বিতর্কিত রেফারিংয়ের বলি বাংলাদেশ

১৪ অক্টোবর ২১ । ০০:০০

ক্রীড়া প্রতিবেদক

তপু বর্মণের হতাশার এই ছবি ছিল বুধবার বাংলাদেশ দলেরই প্রতিচ্ছবি। রেফারির বাজে সিদ্ধান্তে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বিদায়ের পর এভাবে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাতীয় দলের সেরা ডিফেন্ডার- সংগৃহীত

'বাংলাদেশ, বাংলাদেশ' স্লোগানে মুখর মালের ন্যাশনাল ফুটবল স্টেডিয়ামে নিস্তব্ধতা নেমে আসে উজবেকিস্তান রেফারি অ্যাকরোলের একটি বাঁশির আওয়াজে। সুমন রেজার গোলে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের দারুণ সমাপ্তির অপমৃত্যু ঘটে ৮৬ মিনিটে রেফারির বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্তে। ১৬ বছর পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার দ্বারপ্রান্তে গিয়েও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হয়েছে জামাল ভূঁইয়াদের। তার আগে ৭৯ মিনিটে আনিসুর রহমান জিকোকে যেভাবে লাল কার্ড দেখিয়েছেন রেফারি, তা নিয়েও আছে প্রশ্ন। আট মিনিটের মধ্যে রেফারির দুটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তে শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার আশা। বলা যায়, বাংলাদেশকে সাফের ফাইনালে উঠতে দিলেন না উজবেক রেফারি। ম্যাচ শেষে রেফারির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ অস্কার ব্রুজোন তো বলেই দিলেন, 'বাংলাদেশের ফুটবল ষড়যন্ত্রের শিকার।' খেলা শেষে রেফারিকে ঘিরে ধরে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন তপু বর্মণ-মোহাম্মদ সাদ উদ্দিনরা। কিন্তু তাতে যে ফল শূন্য। গতকাল নেপালের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করা বাংলাদেশ বিদায় নিয়েছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে। আর এই ড্রয়ে প্রথমবারের মতো নেপাল উঠে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের শিরোপা মঞ্চে।

জিতলেই ফাইনাল। তবে শঙ্কা ছিল চাপে ভেঙে পড়ার। কারণ, তিন বছর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে এই নেপালের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল লাল-সবুজের দলটি। কিন্তু দ্বীপদেশে এদিন শুরুতে ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেখা যায় সুমন রেজা গোল করলে। ম্যাচের ৯ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন রাকিব হোসেন। নেপালের ডিফেন্ডার বাধা দিলে পড়ে যান তিনি। উজবেকিস্তানের রেফারি অ্যাকরোল ফ্রিকিকের বাঁশি বাজান। জামাল ভূঁইয়ার ফ্রিকিকে নেপালের এক খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে উড়ন্ত বল বক্সের মধ্যে আসে। চলন্ত বলে সুমন রেজার হেড চলে যায় নেপালের জালে। জাতীয় দলের জার্সিতে এটা তার প্রথম গোল। গর্জে ওঠে গ্যালারি। লাল-সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের। চলতি সাফের এই আসরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো ফরোয়ার্ড গোল পান। আগের দুটি গোল করেছিলেন তপু বর্মণ ও ইয়াসিন আরাফাত। অলআউট ফুটবল খেলা বাংলাদেশ গোলের পর কিছুটা রক্ষণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে, যার সুযোগে বারবার বাংলাদেশের সীমানায় আক্রমণ শানায় নেপাল। কখনও রক্ষণভাগের খেলোয়াড়, আবার কখনও বা গোলরক্ষক আনিসুর রহমান জিকোর দৃঢ়তায় বেঁচে যায় বাংলাদেশ। তবে কাউন্টার অ্যাটাকে ব্রুজোনের শিষ্যরাও গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। ২২ মিনিটে নেপালের এক খেলোয়াড়ের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন গোলদাতা সুমন রেজা। বক্সের মধ্যে থাকা মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে বল না দিয়ে নিজেই বাঁ পায়ের যে শট নেন সুমন, তা সরাসরি চলে যায় নেপাল গোলরক্ষক কিরন কুমারের হাতে।

দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফিরতে মরিয়া নেপালের দুটি প্রচেষ্টা দারুণভাবে রুখে দেন গোলরক্ষক জিকো। ৫০ মিনিটে আয়ুশের ফ্রিকিক পাঞ্চ করে ফেরানোর জন্য অনন্ত তামাংয়ের ব্যাক হেড বিপদমুক্ত করেন বসুন্ধরা কিংসের এই গোলরক্ষক। ৫৫ মিনিটে সুমন রেজা যেভাবে মিস করেছেন, তা ছিল দৃষ্টিকটু। কাউন্টার অ্যাটাকে বল পেয়ে দ্রুত বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন এই ফরোয়ার্ড। তার সামনে ছিল শুধু নেপাল গোলরক্ষক। ডান পায়ে তিনি যে শট নেন, তা নেপাল গোলরক্ষক বরাবর চলে গেলে হতাশা নেমে আসে বাংলাদেশ শিবিরে। এই গোল হলে ম্যাচটা পুরোপুরি চলে আসত বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। তা তো হলোই না, উল্টো পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড় জিকো ৭৯ মিনিটে লাল কার্ড দেখলে বড় ধাক্কা খায়। রাকিব হোসেনের ব্যাকপাস বিপদমুক্ত করতে গিয়ে বক্সের বাইরে চলে আসেন জিকো। নেপালের এক খেলোয়াড়ের শট তার হাতে লাগে, রেফারি জিকোকে লাল কার্ড দেখান। তবে রিপ্লেতে দেখা গেছে, বল প্রথমে জিকোর পায়ে লাগে। এরপর হাতে লাগলেও তা ছিল অনিচ্ছাকৃত। রেফারি চাইলে তাকে হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করতে পারতেন। সেটা তিনি করেননি। জিকো উঠে যাওয়ায় তার পরিবর্তে নামাতে হবে গোলরক্ষক। তাই বিপলুকে উঠিয়ে আশরাফুল ইসলাম রানাকে মাঠে নামান কোচ ব্রুজোন। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেও একজন কম নিয়ে খেলে ইয়াসিন আরাফাতের গোলে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখেছিল বাংলাদেশ। বুধবারও সেই একই রকমের সমাপ্তি হতে চলেছিল; কিন্তু ৮৬ মিনিটে রেফারির পেনাল্টির সিদ্ধান্ত সব এলোমেলো করে দেয়। বক্সে হেড করতে গিয়ে অনেকটা ফলো থ্রুয়ে পড়ে যান অঞ্জন। রিপ্লেতে দেখা গেছে, সাদ উদ্দিনের সঙ্গে তার কোনো সংঘাত হয়নি। তারপরও রেফারি স্পট কিকের বাঁশি বাজান, যেটা নিয়ে চলছে বিতর্ক। আর অঞ্জনের স্পট কিকটি জালে জড়াতে ভেঙে পড়েন বিশ্বনাথ ঘোষ-তারিক কাজীরা। বাকি সময়ে গোল করতে না পারা বাংলাদেশ টানা পাঁচটি সাফে বিদায় নিয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে।

রাউন্ড রবিন লিগভিত্তিক সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের চার ম্যাচে একটি জয়, দুই ড্র এবং এক হারে টুর্নামেন্ট শেষ করা বাংলাদেশের জন্য বুধবারের সন্ধ্যাটি বেদনাময়। রেফারির দুটি ভুল সিদ্ধান্তের বলি হওয়া রাকিব হোসেন-তপু বর্মণদের স্বপ্নভঙ্গের কান্না কাঁদিয়েছে ১৬ কোটি বাঙালিকে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com