামান্দার চিঠি। সদ্যোজাত কন্যাকে কীভাবে একজন নারীবাদী হিসেবে বড় করা যায়, সে বিষয়ে এক বন্ধু পরামর্শ চেয়েছিলেন চিমামান্দার কাছে। বন্ধুর ওই চিঠির উত্তরে চিমামান্দা এই চিঠিগুলো লেখেন। এটি পুরুষতন্ত্রের চক্র ভেঙে গোড়া থেকে সমান অধিকার ও মর্যাদার চেতনা নিয়ে একটি কন্যাশিশুকে বড় করার নির্দেশিকা। এ পর্বটি আমাকে স্বস্তি দিয়েছে খানিকটা, নিজেও তো আমি একটি কন্যাশিশুর পিতা। গান্ধারী ছিলেন শত পুত্রের মাতা। গান্ধারীর মতো দৈববলে সন্তান পাওয়ার সুযোগ হলে, সন্তানদের বড় করার মতো অফুরন্ত সম্পদ থাকলে, আমি শত কন্যার পিতা হতে চাইতাম। এই বইটি আমি আমার কন্যা এবং কন্যাসমদের পড়াতে চাই। কন্যাদের না পড়ালে ক্ষতি আছে। তবে পুত্রদের জন্য অবশ্যপাঠ্য করতে হবে এ বইটি, পুরুষতন্ত্র কীভাবে পুরুষের জন্যও গভীর ভোগান্তির কারণ হয়ে ওঠে তা জানাতে হবে ওদের।

অনুবাদকের ঝরঝরে সরল গদ্যের প্রশংসা না করলে আলাপ অপূর্ণ রয়ে যায়। নারীবাদবিষয়ক সহজ বইটির সহজতর অনুবাদের জন্য শিমিন মুশশারাতকে ধন্যবাদ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com