সমাজ

তরুণরা এগোলে দেশও এগোবে

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২১ । ১৬:০৮ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২১ । ১৬:০৮

রায়হান আহমেদ তপাদার

একবিংশ শতাব্দীতে কাজের জন্য যেসব বিষয়ে দক্ষতার প্রয়োজন হবে পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদের সেসব বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্য বেশ কয়েকটি অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের যে পূর্বাভাস রয়েছে সেখানেও বৈশ্বিক গড় অবস্থানের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়া অনেকটা পিছিয়ে। ২০৩০ সালে শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সম্ভাব্য অবস্থা নিয়ে গত বছর এডুকেশন কমিশনের সঙ্গে মিলে ইউনিসেফ যে হিসাব দাঁড় করিয়েছিল তার ওপর ভিত্তি করেই এটা তৈরি করা হয়েছে। করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বেই বেকারের সংখ্যা বেড়েছে, বাড়ছে।

করোনা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অনেক দেশেই এখনও করোনা সংক্রমণ রয়েছে। অনেক দেশেই পূর্ণ মাত্রায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, মহামারির আকারে করোনা শুরু হওয়ার আগে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ। এ সময় আয় করার মতো কাজে যুক্ত ছিলেন ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। প্রায় দু'বছর ধরে চলমান করোনার মধ্যে কাজ বা চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ। সেই সঙ্গে আয় কমেছে ৭০ শতাংশ মানুষের। তাছাড়া করোনার আগে দেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ২০ শতাংশ, বর্তমানে সেখানে তা বেড়ে হয়েছে ৪০ শতাংশ। বিশ্নেষকদের মতে, বেকার এবং দারিদ্র্য উভয় হারই অনেক বেশি।

এদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও-ও জানিয়েছে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে অন্তত ২৫ শতাংশই বেকার, যাদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। করোনাকালে ঠিক কত মানুষের চাকরি বা কর্মসংস্থান হয়েছে সে ব্যাপারেও প্রকাশিত রিপোর্টে সংশয়ের প্রকাশ ঘটেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত তিন অর্থবছরে অন্তত ৩০ লাখ মানুষকে চাকরি দিয়ে বিদেশে পাঠানো সরকারের পরিকল্পনা ছিল। অন্যদিকে বাস্তবে এক লাখেরও কম মানুষকে পাঠাতে পেরেছে সরকার। বিদেশ থেকে চাকরি হারিয়ে বরং কয়েক লাখ মানুষ দেশে ফিরে এসেছে। এদিকে দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান করার ক্ষেত্রেও সরকার সফল হতে পারেনি। স্বাভাবিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ মানুষের চাকরি বা কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। কিন্তু করোনার কারণে সব মিলিয়েও এক লাখ মানুষের চাকরি হয়নি। বরং চাকরি হারিয়েছে বহু মানুষ।

তথ্যাভিজ্ঞরা মনে করেন, সব মিলিয়ে ৮ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে বেকার বা কর্মহীন রয়েছেন। এটা কোনো সাধারণ খবর নয়। সরকারের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত সংস্থা পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ জিইডি এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রকাশিত রিপোর্টে তথ্যটি জানানো হয়েছে। সংস্থা দুটি এক রিপোর্টে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়ন তথা দারিদ্র্যের ধারণাগত পরিবর্তন হয়েছে। নতুন ধারণা অনুযায়ী শুধু প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন হলেই চলবে না, বৈষম্য কমিয়ে এনে সাম্যের ভিত্তিতেও উন্নয়ন করতে হবে। আর এজন্য জীবনযাত্রার অনেক কিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শতকরা হিসাবে পার্থক্য থাকলেও সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানই স্বীকার করেছে, করোনার কারণে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

করোনার তথা লকডাউনের কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আট কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর অত্যন্ত ভীতিকর। কারণ, করোনার প্রভাবে সমগ্র বিশ্বকেই বর্তমানে মহাসংকট পার হতে হচ্ছে। সংকটে পড়েছে ২১৩টি রাষ্ট্র এবং প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর হিসাবে বিশ্বের ৫০ শতাংশ মানুষ একই সংকটের শিকার হয়ে চাকরি তথা জীবিকা হারাতে পারে। বাংলাদেশেও চাকরি হারিয়ে বেকার হতে পারে কয়েক কোটি মানুষ। বাস্তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইএলওর আশঙ্কা সত্যও হতে শুরু করেছে। এদিকে জনশক্তি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের আট দেশেই বেশিরভাগ বাংলাদেশি প্রবাসীরা থাকেন। এসব দেশ থেকে প্রবাসী আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে। গালফের কিছু দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, ইরাক, লেবানন এসব দেশ থেকেই চাকরি হারিয়ে কর্মীরা ফিরে আসছেন। সুতরাং তাদের কথাও বিবেচনায় রাখতেই হবে।

 যে কোনো দুর্যোগ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপরই সবার আগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। করোনাভাইরাসের অভিঘাতও এই শ্রেণির শ্রমিকদের ওপরই প্রথমে পড়েছে। অথচ দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের রয়েছে বড় ভূমিকা। আর দুর্যোগ কেটে গেলেও যে কাজে ফিরবেন, সে নিশ্চয়তা নেই তাদের। এজন্য কাজ হারানো এই মানুষগুলো রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে। সমাজের সব ক্ষেত্রেই জেঁকে বসেছে সুবিধাবাদ, ভোগবাদ আর আত্মকেন্দ্রিকতা। এর সবকিছুকেই বাংলাদেশের তারুণ্য ধারণ করছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্র ও সরকার তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন করছে না। আজকের তরুণরা দেশকে নিতে অনেক চিন্তা করছে। প্রতিনিয়ত দেশের খবরাখরব জানতে চেষ্টা করছে তারা। কিন্তু রাষ্ট্র তরুণদের নিয়ে কতটা ভাবে? বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কাজে বিশ্বাস করে, কথায় নয়। আজ আমাদের দেশে গড় তরুণ বেকারের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অধিক। তবে এই বেকার তরুণদের চিন্তা-চেতনা আর বুদ্ধি যদি রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারে, তবে বাংলাদেশ পরিণত হবে সোনার বাংলায়। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণ সমাজের বিকল্প নেই।

আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেন চাকরিবিহীন উন্নয়ন না হয়ে যায়। তরুণদের কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও উপাত্ত আমাদের কাছে নেই। সরকারিভাবে কোনো তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা আমাদের নেই। সংবাদমাধ্যম থেকে তা সংগ্রহ করতে হয়। দেশের তরুণদের সক্ষমতাকে পূর্ণ রূপে কাজে লাগাতে হলে তাদের আরও সংগঠিত ও উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সভা ও সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে তরুণদের নিজেদের মত প্রকাশের মঞ্চ তৈরি করে দিতে হবে। তাছাড়া গ্রামের বা মফস্বলের তরুণদের আরও বেশি যুক্ত করার কথাটি বারবার আসছে। কিন্তু রাখতে হবে শহরের কোনো স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া ছেলেমেয়েদের যে প্রতিবন্ধকতাগুলোর সম্মুখীন হতে হয়, গ্রামের বা মফস্বলের তরুণদের জন্য সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্বিগুণ হয়ে থাকে। কারণ, তারা সমান সুযোগ-সুবিধা পায় না। আমরা প্রতিদিন হাজারটা সমস্যার সম্মুখীন হয়ে এই সমাজে বসবাস করছি। এসব সমস্যার জন্য আমরা ঢালাওভাবে সরকারকে দায়ী করে থাকি। কিন্তু এটা খুব কমই চিন্তা করি, আমাদেরও সমান দায় আছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com