সমাজ

কতদূর যেতে হবে ভূমিকা বদলের আশায়

১৪ অক্টোবর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২১ । ০১:০৫

সুধীর সাহা

ভারতের একটি বিজ্ঞাপন দিয়েই শুরু করি। ১৯৯৪ সালের কথা। ক্রিকেট খেলার মাঠ। ব্যাটসম্যানের স্কোর বোর্ড বলছে ৯৯। এই মোক্ষম সময়ে ছক্কা হাঁকালেন ব্যাটসম্যান। ক্যামেরা তাক করল এক তরুণীর দিকে। হাতে ধরা চকলেট, রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। তরুণী ছুটে গেলেন গ্যালারি পেরিয়ে প্যাভিলিয়ন টপকে, নিরাপত্তারক্ষীকে ডজ করে নাচতে নাচতে। সবাইকে হতভম্ব করে মেয়েটি আলিঙ্গন করে বসে সেই সেঞ্চুরি হাঁকানো ব্যাটসম্যানকে, তার প্রেমিককে। জনপ্রিয় চকলেট সংস্থার একটি বিজ্ঞাপন। সে সময়ে আপামর জনতার হৃদয়ে দোলা দেওয়া বিজ্ঞাপনটি আবারও ফিরে এলো ২০২১ সালে। প্রতিটি ফ্রেমই এক। চকলেটের বিজ্ঞাপন এবারও। শুধু কুশীলবদের অবস্থান বদলে গেল। এবার ছক্কা হাঁকিয়েছেন এক নারী খেলোয়াড়। একইভাবে একছুটে গ্যালারি পেরিয়ে, প্যাভিলিয়ন টপকে, নিরাপত্তারক্ষীকে ডজ করে এগিয়ে যান এক তরুণ। সেঞ্চুরি হাঁকানো বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরেন। এটাকে বলে 'রোল রিভার্সাল' বা 'জেন্ডার সোয়াপ'- বদলে যাওয়া নারী-পুরুষের ভূমিকা। এ তো বিজ্ঞাপনের কথা! বাস্তব জীবনে ভূমিকা বদল হয়েছে কি?

প্রায়ই খবর আসে, গণপ্রহারে কেউ মরণাপন্ন বা মৃত। পরে জানা যায়, মানুষটি শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ বা অক্ষম ছিল। কম বোধযুক্ত, ক্ষীণদৃষ্টি, শ্রবণে বা কথনে অসুবিধাসম্পন্ন এসব মানুষ নিজেদের ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারেন না। অপরাধের জ্ঞান নেই, কিন্তু শাস্তি পেতে হয় চূড়ান্ত। মেয়েরা হন যৌন নিগ্রহের শিকার, ব্যঙ্গ ও মনোরঞ্জনের বস্তু। অন্যের জন্য তারা সবচেয়ে নিরাপদ, কিন্তু নিজের জন্য বড় বেশি বিপন্ন। দেশে দেশে মানবাধিকারের আইন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের চেতনা জাগ্রত হয়নি। সব দেশেই এদের জন্য কিছু সুবিধাজনক আইন আছে। তবে আমাদের দেশে যা হয়- আইন থাকে আইনের বইয়ে, মানুষ চলে অমানবিকতার পথে।

মেয়েদের তো মূলত ফর্সা হওয়ার ক্রিম বা খুশকি তাড়ানো, চুলের জট ছাড়ানো শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনেই ব্যবহার করা হয়। অথবা ব্যবহার করা হয় ভোগ্যপণ্য বিজ্ঞাপনের ভোগ্যবস্তু হিসেবে। এসব দেখে দেখে ক্লান্ত হয় কি সমাজের লোকগুলো? তবে তার পরও বলতে হবে, গত ২৫-৩০ বছরে দেশে মেয়েদের ভূমিকা বদলেছে সর্বত্র। সাধারণ মেয়েদের কথাই যদি বলি- কোথায় নেই আজ তারা? গবেষণায়, স্থাপত্যে, চিকিৎসায়, সাংবাদিকতায়, আমলাতন্ত্রে, এমনকি ব্যবসাতেও নারীদের অংশীদারিত্ব বেড়েই চলেছে। দক্ষতা ও যোগ্যতায় একের পর এক সোপান পেরোচ্ছেন নারীরা। পুরুষের পাশে থেকে যেসব নারী ইটভাটা, পাথর ভাঙা, নির্মাণ শিল্পে কাজ করেন কিংবা রাস্তা তৈরি করেন, তাদের প্রতি কি আজও সমাজের ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

এবার ঘটে গেল আরব দুনিয়ার চমক। তিউনিসিয়ায় প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলেন নাজলা বাউদেন রমধান। এ নিয়ে অবশ্য সেখানে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে পারছে না অনেকেই। নারীর ক্ষমতায়ন থেকে রাজনীতির গভীর ছকই সেখানে অনেকে দেখতে পাচ্ছে। কেউ তাকে সমর্থন করে, আবার কেউ বিরোধিতা করে। এর ফলে দেশজুড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। রাজনীতির ময়দানে সেই অর্থে পরিচিতি বা ব্যাপ্তি কোনোটাই ছিল না রমধানের। ৬৩ বছর বয়সী রমধান ছিলেন ন্যাশনাল স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ার্সে জিওলজির একজন অধ্যাপিকা। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণা মন্ত্রণালয়ে ডিরেক্টর জেনারেল পদে নিযুক্ত ছিলেন। দেশবাসীর একাংশ তাকে নিয়ে আশাবাদী।

কতটা পথ হাঁটলে ভূমিকা বদল হতে পারে? আমরা কি ততটা পথ হেঁটেছি? বিজ্ঞাপনের চাহিদার মতো করে আমরা কি সমাজের আসল রূপটার ভূমিকা বদলের পথে হাঁটতে পেরেছি? বিজ্ঞাপন দিয়ে যেহেতু শুরু করেছিলাম, বিজ্ঞাপন দিয়েই শেষ করি। ভারতের অন্য একটি বিজ্ঞাপন। একটি বড় সংস্থার বার্ষিক সভা চলছে। পদোন্নতির জন্য এমন কিছু নাম চাচ্ছেন শীর্ষ কর্তা। বোর্ড অব ডিরেক্টরসের একজন সদস্য নাম প্রস্তাব করে বললেন, 'কিরণকে প্রমোশন দিন; রজত ওর নাম প্রস্তাব করেছে।' শীর্ষ কর্তার প্রশ্ন- 'কে কিরণ।' সদস্য বলেন, স্যার, কিরণ নতুন যোগ দিয়েছে। রজতের দলের তারকা বলতে পারেন। দারুণ কাজের, খুব বুদ্ধি। নতুন ভাবনা ওর মাথায়। রজত আর কিরণ সব সময় একসঙ্গে কাজ করে। মাঝেমধ্যে কাজ করতে করতে এত দেরি হয়ে যায়, কিরণকে বাড়িতে ছেড়ে আসে রজত।' শীর্ষ কর্তাসহ বোর্ডের সদস্যদের মুখে সমবেত ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি। বিজ্ঞাপনে তাদের কল্পনায় এক সুন্দরী, তন্বী নারীকে দেখাচ্ছে- যিনি সব সময় রজতকে সঙ্গ দেন। শীর্ষ কর্তা বলে ওঠেন, 'তা ডাকো তোমাদের কিরণকে। একবার দেখি তাকে।' এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন রজত। এবার ডাকলেন, 'ভেতরে এসো কিরণ।' দরজা খুলে প্রবেশ করেন এক ঝকঝকে, সুঠাম তরুণ। বোর্ড সদস্যদের ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি বদলে যায় অপ্রস্তুত হাসিতে। 'ভাবনা পাল্টান'- এই ক্যাচলাইনে বিজ্ঞাপনের শেষ। এটাই কি তাহলে আমাদের সমাজের শেষ বিজ্ঞাপন হবে নারীদের নিয়ে ভাবনা পাল্টানোর? হয়তো নয়, হয়তো যেতে হবে আরও অনেক দূর। অন্যদের তুলনায় আমরা তো এখন অনেকটাই পেছনে হাঁটছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধী নেত্রী, স্পিকারসহ আরও কত কত নারী কর্তাব্যক্তি! কিন্তু দৃষ্টি বদলানোর জন্য যে সমাজশিক্ষা প্রয়োজন, তার কি তেমন কোনো উন্নতি ঘটছে? নারীদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে পুরুষ তো দূরের কথা, আমাদের দেশের নারীরা কি প্রস্তুত হয়েছে? ভূমিকার কি বদল ঘটেছে আমাদের মননে আর চিন্তায়?

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা; কলাম লেখক
ceo@ilcb.net

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com